যত বড় হওয়া যায় তিনি ছিলেন ততটাই বড়

তোফায়েল আহমেদের কথা আমি প্রথম শুনি ১৯৬৯ সালে। ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের সময়। আমি তখন সবে ঢাকা কলেজে পড়ি। তোফায়েল আহমেদ তখন ডাকসুর সহসভাপতি হিসেবে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বিভিন্ন সভায় সভাপতিত্ব করতেন। ওই বছরের ২০ জানুয়ারি আসাদ যখন পুলিশের গুলিতে নিহত হন, তখন আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ওই সময় তোফায়েল আহমেদ যে ভাষণগুলো দিয়েছিলেন, সেগুলো শুনেছিলাম। তখন থেকেই তার একটা ভাবমূর্তি গড়ে উঠতে থাকে। ১১ দফা আন্দোলনের পর দেখা গেল তার জনপ্রিয়তা একেবারে তুঙ্গে এবং শেখ মুজিব যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হলেন, তখন তোফায়েল আহমেদের জনপ্রিয়তা বলা যায় শেখ মুজিবের সমান সমান প্রায়। এরপর মার্শাল ল এলো। ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হলেন। তারপর ১৯৭০ সালের শেষের দিকে ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়, তোফায়েল আহমেদ ছাত্রলীগের সভাপতি হন। তিনি সভাপতি থাকাকালেই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই এবং বলা চলে, ছাত্রলীগে যোগ দিই। সে সময় কাছ থেকে দেখেছি। দেশের অনেক সাংবাদিকও জানেন না, ছাত্রলীগের অ্যাকটিভিস্টদের নিয়ে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) তৈরি হয় ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি। ইদানীং তো অনেকে এটাকে ভারতের বলা শুরু করেছে, তা করুক। কিন্তু ঘটনাগুলো তো আমরা দেখেছি। ১৯৭১-এর মার্চের পর যখন মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হচ্ছে, তখন তারা ভারতে গিয়ে এটাকে আবার অর্গানাইজ করে। শেখ মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক আর তোফায়েল আহমেদ— এই চারজন নেতা বাংলাদেশকে চারটি সেক্টরে ভাগ করে একেকজন একেক ভাগের দায়িত্ব নেন। তোফায়েল আহমেদের দায়িত্বে ছিল বর্তমান খুলনা ও বরিশাল বিভাগ। দেশ স্বাধীন হলে শেখ মুজিব পাকিস্তান থেকে এসে ক্ষমতা হাতে নিলেন এবং তোফায়েল আহমেদকে তার পলিটিক্যাল সেক্রেটারি হিসেবে অ্যাপয়েন্ট করলেন প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায়। তিনি তখন সেই সরকারের অংশ হলেন। সরকারের ওই সময়ের ভূমিকা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। শেখ মুজিব রক্ষীবাহিনী তৈরি করেছিলেন। অনেকেই বলেন, তোফায়েল আহমেদ মূলত এটি পরিচালনা করেছেন। তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবের নির্দেশের বাইরে গিয়ে কিছু করেছেন বলে আমার জানা নেই। শেখ মুজিব যা বলছেন, সেটিই তিনি করেছেন।
২০১৫-১৮ সালের দিকে আমি যখন সিরাজুল আলম খানকে নিয়ে ‘প্রতিনায়ক’ বইটি লিখতে শুরু করি, তখন সিরাজুল আলম খানের দেওয়া সাক্ষাৎকারের তথ্যগুলো একটু ক্রসচেক করার জন্য আমি তোফায়েল আহমেদের সাক্ষাৎকার নিতে যাই। পরপর দুদিন তার বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎকার নিই। ওই সময় তার সঙ্গে অনেক খোলামেলা কথা হয়। শেখ মুজিব তাকে দিয়ে মওলানা ভাসানীসহ অনেকের বাড়িতে টাকা পাঠাতেন। কাউকে ২০ হাজার, কাউকে ১০ হাজার টাকা। রেজিস্টার মেইনটেইন করা হতো। এসব উনিই আমাকে বলেছেন।
১১ দফা আন্দোলনের পর দেখা গেল তার জনপ্রিয়তা একেবারে তুঙ্গে এবং শেখ মুজিব যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হলেন, তখন তোফায়েল আহমেদের জনপ্রিয়তা বলা যায় শেখ মুজিবের সমান সমান প্রায়
আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, অনেকেই বলেছেন ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনার সময় আপনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে যখন অভ্যুত্থান হলো, আপনি রক্ষীবাহিনীকে অ্যাকটিভেট করলেন না কেন? তোফায়েল আহমেদ আমাকে এর উত্তরে বলেছিলেন, ‘তিনি রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টারে গিয়েছিলেন ওই সময় শেরেবাংলা নগরে। সে সময় রক্ষীবাহিনীকে অ্যাকটিভ করা সম্ভব হয়নি কারণ; শেখ মুজিব মারা গেছেন— এটি শোনার পর সবার মনোবল ভেঙে পড়ে। ওই রাতেই তাকে গ্রেপ্তার এবং নানাভাবে নির্যাতন করা হয়। তার একজন সহকারী ছিলেন। তাকে মেরে ফেলা হয়।’
জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদের বেশ ভালোভাবেই উত্থান ঘটে। শেখ হাসিনা যখন দিল্লি থেকে ফিরে এসে সভাপতির দায়িত্ব নেন, তখন তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। কিন্তু ১/১১-এর সময় আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আমির হোসেন আমুসহ কয়েকজন নেতা আওয়ামী লীগের ভেতরে সংস্কারের জন্য অনেক প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যেটি শেখ হাসিনা পছন্দ করেননি এবং ১/১১-এর পর ২০০৯ সালে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে, তখন হাসিনা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। তাদের কাউকে আর দলের কোনো পদে রাখা হয়নি। তাদের উপদেষ্টামণ্ডলীতে রাখা হয়। উপদেষ্টামণ্ডলীর সে অর্থে কোনো কাজ ছিল না। তাদের কাউকে মন্ত্রীও করা হয়নি। পরে আওয়ামী লীগ সরকার যখন লেজেগোবরে অবস্থায় চলে যায়, তখন তোফায়েল আহমেদকে মন্ত্রী করা হয়। ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি মন্ত্রী ছিলেন। তোফায়েল আহমেদ অনেক দুঃখ করতেন আমার কাছে।
একবার আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ওই সময়ের সিরাজুল আলম খান সম্পর্কে। শেখ হাসিনা অনেক বিষোদগার করেছিলেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সিরাজুল আলম খান শেখ মুজিবকে চাপ দিয়েছিলেন একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে। শেখ মুজিব রাজি হননি। এ প্রসঙ্গে রেহমান সোবাহানের যে বই আনট্রাঙ্কুইল রিকালেকশনস প্রথম খণ্ড— সেখানে এটির বর্ণনা আছে।
আমি তোফায়েল আহমেদকে একদিন ফোন করে বললাম, অন্যরা যে যাই বলুক সিরাজুল আলম খান তো আপনার নেতা ছিলেন এবং আপনি প্রকাশ্যেই বলতেন, আমি তার কাছে বসে রাজনীতি শিখেছি। তো আপনি সিরাজুল আলম খান সম্পর্কে একটু চুপচাপ থাকলেই তো পারতেন, এত কথা বলার দরকার অন্যরা বলুক। তখন তোফায়েল ভাই আমাকে বললেন, ‘আমার কিছু করার ছিল না, এটা গণভবনের নির্দেশ।’ তোফায়েল আহমেদ আক্রোশের শিকার হওয়ার শঙ্কায় ভুগতেন। এটিই উনি আমাকে বলেছেন। যাহোক, আমার জানামতে সিরাজুল আলম খান একবার অসুস্থ হলো। উনি প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। ওই সময় তার চিকিৎসার জন্য অনেক চাঁদা তোলা হলো এবং আমি জানি তোফায়েল আহমেদ একটা অঙ্কের টাকা তাকে দিয়েছেন।
একটা ব্যাপার যে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মান ও দাফন। এখানে সম্প্রতি মতিয়া চৌধুরী মারা যাওয়ার পর একটা শোরগোল হয়েছিল। এখন মতিয়া চৌধুরীর ব্যাপারটা অন্যরকম। নিয়ম হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধা গোরস্তানে দাফন করতে হলে মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেখাতে হয়, যেটা দেয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে। ঢাকার জেলা প্রশাসনকে সনদ দেখাতে পারেনি, এজন্য মতিয়া চৌধুরীর দাফন সেখানে হয়নি। একই জিনিস আহমদ ছফার ক্ষেত্রেও হয়েছিল। আহমদ ছফারও মুক্তিযোদ্ধা গোরস্তানে দাফন হয়নি, যেহেতু তার সনদ ছিল না। আমি জানি না, তোফায়েল আহমেদের সনদ আছে কি না বা তার ব্যাপারে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে। আমাদের এখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা কে পাবে, কে পাবে না, কার কবর কোথায় হবে— এটা তো নির্ধারণ করে দেয় রাজনীতি। আমাদের যে প্রচলিত ধারার রাজনীতি, সেই রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদ সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছিলেন। মানে বাংলাদেশের রাজনীতির চলমান ধারায় যত বড় হওয়া যায়, তিনি তত বড় রাজনীতিক ছিলেন এবং রাজনীতির অন্দরমহলের যে ব্যাপার-স্যাপারগুলো আছে, একসময় তিনি তার ভিকটিমও হয়েছেন।
লেখক: গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক





