ময়মনসিংহের বার বাংলার ঘর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
লোকসাহিত্য বাংলাদেশের নিজস্ব সম্পদ। আমাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের মূল সুর এতে বিধৃত। আর লোকায়ত বাংলার মধ্য দিয়ে আমাদের পরিচিত জগতের, জীবনের একটা অন্তরঙ্গ ছবি ফুটে ওঠে। আর লোকায়ত বাংলাদেশের উপজীব্য বিষয় লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও গবেষণা করে আমাদের সাহিত্যকে নতুন জীবন দান করা। এ নিরিখে আমরা ময়মনসিংহ গীতিকা থেকে তথ্যানুসন্ধান করে বিভিন্ন পালা বিধৃত কাহিনি অবলম্বনে লোকায়ত বাংলা পর্বে আজকের বিষয়— ‘ময়মনসিংহের বার বাংলার ঘর’। বাংলাদেশের নিপুণ ঘরামি বা ছাপরবনদের শিল্প প্রতিভার এক উজ্জ্বলতম নিদর্শন এই বার বাংলার ঘর।
অত্যন্ত ব্যয়বহুল, শৌখিন এবং আভিজাত্য-সংশ্লিষ্ট এ গৃহগুলো যে গোটা উপমহাদেশের স্থাপত্যশিল্পের ইতিহাসে গৌড়ীয় বা বাংলা রীতি নামে পরিচিত ছিল, সে কথা যেমনি বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো, তেমনি সেরূপ ময়মনসিংহের বিশিষ্টতাও সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ময়মনসিংহ গীতিকার বিভিন্ন পালার বিভিন্ন অংশে বাংলা ঘর, বার বাংলার ঘর, বার দুয়াইরা ঘর ইত্যাদি বহুতর নামে এ ঘরের বহুল উল্লেখ পরিলক্ষিত। বার বাংলার ঘর প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ গীতিকায় মলুয়া বিনোদকে তার বাপের বাড়ির রাস্তা নির্দেশ করে যে কথা বলেছে, তা হলো— ‘সেই পন্থ ধইরা তুমি মেলা নাই সে কর।/ এই পন্থে যাইতে দেখবা বার দুয়াইরা ঘর।।’
ওই পালায় উল্লিখিত তথ্যানুযায়ী, বিনোদ নিজেও একজন নিপুণ ছাপরবন। ময়মনসিংহ অঞ্চলে গৃহনির্মাণের একটি সুন্দর বর্ণনা পাই বিনোদের স্বহস্ত নির্মিত গৃহের মধ্যে। ময়মনসিংহ গীতিকার ‘মলুয়া’ পালায় তার বর্ণনা এভাবে— ‘কামলার কাম বিনোদ তাও ভালা জানে।/ ভালা কইরা বান্ধে বাড়ি সূত্যা নদীর কানে।/ আটচালা চৌচালা ঘর বান্ধিয়া সুন্দর।/ ভাল কইরা বান্ধে বিনোদ বার দুয়াইরা ঘর।/ শীতলপাটি দিয়া বিনোদ ঘরে দিল বেড়া।/ উলুছনে ছাইল চাল দেখতে মনহারা।।/ ঝাপে ঝুপে করে বিনোদ কামলার কাম।/ দেখিতে সুন্দর বাড়ী চান্দের সমান।।/ মাছুয়া পক্ষীর পাখ দিয়া সাজোয়া বানায়।/ কামলা ডাকিয়া বিনোদ পুস্কুনি কাটায়।।’ বার বাংলার ঘর ময়মনসিংহ গীতিকার বিভিন্ন পালায় অপূর্ব সৌকর্যমণ্ডিত হয়ে গীতিকা সাহিত্যে স্থান পেয়েছে। এক পালা থেকে অন্য পালার বর্ণনা ভিন্নতর ব্যঞ্জনায় প্রতিভাত হয়েছে। যেমন ‘রূপবতী’ পালাটি শুরু হয়েছে এভাবে— ‘রাজ্য করে রাজচন্দ্র রামপুর শহরে।/ বার-বাংলার ঘর বানছে ফুলেশ্বরীর তীরে।।’ এই বার বাংলার ঘর সম্পর্কে কামিনী কুমার রায় তার লৌকিক শব্দকোষ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন— ‘তখনকার দিনে বিত্তশালী অনেকেই যেমন মঠমন্দির নির্মাণ করিয়া পরকালের পথ সুগম করিতেন, তেমনি ইহকালের খ্যাতি প্রতিপত্তি বৃদ্ধির জন্য অনবদ্য কারুকার্যমণ্ডিত বার বাংলার ঘর নির্মাণে উদ্যোগী হইতেন। বাড়ির বাহিরের দিকে এই সকল ঘর তৈয়ার করা হইত। দেশের বিভিন্ন স্থান হইতে ঘর-দরজার কাজে নামকরা শিল্পীদের উচ্চ পারিশ্রমিকদানের প্রতিশ্রুতিতে আহ্বান করিয়া আনা হইত। নির্বাচিতেরা মাসের পর মাস, এমনকি বৎসরের পর বৎসর কাজ করিয়া এক একটি ঘরের শিল্পকার্য শেষ করিতেন। এই সকল ঘরের উপকরণ ইট পাথর সিমেন্ট বালি নয়, বাঁশ বেত চটী পাটি উলুখড় প্রভৃতি সামান্য উপকরণ লইয়া শিল্পীরা কাজ করিতেন। বেড়ায়, ঝোপে, চাঁদারে সামান্য একটি বাখারিতে, এক টুকরো শীতলপাটিতে তাহারা এমন সব কারুকার্য করিতেন, পুরাণ ইতিহাসের কথা কাহিনি রূপায়িত করিয়া তুলিতেন, যাহা দেখিবার জন্য দূরদূরান্ত হইতে দলে দলে লোক ছুটিয়া আসিত ‘ বার বাংলার ঘর সাধারণত চৌকারী বা চারচালবিশিষ্ট; এর প্রধান উপকরণ বাঁশ, কাঠ, সুন্দিবেত, উলুছন, শীতলপাটি ইত্যাদি। গৃহনির্মাণে এসবের ব্যবহার ময়মনসিংহ গীতিকায় বহুল পরিমাণে দৃষ্ট হয়। বিনোদ তার বার দুয়াইর্যা ঘরে শুধু উলুছন শীতলপাটিই ব্যবহার করেনি, সে তার গৃহে মাছুয়া পাখির পালক দিয়া সাজুয়া বানায়। সুন্দিবেতের উল্লেখও অপ্রচুর নয়। যেমন ময়মনসিংহ গীতিকার ‘কমলা’ পালাটিতে তার বর্ণনা এভাবে— ‘চৌচালা আটচালা তার ঘর যতখানি।/ সুন্দিবেতে বান্ধা আর উলুছনে ছানি।।’ ময়মনসিংহ গীতিকায় বিধৃত ‘বার বাংলার ঘর’ আমাদের লোকসাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। যাতে ফুটে উঠেছে লোকায়ত বাংলারই মুখ।
l লেখক: শিক্ষাবিদ



