৪ বছরের মধ্যে বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করতে পারে বৈশ্বিক উষ্ণতা

সংগৃহীত ছবি
দ্রুতগতিতে বাড়ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা চলে এসেছে বিপজ্জনক ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমার আরও কাছে। বর্তমান হারে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ চলতে থাকলে আগামী চার বছরের মধ্যেই বিশ্ব এই সীমা অতিক্রম করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা।
আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত 'ইন্ডিকেটরস অব গ্লোবাল ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইজিসিসি)'–এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে এ তথ্য। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আর্থ সিস্টেম সায়েন্স ডেটা সাময়িকীতে। এতে ১৭টি দেশের ৫৬টি প্রতিষ্ঠানের ৭০ জনের বেশি বিজ্ঞানী অংশ নিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতা পৌঁছেছে ১ দশমিক ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি দেখাচ্ছে যে পৃথিবী দ্রুতই ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়নের সীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
গবেষকেরা বলছেন, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো পৃথিবীর 'এনার্জি ইমব্যালান্স' বা শক্তির ভারসাম্যহীনতা বেড়ে যাওয়া। সূর্য থেকে পৃথিবীতে যে পরিমাণ শক্তি আসে এবং পৃথিবী থেকে যে পরিমাণ শক্তি মহাকাশে ফিরে যায়, তার মধ্যে পার্থক্যই হলো এনার্জি ইমব্যালান্স। এই সূচক ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এখন।
প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ও যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিয়ার্স ফস্টারের মতে, ১৯৭০-এর দশক থেকে তাপ জমার হার বাড়ছে পৃথিবীতে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ রেকর্ড ৫৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্যে পৌঁছেছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত থাকাই এর প্রধান কারণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানবসৃষ্ট উষ্ণতা বৃদ্ধির হার এখন প্রতি দশকে ০ দশমিক ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ যা। বিজ্ঞানীদের মতে, বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি এবং বায়ুদূষণ কমানোর কারণে সালফার ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ হ্রাস পাওয়াও ভূমিকা রাখছে এ উষ্ণতা বৃদ্ধিতে।
ইউরোপীয় জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের সামান্থা বার্গেস জানান, গত এক দশকের উষ্ণায়নের প্রায় পুরোটা মানুষের কর্মকাণ্ডের ফল। এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর পড়তে শুরু করেছে ইতোমধ্যে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড আরও নিঃসরণ করা সম্ভব, দ্রুত কমে আসছে সেই 'কার্বন বাজেট'। ২০২৬ সালের শুরুতে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩০ বিলিয়ন টন। বর্তমান হারে নিঃসরণ চলতে থাকলে প্রায় তিন বছরের মধ্যেই শেষ হয়ে যেতে পারে এই সীমা।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়েও সতর্ক করেছে প্রতিবেদনটি। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১৯০১ সালের তুলনায় রেকর্ড ২৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে। সমুদ্রের পানি উষ্ণ হয়ে প্রসারিত হওয়া এবং স্থলভাগের বরফ গলার কারণে এ প্রবণতা বাড়ছে আরও।
এ ছাড়া সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ বা মেরিন হিটওয়েভের ঘটনাও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে বিশ্বের মহাসাগরগুলোতে মোট ৬৫ দিন সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ দেখা গেছে। ১৯৯১ সালের তুলনায় এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা তিন গুণের বেশি বেড়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জুন-ই লি জানান, সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলেছে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহও। এর ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, খাদ্য উৎপাদন, উপকূলীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বায়ুমণ্ডলে প্রধান তিনটি গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বেড়েছে। এ সময়ে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব দাঁড়িয়েছে ৪২৫ দশমিক ৬ পিপিএম, মিথেন ১ হাজার ৯৩৬ দশমিক ৩ পিপিবি এবং নাইট্রাস অক্সাইড ৩৩৯ দশমিক ৪ পিপিবি।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, নিঃসরণ বৃদ্ধির গতি আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও এখনই দ্রুত ও বড় পরিসরে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো না গেলে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তরের বিজ্ঞানী ম্যাট পামারের ভাষ্য, পৃথিবীতে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত তাপ জমছে। বেশি পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রেখে জলবায়ু ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করছে।
একই সঙ্গে বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পর্যবেক্ষণব্যবস্থা ও তথ্যভান্ডার সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়েছেন। তাদের মতে, এসব তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণার অর্থায়ন কমে গেলে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কার্যকর নীতি গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়বে আরও।






