ট্রাম্পের তৈরি জট খুলতে হবে তাকেই

সংগৃহীত ছবি
ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার ফলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পারস্য উপসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ। এর জবাবে ইউরোপীয় দেশ ও এশিয়ার মিত্রদের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনুরোধ করেছেন তারা যেন যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে নিজেদের জাহাজগুলো পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়।
তবে ইউরোপের দেশগুলো ও অস্ট্রেলিয়া সরাসরি এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো কোনো পক্ষ না নিয়ে চুপচাপ পরিস্থিতি দেখছে।
ইরানের ওপর এই হামলার সপক্ষে ট্রাম্প প্রশাসন যেসব যুক্তি দিচ্ছে সেগুলো একেক সময় একেক রকম এবং মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া জাতিসংঘে কোনো প্রস্তাব পাস না হওয়ায় এই যুদ্ধকে বিশ্বজুড়ে ‘অবৈধ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে অন্য দেশগুলোর পক্ষে ট্রাম্পের এই যুদ্ধে নাক গলানোর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
ইরান বা আমেরিকা সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করলেও কেউই তা পুরোপুরি অনুমোদন করেনি। তবে ইরান এতদিন নিয়ম মেনেই এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের সুযোগ দিত। কিন্তু এখন তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জাহাজ চলাচল বন্ধ না করলেও বেশ কিছু জাহাজে হামলা চালিয়েছে। কেবল তাদের বন্ধু দেশগুলোর জাহাজ চলার অনুমতি দিচ্ছে।
ওয়াশিংটন এই অবৈধ অভিযানের নাম দিয়েছে ‘এপিক ফিউরি’। কিন্তু এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য আসলে কী? ট্রাম্পের গত কয়েক বছরের কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হয় তিনি কেবল নিজের জেদ মেটাতেই এসব করছেন। হোয়াইট হাউস থেকে যেসব ভিডিও ছাড়া হয়েছে, তাতে যুদ্ধের ছবির সঙ্গে কার্টুন জুড়ে দেওয়া হয়েছ। এ থেকে বোঝা যায় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীকে তিনি কতটা খামখেয়ালিভাবে ব্যবহার করছেন। তার অন্ধ ভক্তদের কাছে এটি ভালো লাগলেও বিশ্বের বাকি দেশগুলো একে ট্রাম্পের অহংকার ও অযোগ্যতা হিসেবেই দেখছে।
কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী বিপদে ফেলেছেন। এই যুদ্ধের ফলে সারাবিশ্বে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। অথচ ট্রাম্প এখন আশা করছেন তিনি যে জট পাকিয়েছেন, মিত্র দেশগুলো এসে তা পরিষ্কার করে দেবে। কিন্তু মিত্ররা এই ঝামেলায় জড়াতে মোটেও আগ্রহী নয়।
সাধারণত যুদ্ধের সময় নৌবাহিনী জাহাজগুলোকে পাহারা দেয়। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি, তাই এর আইনি ভিত্তি দুর্বল। তাছাড়া ইরান এখন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত সাতটি আরব দেশে হামলা চালিয়েছে। ফলে কেবল পাহারা দিয়ে জাহাজ পার করলেই বিশ্ব অর্থনীতির এই ক্ষতি সামলানো সম্ভব নয়।
শুরুতে ট্রাম্প বলছিলেন মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজ পাহারা দেবে, কিন্তু পরে তিনি মত বদলে এই দায়ভার অন্য দেশগুলোর ওপর চাপাতে চেয়েছেন। আসল কথা হলো— যেহেতু আমেরিকা এই জট পাকিয়েছে, তাই তাদেরই এটি ঠিক করতে হবে। বাহরাইনে থাকা মার্কিন পঞ্চম নৌবহরেরই উচিত এই পথে জাহাজ চলাচল নিরাপদ করা।
কিছু সামরিক বিশেষজ্ঞের দাবি— ইরান সমুদ্রপথে মাইন পেতে রেখেছে এবং জ্বালানি সংকট চরমে পৌঁছেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক এনার্জি এজেন্সি ১১ মার্চ জরুরি তেল ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ায় এই সংকটের কথাটি একটু বাড়িয়ে বলা হচ্ছে বলেই মনে হয়। এছাড়া সমুদ্রে মাইন পাতলে ইরান নিজেই বিপদে পড়বে। কারণ এগুলো সরাতেও তাদের অনেক খরচ করতে হবে। তবে তেহরানের দাবি মাইন ছাড়াই তারা এই পথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
ট্রাম্পকে এখন পরিষ্কার করতে হবে এই যুদ্ধের শেষ কোথায়। তা না হলে গত ২৫ বছরের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মতো এটিও একটি অন্তহীন মরণফাঁদে পরিণত হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো ট্রাম্পের ওপর চরম বিরক্ত। কারণ ওয়াশিংটন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোরিয়া থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (প্যাট্রিয়ট ও থাড) সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে এসেছে, আবার এখন কোরিয়াকেই জাহাজ পাহারা দিতে বলছে।
সব মিলিয়ে এটাই মনে হচ্ছে যে, ট্রাম্প কেবল নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থেই এ অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ শুরু করেছেন। তিনি চাইছেন মার্কিনিরা যেন বিতর্কিত 'এপস্টাইন ফাইল' নিয়ে মাথা না ঘামায় এবং যুদ্ধের সাফল্যের মাধ্যমে তার নিজের ইমেজ বড় হয়। ট্রাম্প ও রাশিয়ার পুতিনের আচরণের মধ্যে এখন আর কোনো পার্থক্যই দেখা যাচ্ছে না।
লেখক: কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর মিলিটারি অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা

