ডিমোনা কেন ইসরায়েলের পরমাণু অস্ত্র সংক্রান্ত অস্পষ্টতার কেন্দ্রে?

নেগেভ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত
ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ডিমোনাকে লক্ষ্য করে যখন ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তখন নেগেভ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের স্থাপনাটির দিকে যায় সবার দৃষ্টি। এই স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের অন্যতম কঠোর সুরক্ষিত নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
যদিও ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো— এই স্থাপনাটি বেসামরিক ও গবেষণার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।
দেশটি তার কথিত পারমাণবিক অস্ত্রাগারকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট রাখার নীতি অনুসরণ করে। এর অস্তিত্বকে তেল আবিব নিশ্চিতও করে না আবার অস্বীকারও করে না।
ইসরায়েলের কাছে যে সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, তা ব্যাপকভাবে এক ধরনের ‘ওপেন সিক্রেট’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
শিমন পেরেস নেগেভ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের স্থাপনাটিকে ইসরায়েলের পরমাণু অস্ত্র তৈরির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যাপকভাবে দেখা হয়।
ফিসাইল ম্যাটেরিয়ালস বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্যানেলের ২০১৩ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা সাধারণভাবে মেনে নিয়েছে যে, ডিমোনা স্থাপনাটি কথিত পারমাণবিক অস্ত্রাগারের জন্য প্লুটোনিয়াম উৎপাদন করেছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্লুটোনিয়াম সম্ভবত প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম জ্বালানিকে ভারী পানিনিয়ন্ত্রিত রিঅ্যাক্টরে বিকিরণের মাধ্যমে উৎপন্ন করা হয়।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের কাছে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেডের মজুদ রয়েছে।
১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে ডিমোনা স্থাপনার নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সে সময় দুই দেশের মধ্যে বিস্তৃত কৌশলগত সম্পর্কের অংশ হিসেবে ফ্রান্সের উল্লেখযোগ্য সহায়তায় ইসরায়েল একটি পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর পায় বলে জানা যায়।
একটি নরওয়েজিয়ান নথি অনুযায়ী, ১৯৫৯ সালে নরওয়ে ইসরায়েলকে ২০ টন ভারী পানি বিক্রি করেছিল।
১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলে তখনকার যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ওগডেন রিড ডেড সি এলাকা সফর শেষে একটি হেলিকপ্টারে ফেরার সময় এই নির্মাণকাজ দেখেন। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা অ্যাডি কোহেন।
রিড এটি কী—এমন প্রশ্ন করলে, কোহেন উত্তর দেন, এটি একটি ‘টেক্সটাইল কারখানা’।
যদিও সেই বছরই যুক্তরাষ্ট্র এই স্থানটিকে একটি পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে শনাক্ত করে। এর দুই বছর আগে, নির্মাণ শুরুর কিছুদিন পরও ইউ-২ গোয়েন্দা বিমান ওই স্থাপনার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় মার্কিন গোয়েন্দারা এটির সম্পর্কে অবগত হয়েছিল বলে জানা যায়।
প্রায় বিশ বছর পর, সানডে টাইমস একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে গবেষণা কেন্দ্রের ভেতরের কিছু ছবি প্রকাশ করা হয়। ছবিগুলো তুলেছিলেন ডিমোনা স্থাপনার পারমাণবিক প্রযুক্তিবিদ ৩১ বছর বয়সী মরদেখাই ভানুনু।
ছবিগুলো পারমাণবিক বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে দেখেন এবং তারা মত দেন যে, এগুলো প্রমাণ করে ইসরায়েলের কাছে দুই দশক ধরে পারমাণবিক বোমা উৎপাদনের একটি স্থাপনা ছিল এবং সেখানে প্রতি বছর প্রায় ১০টি বোমা তৈরির মতো উপাদান উৎপন্ন হতো।
টাইমস যেসব বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করেছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন থিওডর টেইলর, যিনি পারমাণবিক বোমার জনক হিসেবে পরিচিত জে. রবার্ট ওপেনহাইমারের ছাত্র।
ভানুনুর ছবি পর্যালোচনা করার পর টেইলর পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, এখন আর কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয় যে, ইসরায়েল অন্তত এক দশক ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র।
তিনি জোর দিয়ে আরও বলেছিলেন, ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি আমার জানা আগের যেকোনো প্রতিবেদন বা ধারণার চেয়েও অনেক বেশি অগ্রসর।
এতদিন কী বলেছে ইসরায়েল
সানডে টাইমসের প্রতিবেদন ইসরায়েলের নীতি পরিবর্তন করতে পারেনি। এ বিষয়ে ইসরায়েলের সরকারি নিশ্চিতও করেনি আবার অস্বীকারও করেনি।
১৯৬০-এর দশকে, তখনকার প্রধানমন্ত্রী লেভি এশকোল প্রতিশ্রুতি দেন, ইসরায়েল অঞ্চলটিতে পারমাণবিক অস্ত্র প্রথম তৈরিকারী রাষ্ট্র হবে না।
এই মনোভাব পরবর্তীতে বহু দশক ধরে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা তুলে ধরেছেন।
২০১১ সালে পিয়ার্স মর্গানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, আমাদের দীর্ঘমেয়াদী নীতি হলো যে আমরা মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রথম তৈরি করব না, এবং সেটি এখনো পরিবর্তিত হয়নি।
পরবর্তী বছরগুলোতে, ডিমোনা স্থাপনার সফরের সময় নেতানিয়াহু বলেছেন, যারা আমাদের বিনাশের হুমকি দেয়, তারা নিজেরাও নিজেদের একই ধরনের বিপদে ফেলে। যেকোনও অবস্থাতেই তারা তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।
তারপর ২০২০ সালে মন্ত্রিসভার বৈঠকে, গ্রিস এবং সাইপ্রাসের সঙ্গে গ্যাস পাইপলাইন চুক্তি নিয়ে প্রস্তুত করা হিব্রু ভাষার বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেছেন, এই প্রকল্পের গুরুত্ব হলো আমরা ইসরায়েলকে একটি পারমাণবিক শক্তিতে রূপান্তরিত করছি। পরে নিজেই সংশোধন করে বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি শক্তিতে রূপান্তরিত করছি।
দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিমন পেরেসও ১৯৯৮ সালে ইসরায়েলের পারমাণবিক সক্ষমতার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
২০০৬ সালে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্টও এমন মন্তব্য করেন যা পরে তার অফিস প্রত্যাহার করে নেয়। তিনি জার্মান টেলিভিশনে বলেছিলেন, ইরান আমেরিকা, ফ্রান্স, ইসরায়েল, এবং রাশিয়ার মতো পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য আকাঙ্ক্ষী।
জেরুজালেম পোস্ট থেকে অনূদিত

