গবেষণাহীন উচ্চশিক্ষায় শুধুই অপচয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সাধারণত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাকে সব দেশে উচ্চশিক্ষা নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। উচ্চশিক্ষা কোনো দেশে সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। মূলত স্কুল শিক্ষাই সব দেশে বাধ্যতামূলক হয়ে থাকার নিয়ম রয়েছে। এটি আধুনিক দুনিয়ায় উন্নত দেশগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করে থাকে। স্কুলপর্যায়ের শিক্ষাক্রমে বিশেষজ্ঞরা জীবন ও কর্মদক্ষতার মান নির্ণয় করেই পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, পঠন-পাঠনের প্রণালি নির্ধারণ এবং দক্ষতা অর্জন ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা করে থাকেন। ফলে উন্নত দেশেগুলোর বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর স্কুল শিক্ষা শেষে কর্মজীবনে স্বেচ্ছায় প্রবেশ করতে কোনো বাধা থাকে না। এতে তাদের কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে তেমন কোনো সমস্যা হয় না।
উচ্চশিক্ষা লাভে উন্নত বিশ্বে যেসব শিক্ষার্থীকে সুযোগ দেওয়া হয়, তারা এসব বিষয়ে আধুনিক বিশ্বমানের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ধারণা লাভের সব সুযোগ পেয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের সেসবই সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করতে হয়। উচ্চশিক্ষার শিক্ষাক্রম প্রতিনিয়ত বাস্তব কর্মক্ষেত্র এবং দুনিয়ার তথ্য ও প্রযুক্তি-সম্পর্কীয় ধারণার চলমান বিকাশকে ধারণ-গ্রহণ ও পর্যালোচনার মধ্যে রাখা হয়। ফলে শিক্ষার্থীদেরকে শুধু শ্রেণিকক্ষ কিংবা পাঠাগারনির্ভর থাকলেই চলে না, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের শুরু থেকেই স্বীয় পছন্দের বিষয়ের ওপর গবেষণাকর্ম সম্পাদন করতে হয়। এর জন্য তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহায়ক সব সুযোগ-সুবিধা অবধারিত থাকে। শিক্ষার্থীরাও গবেষক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবেচিত হয়ে থাকে। সে কারণেই উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন ও চর্চায় শুধু নয়, উৎপাদন-পুনরুৎপাদনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে ও বিবেচিত হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রতিটি কলেজ বা সমমানের ইনস্টিটিউটকে ও মূল প্রতিষ্ঠানের চাহিদা পূরণ করতেই হয়। সে কারণে উন্নত বিশ্বে অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার মানগত কোনো অভিযোগ থাকে না। কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে চলে জ্ঞানবিজ্ঞান ও গবেষণার প্রতিযোগিতা। শিক্ষক গবেষক ও শিক্ষার্থীদের এ প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থাকতে হয়। এর কোনো ব্যত্যয় ঘটলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখনই কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির মধ্যে ফেলা হয়। সুতরাং উন্নত বিশ্বের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা যথার্থ অর্থেই উচ্চতর জ্ঞানবিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবনী কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত থাকে। সে কারণে সেসব প্রতিষ্ঠান দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মানের প্রতিযোগিতায় নিজেদের উন্নীত করে রাখতে পারে। যারা উচ্চশিক্ষার নির্ধারিত শিক্ষাক্রম এবং গবেষণার মান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়, তাদের শিক্ষার গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পায়।
আমাদের দেশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত কয়েকটি কলেজ উচ্চশিক্ষার হাল ধরেছিল। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। দেশবিভাগের পর অনেক প্রখ্যাত শিক্ষক ও গবেষক দেশ ছেড়ে যাওয়ার ফলে অনেক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি পূরণের চেষ্টা ধারাবাহিকভাবে বিকশিত করার উদ্যোগ পাকিস্তান রাষ্ট্র নেয়নি। তা ছাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য বৈষম্যের প্রভাব শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও পড়েছিল। ফলে আমাদের কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষার আধুনিক মান এবং গবেষণার পদ্ধতি রক্ষা করতে পারেনি।
আমাদের উচ্চশিক্ষায় মেধার বিকাশ কতটা ঘটছে, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। বলা চলে, মেধার বিকাশের চেয়ে অপচয় বেশি ঘটছে
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোনো যুগোপযোগী শিক্ষাভিত্তিক কর্মসূচি ও ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অনুসরণ করা হয়নি। ফলে দেশে উচ্চশিক্ষায় মানের অধোগতি দ্রুত স্থান দখল করে নিতে শুরু করে। দেশে একসময় চারটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের অধিভুক্ত কয়েকটি কলেজের কিছু বিষয়ের স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর শিক্ষাক্রম চললেও গবেষণার ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই খুব একটা অনুষ্ঠিত হয়নি। আশি এবং নব্বইয়ের দশক থেকে দেশে সরকারি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোকে নিয়ে প্রশাসননির্ভর একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৫৫৫টি সরকারি কলেজ এবং ১৭০২টি বেসরকারি কলেজসহ সর্বমোট ২২৫৭টি কলেজ রয়েছে। সব ধারার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৯টি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৫টি। দেশের এসব কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর কয়েক লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক এবং স্নাতক-সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হচ্ছে। একথা এখন নির্দ্বিধায় বলা চলে, খুব সামান্যসংখ্যক সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক পঠন-পাঠনের সঙ্গে গবেষণার কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই মানসম্মত গবেষণার কোনো ধারণা প্রচলিত নেই। সব কলেজ এবং বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাক্রমে উচ্চশিক্ষার ধারণা বাস্তবে প্রায় অনুপস্থিত বললেই চলে। বলা চলে বাংলাদেশে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা এখন প্রায় পুরোপুরি গবেষণাবিহীন চলছে। শিক্ষার্থীরা সেমিস্টারভিত্তিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে এবং যথানিয়মে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বের হয়ে আসছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রাপ্ত সনদের সঙ্গে বিষয়গত জ্ঞান অর্জনের কোনো মান যাচাই করা হয় না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে স্নাতক পাস, (স্নাতক সম্মান) মাস্টার্স ডিগ্রি নেওয়ার জন্য লাখ লাখ শিক্ষার্থী কলেজগুলোতে ভর্তি হয়, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে থাকে। কিন্তু কলেজগুলোতে উচ্চশিক্ষার বালাই সবক্ষেত্রেই প্রশ্নবোধক হয়ে আছে। স্নাতক সম্মান কিংবা মাস্টার্সে পড়ানোর মতো যোগ্য ও উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষক নেই বললেই চলে। শিক্ষার্থীদেরও কলেজে খুব একটা উপস্থিতি দেখা যায় না। গবেষণার প্রশ্নটি একেবারেই যেন নিরর্থক! সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চেয়ে অলসতা এবং অন্যান্য রাজনৈতিক কাজে ব্যস্ততা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে এখন বই-পুস্তক নিয়ে ব্যস্ত থাকতে শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদেরকে দেখা যায় না। স্বল্পসংখ্যক কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্রুত সেমিস্টার সম্পন্ন করার তাগিদ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহশিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ততা শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা গেলও বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সেটিও নেই বললে চলে। ফলে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় সত্যিকার অর্থে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান দক্ষতা এবং গবেষণার ধারণা অনেকটাই বাস্তবে অনুপস্থিত দেখা যাচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের যদি ধারাবাহিকভাবে মানসম্মত পঠন-পাঠনসমৃদ্ধ শিক্ষাক্রম ও গবেষণায় ব্যস্ত রাখা যেত, তাহলে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিয়ে কর্মক্ষেত্র প্রবেশ করতে সক্ষম হতো, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের উচ্চশিক্ষার নামে এতসব বিভিন্ন ধারা ও উপধারার প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোতে উচ্চশিক্ষার মান অনুসরণ করার কোনো বাধ্যবাধকতাই নেই। কিন্তু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা উচ্চশিক্ষার সনদ নিয়ে বের হচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগের মধ্যেই বিষয়ভিত্তিক তত্ত্বীয় ও প্রায়োগিক কোনো ধারণাই পরিলক্ষিত হয় না। ফলে আমাদের উচ্চশিক্ষায় মেধার বিকাশ কতটা ঘটছে, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। বলা চলে, মেধার বিকাশের চেয়ে অপচয় বেশি ঘটছে। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা বেশ ব্যয়বহুল। আমাদের রাষ্ট্র কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় মোটামুটি যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করে থাকে। সে কারণে অনেক দরিদ্র ঘরের সন্তানও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু গবেষণাহীন যে উচ্চশিক্ষাক্রম আমাদের দেশে চলছে, তা এখন একুশ শতকের চাহিদা পূরণের সঙ্গে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয়। এক্ষেত্রে পরিবর্তন এবং নতুন নতুন জ্ঞান তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ধারণার প্রয়োগ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে খুব একটা নেই। আমরা তাই বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষার বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে ছিটকে পড়ে আছি। আমাদের বোধোদয় কি আদৌ হবে?
লেখক: অধ্যাপক, গবেষক





