আগামীর সময়

নেপালের মন্ত্রিসভায় ৩৩ শতাংশ নারী

নেপালের মন্ত্রিসভায় ৩৩ শতাংশ নারী

নেপালের মন্ত্রিসভার ৫ নারী মন্ত্রী। ছবি: সংগৃহীত

নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ শপথ নিলেন গত শুক্রবার। তার ১৫ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভায় নারী মন্ত্রী পাঁচজন। এর মাধ্যমে দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভায় ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে। এতে পূরণ হয়েছে দেশটির সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।

পাঁচ নারী মন্ত্রীকে আইন, কৃষি, সাধারণ প্রশাসন, বিচার ও সংসদীয় বিষয়ক, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যা ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। এ পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের দিকে ঐতিহাসিক ধাপ হিসেবেও মনে করছেন কেউ কেউ।

নারী মন্ত্রীরা হলেন— সোবিতা গৌতম (আইন, বিচার ও সংসদীয় বিষয়ক), প্রতিভা রাওয়াল (সাধারণ প্রশাসন), সীতা বদি (নারী ও শিশু), নিশা মেহতা (স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা) এবং গীতা চৌধুরী (কৃষি)।

নেপালে জেন-জি বিক্ষেোভর পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ও দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারে আসেন বলেন্দ্র যা ছিল গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা। নবগঠিত সরকার দেশটির রাজনীতিতে একটি বড় ধরণের প্রজন্মগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মন্ত্রীর পাশাপাশি নেপালের সংসদে এবার নারী সদস্যের সংখ্যা ৯৬ জন যা একটি রেকর্ড। তবে সরাসরি নির্বাচনে মাত্র ১৪ জন নারী জয়ী হয়েছেন। নারী সদস্য সংখ্যা বেশি হলেও মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো পুরনো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বলে মত বিশ্লেষকদের। কিন্তু সমালোচনাকে একপাশে রেখে চিন্তা করলে সংসদে বিপুল সংখ্যক নারীর উপস্থিতি অবশ্যই ইতিবাচক। যদিও বিজয়ী দল থেকে নারী প্রার্থী কম থাকা ও সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী বাছাই নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।

র‍্যাপার থেকে রাজনীতিতে আসা বলেন্দ্র শাহর সামনে এখন বিশাল চ্যালেঞ্জ। তাকে ভঙ্গুর সরকার ও দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে জর্জরিত হিমালয় কন্যাখ্যাত ভূখণ্ডে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার প্রতিশ্রুতি রাখতে হবে।

বাংলাদেশের সংসদের সঙ্গে তুলনা

নেপালের সঙ্গে যদি বাংলাদেশের সংসদের তুলনা হয় তাহলে নারীর ক্ষমতায়নের তফাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুটি দেশেই প্রায় একইরকম ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পর নতুন সংসদ গঠিত হয়েছে। কিন্তু নেপালের তুলনায় বাংলাদেশের চিত্র হতাশাজনক।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সরাসরি নির্বাচিত নারী এমপি মাত্র ৭ জন এবং মন্ত্রিসভায় নারীর সংখ্যা মাত্র ৩ জন, যেখানে ৯৪ শতাংশ পদই পুরুষদের দখলে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ রাজনৈতিক দল 'জুলাই জাতীয় সনদ' অনুযায়ী ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করতে ব্যর্থ। এমনকি বিএনপি মাত্র ১০ নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। আর ৫০টি দলের মধ্যে ৩০টি দল কোনো নারীকেই মনোনয়ন দেয়নি।

বৈষম্যবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের ফসল এক সংসদে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের এই করুণ চিত্র একইসঙ্গে যেমন ব্যর্থতা তেমনই হতাশার। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জেঁকে বসা পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতিরই চিরায়ত রূপ। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলো লিঙ্গ সমতার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

বাংলাদেশের সংসদে এখনো সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের নিয়োগ বাকি আছে। আশা করা যায় অতীতের মতো কেবল দলীয় আনুগত্য বা সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়, বরং যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে এই আসনে নিয়োগ দেওয়া হবে। যাতে এটি কেবল নামমাত্র বা 'টোকেনিজম' হয়ে না থাকে।

আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নারী এমপিদের কথা বলার সুযোগ দিতে হবে, তাদের মতামত গুরুত্ব দিতে হবে। নেপালের নারী মন্ত্রী ও এমপিদের এই অংশগ্রহণ কতটা কার্যকর হয় তা সময়ই বলে দেবে, তবে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়সহ ৩৩ শতাংশ প্রতিনিধিত্বের এই নজির পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

    শেয়ার করুন: