বাংলা একাডেমি একটি দুঃখজনক উদাহরণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক যে বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি নিজেই দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে এক অগণতান্ত্রিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে বন্দি হয়ে আছে। সম্প্রতি ‘আগামীর সময়’-এ প্রকাশিত পাভেল রহমানের একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৯৯৯ সালের পর বাংলা একাডেমিতে আর কোনো নির্বাহী পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। অথচ একাডেমির নিজস্ব আইন অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পরপর নির্বাচন হওয়ার কথা। সে হিসাবে গত ২৭ বছরে ৯টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনহীন অবস্থায় পরিচালিত হতে পারে, বাংলা একাডেমি তার একটি দুঃখজনক উদাহরণ।
বাংলা একাডেমি আইনের ২৩ নম্বর ধারার ১ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, ১৯ সদস্যের নির্বাহী পরিষদে সাধারণ সদস্য ও ফেলোদের প্রত্যক্ষ ভোটে সাতজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন। এই প্রতিনিধিদের কাজ হলো নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ, সাধারণ সদস্যদের মতামত তুলে ধরা এবং প্রশাসনিক একচ্ছত্র প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে এই সাতটি পদ গত ২৭ বছর কার্যত শূন্য পড়ে রয়েছে। ফলে নির্বাহী পরিষদে সরকার মনোনীত সদস্য এবং পদাধিকারবলে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের হাতেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য দুর্বল হয়েছে এবং আমলাতান্ত্রিক প্রভাব ক্রমে শক্তিশালী হয়েছে।
যেকোনো প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের অনুপস্থিতি মতের বহুত্ব ও স্বাধীন সমালোচনার ক্ষেত্র সংকুচিত করে। তার পরিবর্তে সেখানে তোষণ, আনুগত্য ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলা একাডেমির ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কার প্রতিফলন স্পষ্ট। রাষ্ট্রের অনুকম্পা ও বাজেট-নির্ভরতার বৃত্তে আবদ্ধ হতে হতে একসময়ের স্বাধীন বৌদ্ধিক পরিসর হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে তার সমালোচনামুখর মনন ও স্বকীয়তার অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার অন্যতম প্রতিফলন দেখা যায় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে ওঠা বিতর্ক ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে। ২০১৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার ২০২৪ সালে নিজের পুরস্কার ফিরিয়ে দেন। এই প্রতিবাদ ছিল একাডেমির স্বেচ্ছাচারিতা ও আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বার্তা। যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির পরিবেশ থাকে না, তখন সাহিত্যিক উৎকর্ষের পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য বা প্রশাসনিক প্রভাব গুরুত্ব পেতে শুরু করে। যোগ্য লেখকদের উপেক্ষা করে পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভিযোগ বাংলা একাডেমির বিরুদ্ধে বারবার সামনে এসেছে। নির্বাহী পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলে এসব বিষয়ে ভেতর থেকেই প্রশ্ন তোলার সুযোগ সৃষ্টি হতো।
বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন যথার্থই বলেছেন, ‘শুধু নির্বাচিত সরকার থাকলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না; রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোও গণতান্ত্রিক হতে হয়।’ অথচ গত ২৭ বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে সরকার গঠন করলেও কেউ বাংলা একাডেমির এই অগণতান্ত্রিক কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়নি; বরং প্রতিষ্ঠানটিকে রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের মধ্যেই রাখা হয়েছে।
গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত হলে প্রতিষ্ঠান জুড়ে দুর্নীতি-অনিয়মের সংস্কৃতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বাংলা একাডেমির ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই ঘটেছে। কর্মকর্তা নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে এবং যা বর্তমানে দুদকের তদন্তাধীন। ক্ষমতার ভারসাম্য ও কার্যকর জবাবদিহির অভাব এ ধরনের অনিয়মকে উৎসাহিত করেছে। বর্তমান মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম নিজেও স্বীকার করেছেন, নির্বাচন না হওয়ায় একাডেমির গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত হচ্ছে। কেবল রুটিন কার্যক্রম পরিচালনা বা বইমেলা আয়োজনই বাংলা একাডেমির একমাত্র কাজ নয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণা, মুক্তচিন্তার বিকাশ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব প্রদানই এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান দায়িত্ব। প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল থাকা আর একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাণবন্ত ও সৃজনশীল থাকা এক বিষয় নয়।
বাংলা একাডেমিকে তার হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে হলে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, অবিলম্বে নির্বাহী পরিষদের নির্বাচন আয়োজন করতে হবে এবং দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা সাতটি পদ সাধারণ সদস্য ও ফেলোদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলা একাডেমি আইন পুনর্বিবেচনা করে এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা আরও কার্যকর হয় এবং রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ থেকে প্রতিষ্ঠানটি আইনি সুরক্ষা পায়। তৃতীয়ত, সাহিত্য পুরস্কার ও ফেলোশিপ প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য জুরি বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন, যাতে সৃজনশীল উৎকর্ষই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হয়। চতুর্থত, নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অতীতের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
বাংলা একাডেমি কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও মননের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। তাই এর স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক চরিত্র পুনরুদ্ধার করা মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার নয়; বরং জাতির সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা ও মুক্তচিন্তার ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করা।
অথচ ২৭ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠান কার্যত অগণতান্ত্রিক অবস্থায় পরিচালিত হয়েছে। এর দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়, বুদ্ধিজীবী সমাজেরও। দীর্ঘদিনের নীরবতা বাংলা একাডেমির স্বাধীন চরিত্রকে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলেছে।
বাংলা একাডেমিকে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে কবি-সাহিত্যিক, গবেষক ও চিন্তকদের জন্য একটি সত্যিকারের স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই এখন সময়ের দাবি।
লেখক: কবি, সংস্কৃতিকর্মী




