ফ্রান্স ও ইতালিতে সন্তানের ভাঙচুরের দায় এবার মা-বাবার?

পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে ভেঙে যায় একটি দোকানের জানালা। ১৯ অক্টোবর মিলানে কাঠের তক্তা দিয়ে জানালাটি মেরামত করছেন শ্রমিকেরা
ফ্রান্সে গত মাসে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের বিক্ষোভ থেকে টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে নিচ্ছেন। অবশ্য এর পেছনে কিছু কারণ আছে। দেশটি সন্তানদের ভাঙচুর বা সম্পত্তির ক্ষতিসাধনের ঘটনায় অভিভাবকদের জরিমানা করার কথা ভাবছে। একই ধরনের ব্যবস্থা চলতি সপ্তাহে চালু হয়েছে ইতালিতেও।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় কমানোর প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ অনেকে তরুণ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। একই ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে ইতালির বিভিন্ন শহরেও, যার অনেকগুলোই সহিংস রূপ ধারণ করে। বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেডে আগুন দিয়েছেন, পুলিশের বিরুদ্ধেও উঠেছে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ।
ফ্রান্স ও ইতালিতে বিক্ষোভের কারণ কী
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্যারিসের উত্তরের শহরতলি সেইন-সাঁ-দেনিতে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্কুল ভবনের বেহাল অবস্থা এবং শিক্ষক স্বল্পতার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রস্তাবিত সরকারি বাজেট নিয়েও তারা বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ ছিলেন। ওই বাজেটে সরকারি ব্যয় থেকে কয়েক মিলিয়ন ইউরো কমানোর পরিকল্পনা ছিল।
প্রথমে প্যারিস এবং পরে দেশটির অন্যান্য শহরের শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্কুলের চারপাশে ব্যারিকেড তৈরি করেন। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে এর ফলে শত শত স্কুল বন্ধ হয়ে যায়।
পরে সরকারি কর্মীরা বেতন স্থগিত রাখার পরিকল্পনার প্রতিবাদে বিক্ষোভে যোগ দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পেট্রলের সংকট ও জ্বালানির দাম নিয়ে ক্ষুব্ধ মানুষেরাও বিক্ষোভে যোগ দেন। এসব বিক্ষোভের অনেকগুলোই দাঙ্গা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে রূপ নেয়।
‘তুমি ভাঙলে, তোমাকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে’ স্লোগানসংবলিত অধ্যাদেশের একটি অংশে ইতালি সন্তানদের সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনায় অভিভাবকদের দায়বদ্ধ রাখার আইন আরও কঠিন করেছে
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ গত সপ্তাহে বলেছেন, সহিংসতার পক্ষে ‘কোনো যুক্তিই যথেষ্ট নয়’। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কিছু সড়কে সমাবেশ নিষিদ্ধ করতে পারে স্থানীয় কর্মকর্তারা। কর্তৃপক্ষ কারফিউ জারির ঘোষণাও দেয়।
গত শনিবার ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম ও পর্তুগালে কয়েক লাখ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেয়। এসব বিক্ষোভের মধ্যে সমন্বয় ছিল সীমিত। যদিও মিলানে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ পরে দাঙ্গায় রূপ নেয়। মূলত তরুণদের কয়েকটি দল দোকানে লুটপাট চালায়, জানালা ভাঙচুর করে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর ছুড়ে মারে। ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ইতালির বোলোনিয়া ও তুরিন শহরেও দাঙ্গার খবর পাওয়া যায়। ফ্রান্স ও ইতালিতে এসব ঘটনায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।
ইতালি কী ঘোষণা দিয়েছে
গত মঙ্গলবার ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার সহিংস পরিস্থিতি মোকাবিলায় একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে আছে বছরের শেষ পর্যন্ত মিলানে ৫০০ সেনা মোতায়েন এবং ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত সন্তানদের অভিভাবকদের আর্থিক দায় বাড়ানো।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জননিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে এমন অন্তত পাঁচজনের কোনো দলে অংশ নিলে বিক্ষোভকারীদের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ২০ হাজার ইউরো জরিমানা হতে পারে।
১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে এখন প্রশাসনিক আটকাদেশ দেওয়া যেতে পারে, এমনকি তারা কোনো অপরাধ না করলেও। তবে সে ক্ষেত্রে তাদের বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করার মতো প্রমাণ থাকতে হবে। আগে এ ক্ষমতা শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।
‘তুমি ভাঙলে, তোমাকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে’ স্লোগানসংবলিত অধ্যাদেশের একটি অংশে দেশটি সন্তানদের অপরাধমূলক সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনায় অভিভাবকদের দায়বদ্ধ রাখার আইন আরও কঠিন করেছে। ইতালির দেওয়ানি আইনের ২০৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদে আগে থেকেই বলা আছে, যেসব অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান আইনিভাবে স্বাধীন নয় এবং অভিভাবকের সঙ্গে থাকে, তাদের ‘বেআইনি কাজের’ কারণে সৃষ্ট ক্ষতির জন্য দায়ী থাকবেন মা-বাবা ও অভিভাবকেরা। যারা অন্যের অভিভাবকত্বে থাকা ব্যক্তিদের দেখাশোনা করে, তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে একই বিধান।
সম্পত্তি জব্দ করা বা বেতন থেকে অর্থ কেটে নেওয়ার মাধ্যমে এসব আইন কার্যকর করতে পারে কর্তৃপক্ষ। নতুন ব্যবস্থায় রাষ্ট্র সরাসরি অভিভাবকদের জরিমানা করতে পারবে। এ ছাড়া ক্ষতিপূরণ দাবি করা যাবে অভিভাবকদের সম্পত্তি থেকে অথবা পরিবার যে সরকারি ভর্তুকি পায়, তা থেকে অর্থ কেটে নিয়ে।
ফ্রান্সে কী পরিস্থিতি
দেওয়ানি আইনের ১২৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ফ্রান্সে যেসব মা-বাবা তাদের সন্তানের সঙ্গে বসবাস করেন এবং সন্তানের ওপর অভিভাবকত্বের অধিকার প্রয়োগ করেন, তাদের সন্তানদের ঘটানো ক্ষতির জন্য দেওয়ানি দায় আছে। আইনে বলা হয়েছে, ‘অভিভাবকত্বের অধিকার প্রয়োগকারী মা-বাবা তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের করা ক্ষতির জন্য যৌথ ও পৃথকভাবে দায়ী থাকবেন। তবে সন্তানদের কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে দেওয়া হলে এই বিধান প্রযোজ্য হবে না।’
গত বছর একটি নতুন আইনের মাধ্যমে ১২৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয়। আরও কঠিন করা হয় কিশোরদের বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিভাবকদের ভূমিকা। এতে অভিভাবকদের দেওয়ানি দায় ঠিক করার ক্ষেত্রে সন্তানদের সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাসের শর্ত তুলে দেওয়া হয়। ফ্রান্সে সন্তানদের করা ক্ষতির জন্য অভিভাবকদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে দেওয়ানি আদালতের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যায়। ক্ষতিপূরণ দেওয়ানি দায়বিষয়ক বিমার আওতায় না পড়লে সম্পত্তি জব্দ করার ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে। এ ধরনের বিমা প্রায়ই বাড়ির বিমার সঙ্গে যুক্ত থাকে।
ফরাসি বেতারকেন্দ্র আরএফআই জানিয়েছে, সহিংস বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায় সরকার ‘দাঙ্গাকারীদেরই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে’ নামে একটি নতুন বিল প্রস্তাব করছে। আগামী ২৭ অক্টোবর বিলটির খসড়া নিয়ে আলোচনা করার কথা। আইনটি পাস হলে ভাঙচুরের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ ১০ হাজার ইউরো ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনায় অভিভাবকদের দায়ী করা হতে পারে।
আরএফআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বিলটির একটি অংশে দলীয় দেওয়ানি দায়বদ্ধতার ব্যবস্থাও চালু হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী কোনো দলের একজন সদস্যকে এমন ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে, যা সরাসরি ক্ষতি করেননি এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেবর্ন আইনটিকে ‘অপরিহার্য’ বলে অভিহিত করেছেন। তার ভাষ্য, বিক্ষোভের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির ব্যয় যেন করদাতাদের বহন করতে না হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই আইন।
অন্য কোথাও কি এমন ব্যবস্থা আছে
আরও কয়েকটি দেশেও সন্তানদের ঘটানো ক্ষতির জন্য অভিভাবকদের আর্থিকভাবে দায়ী করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে, সুইডেনের আইনে নির্ধারিত শর্ত ও সীমার মধ্যে কোনো শিশু অপরাধ করলে তার কারণে সৃষ্ট শারীরিক ক্ষতি বা সম্পত্তির ক্ষতির জন্য মা-বাবা কিংবা অভিভাবকদের আর্থিক দায় বহন করতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রেও অঙ্গরাজ্যভেদে অভিভাবকদের দায়বদ্ধতার আইন আছে। এসব আইনের আওতায় কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি সম্পত্তি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা যানবাহনের ক্ষতি করলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কিংবা স্থানীয় সরকার দেওয়ানি আদালতে তার মা-বাবার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন।
আলজাজিরা থেকে অনূদিত





