স্পষ্ট হচ্ছে শুভংকরের ফাঁকি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গত দুই দশকে বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক জীবনে যে পরিবর্তন এসেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। একসময় যে রিকশাচালকের হাতে মোবাইল ফোন থাকাটাই ছিল বাড়তি কিছু, আজ তার হাতেও স্মার্টফোন; অন্তত একটি বাটন ফোন থাকা এখন আর বিস্ময়ের বিষয় নয়। যে মধ্যবিত্ত পরিবার তিন বছরে একবার কক্সবাজার যেতে পারলেই আনন্দিত হতো, সেই পরিবার এখন বছরে একবার থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুর ভ্রমণকে জীবনের স্বাভাবিক অর্জন হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক অগ্রগতির গল্প। আয় বেড়েছে এবং মানুষ শুধু বেঁচে থাকার জন্য ব্যয় করছে না; বরং জীবনযাত্রার আরাম-আয়েশের জন্য ব্যয় করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
কিন্তু এই ইতিবাচক পরিবর্তনের আড়ালে কি আমরা কোনো শুভংকরের ফাঁকি রেখে দিয়েছি? আজ যখন অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে এসেছে এবং মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের আর্থিক চাপ ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে, তখন প্রশ্নটি করা যেতেই পারে— এই পরিস্থিতির বীজ কি আসলে অনেক আগেই বোনা হয়েছিল?
মানুষ যখন অতিদারিদ্র্যের সীমা পেছনে ফেলে কিছুটা স্থিতিশীল আর্থিক অবস্থায় পৌঁছায়, তখন শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সক্ষমতা দিয়ে তার অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন পরিমাপ করা আর যথেষ্ট নয়। ফলে অর্থনৈতিক সংকট শুরু হলে তার প্রথম লক্ষণও সবসময় ক্ষুধা বা অনাহার হিসেবে দেখা যায় না। বরং মানুষ ধীরে ধীরে সেই ব্যয়গুলো কমাতে শুরু করে, যেগুলো ছাড়াও বেঁচে থাকা সম্ভব। অর্থাৎ সংকটের প্রথম প্রতিক্রিয়া অনেক সময় মৌলিক চাহিদা ত্যাগ নয়; বরং জীবনযাত্রার মান এবং পছন্দের পরিসর সংকুচিত করা। এই পরিবর্তনগুলো অনেক সময় জাতীয় পরিসংখ্যানের চেয়েও আগে ধরা পড়ে পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাপনে।
যে মধ্যবিত্ত ক্রেতা আগে বাজারে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ‘বেগুন কত কেজি?’ তারপর এক কেজি শসা ও আধা কেজি বেগুন কিনতেন, তিনি এখন হয়তো তিনটি বেগুন ও পাঁচটি শসা তুলে দিয়ে বলছেন, ‘যা হয় দাম ধরে দেন।’ মুরগি বিক্রেতা হঠাৎ লক্ষ করছেন, তার সোনালি মুরগির নিয়মিত ক্রেতা আজকাল বয়লার মুরগি কিনছেন। এগুলো হয়তো কোনো একক পরিবারের দৃষ্টিতে খুব ছোট পরিবর্তন; কিন্তু হাজার হাজার পরিবারের আচরণে একই পরিবর্তন দেখা দিলে তা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হয়ে ওঠে।
গত এক দশকে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ পর্যটন, হোটেল-রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং বিনোদনভিত্তিক ব্যবসা দ্রুত বিস্তৃত হয়েছিল। এর পেছনে ছিল মানুষের হাতে বাড়তি অর্থ আসা এবং সেই অর্থের একটি অংশ অভিজ্ঞতা, বিনোদন ও ভ্রমণে ব্যয় করার প্রবণতা। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, ঈদের ছুটিতেও সিলেটের ৫০-৬০ শতাংশ হোটেল-মোটেল খালি ছিল এবং জাফলংয়ের বিলাসবহুল রিসোর্টগুলোর বুকিং ছিল মাত্র ২০-২৫ শতাংশ। সাদা পাথরে যেখানে ঈদের সময় প্রতিদিন ৪০০-৪৫০টি নৌকা ট্রিপ দিত, সেই সংখ্যা নেমে এসেছিল প্রায় ১০০-তে। এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলোই অনেক সময় অর্থনৈতিক সংকটের প্রথম দৃশ্যমান চিহ্ন।
বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ তাই শুধু অর্থনীতিকে আবার আগের গতিতে ফিরিয়ে নেওয়া নয়; বরং এমন একটি প্রবৃদ্ধির কাঠামো তৈরি করা, যেখানে মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা টেকসইভাবে বাড়বে, সরকারি বিনিয়োগ উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে
তাই এসব খাতে চাহিদার পরিবর্তনকে শুধু একটি নির্দিষ্ট ব্যবসার সমস্যা হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় অর্থনৈতিক তাৎপর্য ধরা পড়ে না। এ কারণে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, পর্যটন পরিবহন, স্থানীয় গাইড, নৌকা, ক্ষুদ্র দোকান কিংবা বিনোদন কেন্দ্রের ব্যবসা শুধু পর্যটন খাতের স্বাস্থ্য নয়; এগুলো মানুষের অতিরিক্ত ব্যয় করার সক্ষমতারও একটি পরোক্ষ সূচক।
এখন প্রশ্ন হলো, এই সংকট কি আসলে সাময়িক?
কভিড মহামারী, ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করেছে। এগুলো আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার এবং উৎপাদন ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলেছে। ফলে অর্থনীতির বর্তমান মন্থরতার একটি অংশ যে বহিরাগত অভিঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু পুরো সমস্যাকে যদি শুধু বাইরের সংকটের ফল হিসেবে দেখি, তাহলে আবারও সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হবে, আমাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যে কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়েছিল, সেই কাঠামো কতটা টেকসই ছিল?
অর্থনীতির উন্নয়নকে বোঝানোর জন্য বেশ কিছু পদ্ধতি ও সূচক প্রচলিত। এর মধ্যে একটি হলো ধনীদের সম্পদ চুইয়ে চুইয়ে ছড়িয়ে যাবে গবির মানুষের দুয়ার পর্যন্ত। সেই সম্পদের ফোঁটা যখন গরিব পাবে, তাতে গরিবের হাতেও অর্থ যাবে, সেটি গরিব খরচ করবে। আমরা বলব, গরিবের হাতেও টাকা আছে, সেও বাজারে অংশগ্রহণ করছে।
আরেকটি হলো সরকারের বিনিয়োগ বাড়ানো। সরকার যদি সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ, বন্দর ও নগর অবকাঠামোর মতো বড় প্রকল্প গ্রহণ করা শুরু করে লম্বা সময় ধরে, তাহলেও সরকারি অর্থ বাজারে যাবে। তবে এই প্রকল্পগুলোর সিংহভাগ প্রকল্পই যদি মূলত পুঁজি ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়, তবে সেই টাকার বৃহৎ অংশ যাবে ধনীদের হাতে। ফলে আবার সেই ধনীদের সম্পদ চুইয়ে চুইয়ে ছড়িয়ে যাবে গবির মানুষের দুয়ার পর্যন্ত। এতেও গরিব কিছু টাকা পাবে। এই প্রক্রিয়ায় উন্নতি নির্দেশের জন্য আবার স্বেচ্ছাচারী ও উদ্ভট কিছু পরিমাপ পদ্ধতি প্রচলন রয়েছে, যেমন— জিডিপি, মাথাপিছু আয় এবং ভোগ্যপণ্যের সহজলভ্যতা সূচক।
বাংলাদেশের যে উন্নয়ন, তার অনেকটাই হয়েছে এভাবে। এরকম উন্নয়নের সংকট হলো এ ধরনের বিনিয়োগ সরকারের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে চালু রাখা সম্ভব হয় না। যখন এটি কমে আসে বা ধীর হয়, তখন এ প্রক্রিয়ায় অর্থনীতিতে আসা অর্থের জোগানও বন্ধ হয়ে যায়। আবার সরকারের আগের বিনিয়োগের জন্য করা ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়ে। ফলে অর্থনীতি থেকে অর্থ চলে যাওয়া শুরু করে।
একই সময়ে যেসব ব্যবসায়ী বা গোষ্ঠী সরকারি ব্যয় ও বড় প্রকল্পকেন্দ্রিক অর্থনীতির মাধ্যমে সম্পদ তৈরি করেছে, তাদের একটি অংশ যদি সেই অর্থ উৎপাদনশীল নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে জমি, ফ্ল্যাট, বিদেশি সম্পদ, বিলাসী ভোগ কিংবা আর্থিক সম্পদে সরিয়ে নেয়, তাহলে অর্থনীতিতে চাহিদা ও বিনিয়োগ দুই দিকেই চাপ তৈরি হতে পারে। তখন একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়।
পরিসংখ্যানে হয়তো এখনো বড় কোনো বিপর্যয় দেখা যাচ্ছে না। মানুষ এখনো খাচ্ছে, পোশাক পরছে, মোবাইল ব্যবহার করছে, সন্তানকে স্কুলে পাঠাচ্ছে। কিন্তু একই মানুষ আগের মতো মাছ কিনছে না, চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে, ভ্রমণ বাদ দিচ্ছে, বিয়ের অনুষ্ঠান ছোট করছে, নতুন গাড়ি কেনা স্থগিত করছে, রেস্টুরেন্টে যাওয়া কমাচ্ছে। অর্থাৎ অর্থনীতি ভেঙে পড়ার আগে তার জীবনযাত্রা সংকুচিত হতে শুরু করেছে।
তাই সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চাপকে শুধু কভিড, ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট কিংবা সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতার ফল হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। এসব বহিরাগত অভিঘাত সংকটকে তীব্র করেছে, কিন্তু সংকটের ভিত্তি তৈরি হয়েছে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরেই। এটি এমন একটি প্রবৃদ্ধির মডেল, যেখানে সরকারি ব্যয়, বড় প্রকল্প, আমদানিনির্ভর ভোগ এবং সীমিতসংখ্যক খাত ও গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি করেছে। বাস্তবতা হলো, এ ধরনের অর্থনৈতিক কাঠামো দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীল চাহিদা ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারার জন্য উপযুক্ত নয়। বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ তাই শুধু অর্থনীতিকে আবার আগের গতিতে ফিরিয়ে নেওয়া নয়; বরং এমন একটি প্রবৃদ্ধির কাঠামো তৈরি করা, যেখানে মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা টেকসইভাবে বাড়বে, সরকারি বিনিয়োগ উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে এবং মানুষের ভোগের সক্ষমতা কৃত্রিমভাবে ফুলে ওঠা নয়, বাস্তব উৎপাদনশীলতার ওপর দাঁড়াবে।
লেখক: উন্নয়নকর্মী




