স্বজনপ্রীতি ও ইসলামের সতর্কবাণী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান কিংবা সমাজের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে দায়িত্বশীল মানুষের ওপর। যে সমাজে যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়, সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং প্রতিষ্ঠান দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য অর্জন করে। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আত্মীয়তা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা তদবিরের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্বে বসানোর প্রবণতা সমাজের ভেতরে অবিচার, দুর্নীতি ও অদক্ষতার বীজ বপন করে। ইসলাম এ ধরনের আচরণকে শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা হিসেবে দেখেনি; বরং একে আমানতের খিয়ানত এবং মানুষের হক নষ্ট করার শামিল বলে বিবেচনা করেছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দাও। আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮)
তাফসিরে ইবনে কাসির, তাফসিরে কুরতুবি ও তাফসিরে তাবারিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই আয়াতে বর্ণিত ‘আমানত’ শুধু ব্যক্তিগত সম্পদের প্রসঙ্গ নয়। তাতে নেতৃত্ব, বিচার, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব ব্যাপারও অন্তর্ভুক্ত। সেই বিবেচনায় কোনো পদে নিয়োগ দেওয়াও একটি ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব, যেখানে ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, যোগ্যতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি হাদিসে এই নীতিকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি কিয়ামত সম্পর্কে জানতে চাইলে নবী (সা.) বললেন, ‘যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।’ সাহাবিরা জানতে চাইলেন, আমানত কীভাবে নষ্ট হবে? তিনি বললেন, ‘যখন দায়িত্ব অযোগ্য লোকের হাতে ন্যস্ত করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৯)
বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে হাজার আসকালানি ফাতহুল বারি গ্রন্থে এই হাদিসটির ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ‘এই হাদিসের উদ্দেশ্য শুধু রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব নয়; যেকোনো দায়িত্বে যোগ্য ব্যক্তিকে উপেক্ষা করে অযোগ্যকে নিয়োগ দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। কারণ এতে ব্যক্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রতিষ্ঠান ও জনস্বার্থ।’
মহানবী (সা.)-এর জীবনেও এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। প্রখ্যাত সাহাবি আবু যর গিফারি (রা.) একবার প্রশাসনিক দায়িত্বের আগ্রহ প্রকাশ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘হে আবু যর! তুমি দুর্বল। আর এ দায়িত্ব একটি আমানত। কিয়ামতের দিন এটি হবে লাঞ্ছনা ও অনুতাপের কারণ। তবে সে ব্যক্তি ছাড়া, যে এর হক আদায় করবে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৮২৫)
আবু যর গিফারি (রা.)-এর ঈমান, তাকওয়া ও মর্যাদা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না। তবু দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকে বিবেচনায় এনে তাকে প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এ ঘটনা প্রমাণ করে, ইসলামে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা বা আবেগ নয়; দায়িত্ব পালনের যোগ্যতাই নিয়োগের মূল মানদণ্ড। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। সুপারিশ কি সবসময়ই নিষিদ্ধ?
ইসলামের উত্তর হলো— না। কোরআন সুপারিশকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি উত্তম কাজে সুপারিশ করবে, সে তার অংশ পাবে। আর যে ব্যক্তি মন্দ কাজে সুপারিশ করবে, সে-ও তার অংশ বহন করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৮৫)
খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে নিয়োগের ক্ষেত্রে এ নীতির বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগের আগে তাদের সততা, কর্মদক্ষতা ও চরিত্র সম্পর্কে বিস্তারিত অনুসন্ধান করতেন। ইতিহাসবিদ ইবন সাদের ‘আত-তাবাকাতুল কুবরা’ এবং ইমাম আবু ইউসুফের ‘কিতাবুল খারাজ’-এর মতো গ্রন্থগুলোতে খলিফা উমরের প্রশাসনিক সতর্কতার বহু দৃষ্টান্ত সংরক্ষিত রয়েছে। তার শাসনব্যবস্থায় আত্মীয়তা বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে জনকল্যাণকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
পবিত্র কোরআন নিয়োগের একটি মৌলিক নীতিও নির্ধারণ করে দিয়েছে। মুসা (আ.)-কে কাজের জন্য সুপারিশ করতে গিয়ে শুয়াইব (আ.)-এর এক কন্যা বলেছিলেন, ‘আপনি তাকে কাজে নিয়োগ করুন। কারণ যাকে আপনি নিয়োগ দেবেন, তার মধ্যে সর্বোত্তম সেই, যে শক্তিশালী এবং বিশ্বস্ত।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ২৬)
ইমাম কুরতুবি (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, দায়িত্ব পালনের জন্য দুটি গুণ অপরিহার্য— সক্ষমতা ও আমানতদারিতা। এ দুই গুণের সমন্বয়ই একজন আদর্শ দায়িত্বশীল ব্যক্তির পরিচয়।
আজকের সমাজে স্বজনপ্রীতি ও তদবিরের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে মেধা ও ন্যায়বোধের ওপর। যখন একজন যোগ্য প্রার্থী বারবার দেখে যে পরিশ্রমের চেয়ে পরিচয়ের মূল্য বেশি, তখন তার মধ্যে হতাশা জন্ম নেয়। প্রতিষ্ঠান দক্ষ জনবল হারায়, আর সেই সুযোগ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে দুর্নীতি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস: ৮৯৩)
একটি নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর শুধু প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আল্লাহর সামনে জবাবদিহির একটি অঙ্গীকার। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, তদবির ও ব্যক্তিগত প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করা একজন মানুষের অধিকার নষ্ট করার পাশাপাশি নিজের আমানতেরও খিয়ানত করা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




