তেল সংকট থেকে চীনকে যেভাবে রক্ষা করছে ‘টিপট’ শোধনাগার

হংকংয়ের সিং ই বন্দরের একটি তেল টার্মিনালে নোঙর করা একটি চীনা পতাকাবাহী তেল ট্যাঙ্কার দেখা যাচ্ছে । ছবি : রয়টার্স]
দ্বিতীয় মাসে পা দিয়েছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ। সংঘাতের প্রথম থেকেই বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম নৌপথ হরমুজ প্রণালিী অবরোধ করে রেখেছে তেহরান। পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধাবস্থা বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাসের বাজারে তৈরি করে চলেছে তীব্র সংকট ও অস্থিরতা ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার রাতে এক ভাষণ দেন। যেখানে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন আরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ ইরানের ওপর আগ্রাসী হামলা অব্যাহত রাখার। এতে আরও বেড়েছে তেলের দাম।
হোয়াইট হাউস থেকে যুদ্ধের ঘোষণার পরদিন সকালে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬.১৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর আগে, দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১০৪.৮৬ ডলার। আজ রোববার সকালে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ছিল ১০৯ ডলার।
এমন পরিস্থিতে সংরক্ষিত মজুত ভান্ডার থেকে জ্বালানি তেল ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে বিশ্বের অনেক দেশ।
তেলের জন্য ইরানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হলেও এ সংকট থেকে চীন নিজেদের অনেকাংশে সুরক্ষিত রাখতে পেরেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
‘টিপট রিফাইনারি’ বলতে কী বোঝায়?
এগুলো চীনের শানডং প্রদেশে অবস্থিত ছোট আকারের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন তেল শোধনাগার।
যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য দেশের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে কম দামে ইরান, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার তেল আমদানির জন্য এসব ব্যবহার করে বেইজিং।
এই শোধনাগারগুলো তাদের ছোট পরিসর ও চায়ের কেটলির মতো আকারের জন্য ‘টিপট’ নামে পরিচিত।
এগুলো চীনের মোট চাহিদার এক-চতুর্থাংশ পূরণ করে এবং খুবই কম লাভে পরিচালিত হয়।
ছদ্মবেশী নৌবহরের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ নিষেধাজ্ঞাভুক্ত রুশ, ইরানি এবং ভেনেজুয়েলাসহ অন্য কোনো দেশের জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে চীনে নিয়ে আসে এসব শোধনাগার। এমনকি চলমান অস্থির সময়েও এগুলোর সাগরে ভাসমান মস্কোর জাহাজ থেকে প্রচুর তেল বেইজিংয়ে নিয়ে আসছে।
ব্রাসেলস-ভিত্তিক অর্থনৈতিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ব্রুয়েগেলের সিনিয়র ফেলো এবং ন্যাটিক্সিসের এশিয়া প্যাসিফিকের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেছেন, নিষেধাজ্ঞায় (ইরানি) থাকা তেল আমদানি করলে বিশ্বে সুনাম ও আর্থিক ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এসব এড়াতে চীনের বড় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানিগুলোর পরিবর্তে প্রধানত ছোট ও ব্যক্তিগত ‘টিপট’ শোধনাগারগুলো তেল কিনেছিল।
তিনি উল্লেখ করেন, চীনের নতুন ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাঙ্ক পেমেন্ট সিস্টেমের (সিআইপিএস) মাধ্যমে ইরানের তেলের মূল্যও রেনমিনবিতে পরিশোধ করা হয়েছিল।
অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের মতে, ২০১৫ সালের জুলাইয়ে চীনের অপরিশোধিত তেল ক্রয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এই শোধনাগারগুলো বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে।
গার্সিয়া-হেরেরো গত বৃহস্পতিবার আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে এগুলো (টিপট রিফাইনারি) জ্বালানির সরবরাহ সচল রাখা ও মুনাফা বাড়াতে সাহায্য করে। সংকটের সময়, এগুলোর সস্তায় কেনা তেল রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। তবে, যখন বিশ্ববাজারে তেলের ছাড় কমে যায় এবং দাম বেড়ে যায়, তখন এদের স্বল্প মুনাফার হার আরও কমে যায়। এ সময় কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম কমাতে বাধ্য হয়।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এর আগেও এই ধরনের কয়েকটি ছোট আকারের তেল শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। গত বছরের মে মাসে ইরান থেকে তেল আমদানির জন্য শানডং প্রদেশের হেবেই সিনহাই কেমিক্যাল গ্রুপ শোধনাগারের ওপর আসে এ নিষেধাজ্ঞা।
এক বিবৃতিতে ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট তখন বলেছিলেন, ইরানের তেল বাণিজ্যের সকল উপাদানের ওপর চাপ তীব্র করতে যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যাতে দেশটির শাসকগোষ্ঠী তার অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজস্ব আয় করতে না পারে।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও জনপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আলেজান্দ্রো রেয়েস আল জাজিরার কাছে মন্তব্য করেন, চীন ঠিক ‘নিষেধাজ্ঞার ফায়দা’ হিসেবে কাজ করার জন্য কোনো ‘টিপট’ তৈরি করেনি। বরং কৌশলগতভাবে উপকারী প্রমাণিত হওয়ায় এমন একটি ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
আলেজান্দ্রো রেয়েস স্পষ্ট করেছেন, এই ছোট স্বাধীন শোধনাগারগুলো ছাড় দেওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অপরিশোধিত তেল কেনা-বেচা করে। এতে বড় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষিত থাকে।
ওয়াশিংটন সেই কৌশল এবং কাঠামোটি স্পষ্টভাবে ধরে ফেলায় ২০২৫ ও ২০২৬ সালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পদক্ষেপগুলো এসেছে বলে মনে করেন তিনি।
রেয়েস মনে করেন, চীনের জ্বালানি কাঠামোয় এখন বিকল্প ও অতিরিক্ত ব্যবস্থা আছে, যারা আবার দায় অস্বীকারের কিছু বিশ্বাসযোগ্য সুযোগ করে দিয়েছে।
তবে, যুদ্ধের পর ট্রাম্প মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলে এগুলোর তেল কেনার পরিমাণও কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি রুশ তেলবাহী ট্যাংকার গভীর সমুদ্রে তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে ভারতের দিকে রওনা দিয়েছে।
এ ছাড়া, তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে এসব তেল শোধনাগারগুলো বড় পরিমাণে তেল কিনতে পারবে না বলে মনে করেন মুয়ু।
তার ধারণা, টিপট তেল শোধনাগারগুলো এখন উচ্চ মূল্য এবং স্বল্প মুনাফার কারণে নতুন কেনাকাটা থেকে বিরত থাকছে।
চীন কি তেল সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্ত?
চীন তার অর্ধেকেরও বেশি তেল মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে ইরান থেকে আমদানি করে।
বিশ্ব তেল বাজারের তথ্য প্রদানকারী সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাহাজে করে আনা ইরানি তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনেছে চীন। শুধু গতবছরেই চীন ইরান থেকে দৈনিক ১.৪ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা শুরু করে। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই হরমুজ প্রণালিী অবরোধ করে তেহরান। বিশ্বের মোট ২০ ভাগ জ্বালানি সরবারহের পথ এটি । এ প্রণালি এখনো ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ প্রণালিী খুলে দিতে ইরানকে একাধিকবার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তেহরান তাতে সাড়া দেয়নি।
এমন বাস্তবতায় তেল সরবরাহ সুরক্ষিত করার জন্য বেইজিং যে প্রধান কৌশলগুলো ব্যবহার করেছে তার অন্যতম একটি 'টিপট রিফাইনারি'।
এগুলো এমন সব স্বাধীন প্রতিষ্ঠান যারা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সুযোগে কম দামে তেল কিনে মজুত বাড়িয়ে নেয়। ইরান, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার মতো আমেরিকান নিষেধাজ্ঞা পাওয়া দেশগুলো থেকে তেল আমদানি করে এসব চীনা প্রতিষ্ঠান।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র কারাকাসে হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে। ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগ পর্যন্ত চীনই ছিল দেশটির তেলের বৃহত্তম ক্রেতা।
বেইজিং অবশ্য আগে থেকেই একটি জ্বালানি সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিল এবং তারা বছরের পর বছর ধরে গুছিয়েছে পরিকল্পনা।
২০২১ সালে দেশের একটি তেলক্ষেত্র পরিদর্শনকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মন্তব্য করেছিলেন, বেইজিং তার জ্বালানি সরবরাহ সংক্রান্ত বিষয়গুলো ‘নিজের হাতেই’ তুলে নেবে।
যদিও কেপলারের সিনিয়র জ্বালানি তেল বিশ্লেষক মুয়ু শু মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব থেকে চীনের তেল সরবরাহ পুরোপুরি মুক্ত নয়।
তার ভাষ্য, মার্চে চীনে আসা তেলের বেশিরভাগই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বোঝাই করা হয়েছিল। চীনে সমুদ্রপথে ৫০ শতাংশেরও বেশি অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মার্চে এর অর্ধেকেরও কম ব্যারেল আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পেরেছে।
এপ্রিলে চীনের তেল আমদানি তীব্রভাবে হ্রাস পাবে বলে আশঙ্কা করছেন মুয়ু।
যদিও মুয়ু উল্লেখ করেছেন, রাশিয়া ও ইরানের অপরিশোধিত তেল কেনা অব্যাহত রাখলে সংকটে তা কিছুটা স্বস্তি দেবে। কিন্তু ইরান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের ঘাটতি পূরণে তা যথেষ্ট হবে না।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মধ্যে ছোট তেল শোধনাগারগুলো চীনকে কীভাবে সাহায্য করছে?
এই ছোট আকারের শোধনাগারগুলো ইরান ও রাশিয়া থেকে আমদানি করা তেল দিয়ে চীনের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখছে। অন্যদিকে সিনোপেকের মতো বড় চীনা তেল সংস্থাগুলো যুদ্ধের মধ্যে নিজেরা ইরানি তেল আমদানি না করে দেশের কৌশলগত তেল ভান্ডার থেকে তেল উত্তোলনের অনুমতি চাইছে।
তবে, এই ছোট আকারের তেল শোধনাগারগুলো বেশিদিন এই ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না।
তাদের বর্তমান তেলের মজুতের বেশিরভাগই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে কেনা হয়েছিল।
শানডংয়ের একজন টিপট শোধনাগারের কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, আমরা আগেই কিছু মজুত গড়ে তুলেছি, তাই অদূর ভবিষ্যতের চাপ ততটাও বেশি হবে না।
চীনের পণ্য বাজার সম্পর্কে তথ্য প্রদানকারী পরামর্শক সংস্থা অয়েলকেম-এর মতে, ৫ মার্চে শেষ হওয়া সপ্তাহে শানডং-এর শোধনাগারগুলো তাদের ক্ষমতার ৫৪.৫৮ শতাংশ কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ চলতে থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ছে।
গার্সিয়া-হেরেরো তার প্রতিবেদনে লিখেছেন, যুদ্ধের কারণে ছোট আকারের শোধনাগারগুলো স্বল্পমূল্যের অপরিশোধিত তেলের যোগান হারিয়েছে। এ ছাড়া বৈশ্বিক উত্তেজনার কারণে আগে থেকেই বেশি দাম চলছিল তেলের বাজারে।
চীন যুদ্ধের প্রভাব কমাতে বেসরকারি তেল শোধনাগারগুলোকে রাশিয়া ও ইরান থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল আমদানির অনুমতি দিচ্ছে। পাশাপাশি বেইজিং তার নিজস্ব সরকারি তেলের মজুত বাড়াচ্ছে। সরবরাহের পথ পরিবর্তন করা এবং বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রাশিয়ার তেলের ওপর আরও বেশি নির্ভর করার মতো পদক্ষেপও নিয়েছে।















