কিউবার অভিজ্ঞতা এবং আমাদের শিক্ষা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চোখের জটিল চিকিৎসার জন্য কয়েক বছর আগে কিউবায় আমাকে তিনবার যেতে হয়েছিল। চিকিৎসার ফাঁকে কয়েকটি স্কুল এবং হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে গিয়েছিলাম। দুটি স্কুলের শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে গিয়ে তাদের লেখাপড়ার ধরন-ধারণ প্রত্যক্ষ করেছি, বই-পুস্তক নেড়েচেড়েও দেখেছি। কয়েকজন শিক্ষার্থীকে কোচিং এবং গাইড বইয়ের কথা জিজ্ঞেস করতে তারা প্রথমে কোনো উত্তর দিতে পারেনি। তারা জানিয়েছে, গাইড বই, প্রাইভেট কোচিং সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই, ক্লাসেই তাদের সব বুঝিয়ে দেওয়া হয়। স্কুল শেষে তারা খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে ক্লাবে সময় কাটায়। উন্নত দেশগুলোতেও এভাবেই শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, জ্ঞান অর্জন এবং মেধার বিকাশ ঘটানো হয়ে থাকে। উচ্চতর স্তরে তাদের ব্যাপকভাবে প্রস্তুত হওয়ার শিক্ষা স্কুলেই দেওয়া হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক হওয়ার শিক্ষা পেয়ে থাকে। অথচ আমরা গাইড বই ও কোচিংনির্ভরতার প্রসার ঘটিয়ে গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকেই মানহীন এবং জাতির জন্য প্রায় অপ্রয়োজনীয় করে ফেলেছি।
গত ৩০-৪০ বছরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে গাইড বই এবং কোচিং ব্যবস্থা ভয়ানকভাবে ফুলেফেঁপে উঠেছে। ফলে গোটা শিক্ষাব্যবস্থাই শিক্ষার আদর্শ হারিয়ে ফেলেছে বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না। বলা চলে, এখন দেশে শিক্ষাব্যবস্থার প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং কলেজ পর্যন্ত সবটাই এই দুই আরোপিত অপপ্রভাব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাও মান হারিয়ে ফেলেছে।
মূলত আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই প্রশ্ন করা, নিজে নিজেই প্রকাশ করা এবং লেখার কোনো শিক্ষাই শ্রেণি পাঠে থাকে না। তাই তারা তাদের মনে জাগা প্রশ্নের উত্তর লিখতে কিংবা জানতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে না
দেশে শিক্ষাব্যবস্থা শুরুর দিকেই শিশুদের অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নানা কোচিং সেন্টার, কিংবা প্রাইভেট টিউটরের ওপর নির্ভরশীল করা হয়। এর জন্য অভিভাবকদের শিশুদের শিক্ষা সম্পর্কে অজ্ঞানতা এবং নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনেকটাই দায়ী। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না হতেই তাদের শিশুদের ওপর নানা ধরনের চাপ পড়তে থাকে। এই চাপ হজম করার জন্য তাদের কোচিং অথবা গৃহশিক্ষকদের কাছে পাঠানো হয়।
শিশুদের জন্য পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বইকে অনেক অভিভাবকই যথেষ্ট মনে করেন না, তাই তারা শিশুদের খেলাধুলা এবং মানসিক বিকাশে নানা উদ্যোগ থেকে বঞ্চিত করতে থাকেন। এই জায়গায় কালো দূতের আসনে গাইড বই নিয়ে হাজির হন নানা প্রকাশক ও শিক্ষক। শিক্ষকদের অনেকেই আর্থিক সুবিধা পেয়ে এসব গাইড বই কেনার জন্য অভিভাবকদের প্রলুব্ধ করে থাকেন। যত ওপরের শ্রেণিতে শিশুরা উঠতে থাকে, তত তাদের ওপর গাইড বই ও কোচিংয়ের চাপ বাড়তে থাকে। পরীক্ষা নামক কোনো ব্যবস্থার সুযোগ থাকলে তো কথাই নেই। একসময় পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষার প্রবর্তন করা হয়েছিল। সেটিতে গাইড বই এবং কোচিংয়ের ব্যবসা দেশব্যাপী রমরমা হয়ে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত সেসব পরীক্ষা বাতিল করা হয়। এখনো নানা ধরনের বৃত্তি পরীক্ষার নামে গাইড বই, কোচিং নামক দুই দুষ্টচক্রের হাতে আমাদের ওই পর্বের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ভয়ানকভাবে জিম্মি হয়ে আছে। স্কুলপর্যায়ে যেসব পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত হতে থাকে, সেগুলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষকদের একটি বিরাট অংশ প্রাইভেট পড়ানোর ব্যবস্থা করে রেখেছে। ফলে শ্রেণি পাঠদানে তাদের দুর্বলতা বাস্তবিক হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের কোচিংনির্ভরশীলতা বেড়ে ওঠে। পরীক্ষায় বেশিরভাগ শিক্ষার্থী প্রশ্নপত্রের উত্তরদানে নিজেদের বুদ্ধির প্রয়োগ ঘটাতে না পারার কারণ থেকেই গাইড বইয়ের ওপর তাদের নির্ভর করতে হয়। মূলত আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই প্রশ্ন করা, নিজে নিজেই প্রকাশ করা এবং লেখার কোনো শিক্ষাই শ্রেণি পাঠে থাকে না। তাই তারা তাদের মনে জাগা প্রশ্নের উত্তর লিখতে, কিংবা জানতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা নিজের সক্ষমতা, দক্ষতা ও মেধার উন্মেষ এবং বিকাশ ঘটাতে পারে না। সে কারণেই গাইড বই এবং কোচিং শিক্ষাব্যবস্থা এতটা প্রতাপশালী হয়ে উঠেছে। এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করেই শুধু এই দুই দুষ্টচক্র ভ্রান্ত থাকেনি। কলেজগুলোতে এমনকি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্বেও এই দুই অনুষঙ্গের ওপর বেশিরভাগ শিক্ষার্থী নির্ভরশীল। তারা সে কারণেই শ্রেণিকক্ষে খুব একটা উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই অনার্স-মাস্টার্স পাস করেও কোনো একটি মৌলিক পাঠ্যবইয়ের নাম কিংবা তাদের লেখকদের নাম জানে না। তারা খুব ভালোভাবে পরিচিত হয় বিভিন্ন গাইড বইয়ের নামের সঙ্গে। সেগুলো দিয়েই তাদের এত বড় ডিগ্রি অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে। এর েচয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় আমাদের জাতির শিক্ষাজীবনে আর কিছু হতে পারে কি?
এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা শেষে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে ভর্তি করাতে যারপরনাই উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। দেশে নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে নানা ধরনের কোচিং সেন্টারের নামে বিজ্ঞাপন অনলাইনে ভাসতেই থাকে। দেশব্যাপী এসব কোচিং সেন্টারের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে গেছে। দুঃখজনক হলো, সবকটি কোচিং সেন্টার পরিচালিত হয় বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের দ্বারা। তারপরও এসব কোচিং সেন্টার খুবই জনপ্রিয় এবং শিক্ষার্থীদের নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে! বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল এবং মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার জন্য একমাত্র উপায় যেন কোচিং সেন্টার থেকে পাওয়া ও নেওয়া ‘বিদ্যার্জন’ দ্বারা সম্ভব! এক কথায়, বাংলাদেশে এখন শিক্ষার মহাওষুধ যেন কোচিং সেন্টার এবং গাইড বইতেই পাওয়া সম্ভব! ফলে প্রমাণিত হয়, আমাদের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই খুব একটা প্রয়োজন নেই, এগুলো তো দেওয়া বা পাওয়া শিক্ষা দিয়েই আমরা ভালো শিক্ষার্থী তৈরি করতে পারছি না বা পারব না? আমাদের চোখের সামনেই বছরের পর বছর শিক্ষাব্যবস্থায় এমন দুষ্টচক্র বিরাট আসন গেড়ে বসেছে। অথচ এসবের সমালোচনা কিংবা মারাত্মক ক্ষতি নিয়ে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ প্রতিকারের কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। মাঝেমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোচিং কিংবা গাইড বই নিয়ে নানা ধরনের নির্দেশনা দিয়ে থাকে; কিন্তু সেসব নির্দেশনা কোনো ক্ষেত্রেই কার্যকর হতে দেখা যায় না।
অথচ আমাদের দেশেই ৫০-৬০ বছর আগে এমনটি প্রায় ছিল না বললেই চলে। পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে আমরা যারা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে পড়েছি, তাদের কাছে পাঠ্যবইয়ের গুরুত্বই ছিল সবচেয়ে বেশি। শিক্ষকদের বাড়ির আঙিনায় কোনো শিক্ষার্থীকেই প্রবেশ করতে দেখা যেত না। কোনো কিছু বুঝতে অসুবিধা হলে শিক্ষকরা বিদ্যালয়েই সেটি বুঝিয়ে দিতেন। অঙ্ক ও ইংরেজির মতো বিষয়ে কারও বেশি দুর্বলতা থাকলে অভিভাবকরা অনুরোধ করে কোনো শিক্ষককে বড়জোর দুয়েক মাস বিদ্যালয়ে ক্লাস শেষে কিছু সময়ের জন্য অতিরিক্ত পাঠদান করাতে সম্মত করতেন। অনেক শিক্ষকই এর জন্য কোনো টাকা নিতেন না, কেউ নিলেও তা শিক্ষক এবং অভিভাবকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু এখন সে শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্দান্ত মহাপ্রতাপশালী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কোচিং সেন্টার ও গাইড বই।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যদি উন্নত করতে চাই, তাহলে প্রথমেই আমাদের এই কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক




