ইরান যুদ্ধের প্রভাবে নতুন অর্থনৈতিক সংকটের শঙ্কায় শ্রীলঙ্কা

সংগৃহীত ছবি
শ্রীলঙ্কার মধ্যাঞ্চলের পাহাড়ি শহর ক্যান্ডিতে মার্চের এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে কীর্থি রত্না তার তিনচাকার টুকটুকের জন্য বরাদ্দ জ্বালানি কিনতে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করছিলেন।
সরকারি কোটায় তিনি সপ্তাহে ২০ লিটার পেট্রোল পান। আগে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সময় জ্বালানি কিনতে পারতেন, কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি বদলে গেছে।
এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালীর বেশিরভাগ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়।
শ্রীলঙ্কা তার জ্বালানির ৬০ শতাংশ আমদানি করে, যার বড় অংশই এই প্রণালী দিয়ে আসে। দেশটির মজুদ সক্ষমতা মাত্র এক মাসের চাহিদা পর্যন্ত। ফলে এই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুই কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার দেশটি আবারও কিউআর কোডভিত্তিক জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে—যা ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটেও ব্যবহৃত হয়েছিল।
এই ব্যবস্থায় মোটরসাইকেল সপ্তাহে ৮ লিটার, টুকটুক ২০ লিটার, গাড়ি ২৫ লিটার, বাস ১০০ লিটার ডিজেল এবং ট্রাক ২০০ লিটার ডিজেল পেতে পারে।
তবে এই সীমিত জ্বালানিও এখন বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শ্রীলঙ্কা জ্বালানির দাম প্রায় ৩৩ শতাংশ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে সার সংকটও বাড়ছে, ফলে এশিয়াজুড়ে খাদ্যের দামও বাড়তে পারে। কিয়েল ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কায় খাদ্যের দাম ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
পুরনো সংকটের স্মৃতি
চার বছর আগে প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসার আমলে অর্থনৈতিক সংকটের সময়ও দেশটি এমন রেশনিং ও মূল্যবৃদ্ধির মুখোমুখি হয়েছিল। সেই সময় বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে জ্বালানি আমদানি সীমিত হয়ে যায় এবং দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়।
২০২২ সালে জনআন্দোলনের মুখে রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
রত্না বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। ২০২৪ সালে নির্বাচিত নতুন সরকারকে তিনি দোষ দেন না, কারণ ইরান যুদ্ধ শ্রীলঙ্কার নিয়ন্ত্রণে নয়।
মূল্য বাড়লেও ক্ষতি
সরকারি মুখপাত্র নালিন্দা জয়তিসা জানিয়েছেন, জ্বালানির দাম বাড়ায় বাসভাড়া ১২ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়েছে, তবে জ্বালানির দাম কমলে তা কমানো হবে।
তবে সাধারণ মানুষের জন্য এটি তেমন স্বস্তি নয়, কারণ আয় বাড়েনি, কেবল জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।
এক অর্থনীতিবিদ জানান, এই জ্বালানি সংকটের প্রভাব শ্রীলঙ্কার জন্য ‘ভয়াবহ’ হতে পারে।
সরকারি হিসাবে, মূল্য বাড়ানো সত্ত্বেও সরকার মাসে প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়ছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের পুরো মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের ওপর চাপানো হয়নি—সরকার ভর্তুকি দিয়ে বাকিটা বহন করছে।
এক কর্মকর্তা জানান, পুরো দাম বাড়ালে পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, কাজ থেমে যাবে এবং কর্মসংস্থান কমে যাবে।
জ্বালানি সাশ্রয় ও বিকল্প উদ্যোগ
জ্বালানি সাশ্রয়ে শ্রীলঙ্কা বুধবার সরকারি অফিস ও স্কুল বন্ধ রাখার নীতি নিয়েছে।
এছাড়া রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির জন্য আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে ইরান জ্বালানি সরবরাহের প্রস্তাব দিলেও পরিবহনের জন্য জাহাজ না থাকায় তা গ্রহণ করা হয়নি।
দেশটির এলপিজি সংরক্ষণ ক্ষমতা মাত্র আট হাজার মেট্রিক টন, যেখানে মাসিক চাহিদা প্রায় ৩৩ হাজার টন। ফলে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদে রেশনিং ছাড়া সরকারের করার মতো তেমন কিছু নেই। দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
বর্তমানে শ্রীলঙ্কা মাত্র এক মাসের জ্বালানি মজুদ রাখতে পারে। নতুন আটটি সংরক্ষণাগার নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও তা সাময়িক সমাধান।
এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকলে খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকিতে পড়বে। কারণ চীন থেকে আমদানিকৃত সারের মূল উপাদান সালফার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।
রত্নার মতে, পরিস্থিতির মধ্যে এক ধরনের বিদ্রূপ রয়েছে—২০২২ সালে জ্বালানির জাহাজ ছিল কিন্তু কেনার টাকা ছিল না, আর এখন টাকা আছে, কিন্তু জাহাজ আসছে না।

