পাঠকের লেখা
দখলে ক্ষত হয় সমাজজীবনের গভীরে
- বিষয়: দখলবাজি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দখলবাজির গল্প সাধারণত জমির সীমানা থেকে শুরু হয়, কিন্তু তার ক্ষত গিয়ে লাগে মানুষের জীবনের গভীরে। একটি জায়গা দখল মানে শুধু কয়েক কাঠা মাটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া নয়; কখনো তা কারও বসতভিটা, কখনো একটি শিশুর খেলার মাঠ, কখনো একটি বিদ্যালয়, আবার কখনো অসহায় মানুষের চিকিৎসার শেষ ঠিকানাটিও কেড়ে নেয়। মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের সাম্প্রতিক ঘটনা সেই কঠিন সত্যটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
২৫ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুর-১-এর এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের পর ভারী যন্ত্র দিয়ে স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সাল থেকে এখানে নিম্ন আয়ের মানুষ, বিশেষ করে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও টিকাদান কার্যক্রম চলেছে। পুলিশ এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করেছে এবং তদন্তও চলছে। একই সঙ্গে পুলিশি ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় আলাদা তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ঘটনাটি এখন শুধু একটি জমি নিয়ে বিরোধ নয়; এটি আইন প্রয়োগ, জনস্বাস্থ্য এবং নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
কষ্টের জায়গাটি অন্যত্র। একটি ভবন ভেঙে ফেলা যায় কয়েক ঘণ্টায়, কিন্তু তার ভেতরে বছরের পর বছর গড়ে ওঠা মানুষের আস্থা কি এত সহজে ফিরিয়ে আনা যায়? একটি দরিদ্র মা যখন সন্তানের টিকা নিতে এসে দেখে, তার পরিচিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, তখন তার কাছে জমির মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে নিরাপত্তার প্রশ্ন। ভাঙা কক্ষেও স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখার চেষ্টা তাই আমাদের বিবেকের সামনে একটি নীরব দৃশ্যপট তৈরি করে।
সমাজের সভ্যতা বোঝা যায় তার শক্তিমান মানুষের ক্ষমতায় নয়, দুর্বল মানুষের নিরাপত্তায়
দখলবাজির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এটি ধীরে ধীরে বেআইনিকে স্বাভাবিক করে দিতে পারে। প্রভাবশালী কেউ জায়গা দখল করলে দুর্বল মানুষ শিখে যায়— আইনের চেয়ে শক্তি বড়। তখন জমি নিয়ে বিরোধ শুধু আদালতের বিষয় থাকে না; সমাজের নৈতিক কাঠামোও ক্ষয়ে যেতে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাল কাগজ, ভয়ভীতি, মধ্যস্বত্বভোগী, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগ। ফলে একটি দখল একদিনে শেষ হয় না; তার ছায়া বহু মানুষের জীবনে দীর্ঘ হয়।
দখলবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা শুধু ঘটনার পর শুরু হলে সমস্যার মূল ছোঁয়া যায় না। স্থানীয় পর্যায়ে ভূমিসংক্রান্ত তথ্য সহজে যাচাইযোগ্য করা, সরকারি ও জনকল্যাণমূলক জমির সীমানা দৃশ্যমানভাবে সংরক্ষণ, নিয়মিত পরিদর্শন এবং অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা থাকলে অনেক সংঘাত আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। আদালত ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দীর্ঘসূত্রতা কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বছরের পর বছর ঝুলে থাকা একটি জমি-বিরোধ একসময় এমন অবস্থায় পৌঁছাতে পারে, যেখানে কাগজের মালিকানা আর বাস্তব দখলের মধ্যে বিপজ্জনক দূরত্ব তৈরি হয়। সেই দূরত্ব যত বাড়ে, ততই বাড়ে সংঘাত, অনিশ্চয়তা এবং ক্ষতির আশঙ্কা।
এই বাস্তবতায় প্রয়োজন দখলমুক্তির পাশাপাশি দখল প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা। জমির মালিকানা ও রেকর্ড দ্রুত যাচাইয়ের সুযোগ, বিরোধ নিষ্পত্তির সহজ প্রক্রিয়া, অবৈধ স্থাপনা ও জবরদখলের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুরক্ষা দিতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার ঘটনায় শুধু মাঠপর্যায়ের ব্যক্তিদের নয়, তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত পুনরুদ্ধার করাও জরুরি।
একটি সমাজের সভ্যতা বোঝা যায় তার শক্তিমান মানুষের ক্ষমতায় নয়, দুর্বল মানুষের নিরাপত্তায়। যে জমিতে একটি শিশুর টিকা দেওয়ার কথা, সেখানে যদি দখলের পতাকা ওঠে, তবে প্রশ্নটি শুধু জমির নয়—আমরা কেমন সমাজ রেখে যেতে চাই, সেই প্রশ্নও। দখলের ইট দিয়ে ভবন হয়তো ওঠে; কিন্তু ন্যায়, আস্থা ও মানবিকতার ঘর সেভাবে নির্মাণ করা যায় না।
লেখক: কবি
রেলগেট, ফেনী



