গাজীপুর-ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ে
টোলে অনীহা, ওঠে না গাড়ি
- ৪৮ কিমি পথ, ব্যয় ৩ হাজার ৫০০ কোটি
- উদ্বোধন হয়েছে ১৮ কিমি সড়ক
- ব্যবহারে অনীহা ৬০ ভাগ যানবাহনের
- নিরাপত্তাবেষ্টনী কেটে পারাপার

ছবি: আগামীর সময়
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মদনপুর থেকে গাজীপুর মহানগরীর ভোগড়া মোড় পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে ৪৮ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে। চট্টগ্রাম থেকে গাজীপুর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলগামী যানবাহন, বিশেষ করে পণ্যবাহী পরিবহনের স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াতের জন্য নেওয়া হয়েছে এ প্রকল্প। এর মধ্যে উদ্বোধন করা হয়েছে ১৮ কিলোমিটার সড়ক। সেটি দিয়ে শুরু করেছে যানবাহন চলাচল। তবে দূরত্বের তুলনায় টোলের পরিমাণ বেশি দাবি করে সেই পথ ব্যবহার করছে না অন্তত ৬০ ভাগ যানবাহন। এতে যে উদ্দেশ্যে ব্যয়বহুল প্রকল্প করা হয়েছিল, এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ সড়কটি ব্যবহারকারী পরিবহন শ্রমিক-মালিক ও সাধারণ মানুষের। এ ছাড়া সড়কের দুই পাশে মিল-কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে অনেক পথ ঘুরে আসতে হয়— এমন অভিযোগে সড়কের বিভিন্ন স্থান দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে অনেককে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে ২৫ বছরের চুক্তিতে ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা বাইপাস সড়ককে (জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর) চার লেন এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালের মার্চে। চলতি বছরের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল এর কাজ। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে তা শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চীনের সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ, শামীম এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড ও ইউডিসি কনস্ট্রাকশন লিমিটেড যৌথভাবে বিনিয়োগ করে এ প্রকল্পে। এর বাস্তবায়ন করছে ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেড। ৪৮ কিলোমিটার এই ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট সড়কের গাজীপুর অংশের ১৮ কিলোমিটার অংশ যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু যানবাহনগুলো এক্সপ্রেসওয়ের সুফল ভোগ না করে যানজটের ভোগান্তি নিয়ে চলাচল করছে এক্সপ্রেসওয়ের নিচ দিয়ে।
সরকারনির্ধারিত হারেই আদায় করা হচ্ছে টোল -মো. সাঈদ আহমেদ, সহকারী ব্যবস্থাপক, ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেড
অন্যদিকে স্থানীয়দের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এক্সপ্রেসওয়েটি। স্থানীয়দের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে এটি। এর প্রস্থ ৬০-৭০ ফুট হলেও দূরত্ব বেড়েছে প্রায় ১ ঘণ্টার পথ। সড়ক পারাপারে বিভিন্ন জায়গায় আন্ডারপাস থাকলেও তা ব্যবহারে কোনো আগ্রহ নেই স্থানীয়দের। দূরত্ব কমাতে বিভিন্ন জায়গায় লোহার নেট কেটে ডিভাইডার টপকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার হচ্ছেন তারা। এমন দৃশ্য ভোগড়া, জাঝর, মৈরান, মেঘডুবিসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে।
ট্রেলারচালক আবুল কালাম বললেন, ‘এক্সপ্রেসওয়েতে ১৮ কিলোমিটার পথে টোল ৭৪০ টাকা, যা মাত্রাতিরিক্ত। যারা ট্রাক বা ট্রেলার ভাড়া করেন, তারা অতিরিক্ত ভাড়া দিতে গড়িমসি করেন। এ কারণেই এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করেন না চালকরা। যানজটে কিছুটা ভোগান্তি হলেও সাধারণ লেন দিয়েই বেশিরভাগ চালক গাড়ি চালান।
কাভার্ড ভ্যানের চালক মনির হোসেন জানালেন, অনেক যানবাহন সিলেট, নরসিংদী ও গাজীপুরের কালীগঞ্জ শিল্প এলাকা থেকে মীরেরবাজার হয়ে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করে। কিন্তু মীরেরবাজারে র্যাম্প না থাকায় সিলেট, নরসিংদী ও কালীগঞ্জ শিল্প এলাকার যানগুলো এক্সপ্রেসওয়েতে ঢুকতে পারে না। এক্ষেত্রে এই যানগুলোকে ১৮ কিলোমিটার পথ ঘুরে আসতে হয়। দীর্ঘ পথ ঘুরে আসায় টোল ফি, জ্বালানি ও সময় বেশি লাগে। এ কারণে অনেক চালক এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করেন না।
মৈরান এলাকার আকবর আলী বলেছেন, ‘এক্সপ্রেসওয়ের উত্তর পাশে মানুষের সঙ্গে দক্ষিণ পাশে মানুষের যোগাযোগ অনেক কমে গেছে। ৬০ ফুট প্রস্থ রাস্তাটি স্থানীয়দের যোগাযোগে বা আত্মীয়ের বাড়িতে যাতায়াতে যেখানে লাগত ৫ মিনিট, সেখানে এখন লাগছে প্রায় পৌনে ১ ঘণ্টা। কারণ প্রায় ২ কিলোমিটার ঘুরে আন্ডারপাস দিয়ে রাস্তা পার হতে হয়। এক পাশ থেকে অন্য পাশে কৃষিকাজ, স্কুলশিক্ষার্থীদের যাতায়াত, ব্যবসাসহ নানা কাজে সাধারণত যাতায়াত করতে হয়। সেক্ষেত্রে নেট কেটে ডিভাইডার টপকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পারাপার করতে হচ্ছে স্থানীয়দের।
ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেডের টোল প্লাজার সহকারী ব্যবস্থাপক মো. সাঈদ আহমেদের ভাষ্য, সরকারনির্ধারিত হারেই টোল আদায় করা হচ্ছে। তবে এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ যানবাহন এক্সপ্রেসওয়ে বাইরে দিয়ে চলাচল করে। এর কিছু কারণ রয়েছে, এক্সিট পয়েন্টগুলোর কাজ এখনো শেষ হয়নি। সড়কটি সম্পূর্ণ হলে তখন যানবাহন চলাচল অনেক বেড়ে যাবে। এক্সপ্রেসওয়েতে নিরাপত্তার ব্যাপারে আমরা নেটিং বা ফেনসিং করে দিয়েছি। কিছু কিছু জায়গায় স্থানীয়রা সেগুলো কেটে রাস্তা পার হচ্ছেন। এগুলো আমাদের প্যাট্রল টিমের মাধ্যমে টহল দিয়ে সেফটি নিশ্চিত করছি। অনেক জায়গায় ওভারপাস বা আন্ডারপাসের প্ল্যান করা হয়েছে।




