সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড: কবিতা যখন মুক্তিযুদ্ধের দলিল

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতন ও গণহত্যা থেকে রক্ষা পেতে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় তারা। ভারত সরকারের পক্ষে এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাদের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য তখন ছিল না। ফলে অনেক শরণার্থীর জীবনে নেমে আসে ঘোর অনিশ্চয়তা। অনেকে রোগে-শোকে মারা যায়। খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা তো দূরের কথা, সব শরণার্থীর মাথার ওপর ছাউনি নির্মাণ করাও ভারতের জন্য ছিল কঠিন কাজ। ফলে খোলা আকাশের নিচে, রাস্তার ধারে, রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে দিন কাটাতে হয়েছে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থান নিয়ে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। জ্বালিয়ে দেয় বাড়িঘর। বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত। এ দেশের নিরীহ মানুষ জীবন বাঁচাতে যেদিক দিয়ে সম্ভব, দ্রুত সেদিক দিয়েই দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নেয়। তবে সবচেয়ে বেশি শরণার্থী ভারতে গেছে যশোর রোড ধরে। যশোর রোড ছিল ভারতের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অন্যতম প্রধান সড়ক। সড়কের দুই পাশে ছিল বিশাল বিশাল পুরনো বৃক্ষ। এর দুই দিকেই ছিল খোলা মাঠ। বেনাপোল সীমান্ত পেরোলেই নিরাপদ আশ্রয় মিলবে, এমন আশায় যশোর রোডে জড়ো হয়েছিল শরণার্থীদের ভিড়।
২৫ মার্চের কালরাতের পর যশোর সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে এসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যশোর শহরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। যেখানে যাকে যে অবস্থায় পেয়েছে, সেখানেই হত্যা করেছে। পথচারী কিংবা ঘুমন্ত মানুষের ওপরও নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে তারা। বেনাপোলের ওপারে যশোর রোড ধরে বনগাঁ থেকে চাপাবাড়িয়া ও টালিখোলা পর্যন্ত গড়ে ওঠে শরণার্থীশিবির। যশোর রোডে তখন ছিল আশ্রয়প্রার্থী লাখ লাখ মানুষের স্রোত। কিন্তু ভারতে পৌঁছেও অনেকে শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নিতে পারেনি। বর্ষাকালে শরণার্থীদের অবস্থা হয়ে ওঠে আরও ভয়াবহ। বৃষ্টি ও কাদায় একাকার হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হয়েছে প্রাণের ভয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া মানুষকে।
ভারতের কলকাতায় বেশ কয়েকজন সাহিত্যিকের সঙ্গে বিখ্যাত মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের বন্ধুত্ব ছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের শেষ দিকে কলকাতায় আসেন গিন্সবার্গ। তখন সেপ্টেম্বর মাস। তিনি উঠেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতে। বাংলাদেশের অনেক শরণার্থী তখন পশ্চিমবঙ্গ ও সীমান্তবর্তী অন্যান্য শহরে আশ্রয় নিয়েছিল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শরণার্থীদের অবস্থা দেখাতে গিন্সবার্গকে নিয়ে যান যশোর রোডে।
ব্রিটিশ শাসনামলে পূর্ব বাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের সংযোগকারী সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হতো যশোর রোড। তখনো বর্ষা শেষ হয়নি। বৃষ্টিতে যশোর রোড পানিতে ডুবে গিয়েছিল। সড়কপথে যাতায়াত সম্ভব না হওয়ায় গিন্সবার্গ শেষ পর্যন্ত নৌকায় করে বনগাঁ পেরিয়ে বাংলাদেশের যশোর সীমান্তে পৌঁছান। তার সঙ্গে ছিলেন বিবিসির হয়ে প্রতিবেদন করতে আসা গীতা মেহতা ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
বিভিন্ন শরণার্থীশিবির ঘুরে দেখেন গিন্সবার্গ। শরণার্থীদের দুর্দশা নিজের চোখে দেখে তিনি ফিরে যান নিউ ইয়র্কে। এরপর ‘যশোর রোড’ শিরোনামে লেখেন একটি কবিতা।
কবিতাটি সম্পর্কে গিন্সবার্গ বলেছেন, ‘কলকাতা ঘুরে লাখ লাখ মানুষের সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট দেখে আমার যে অনুভূতি তৈরি হয়েছে, তা-ই লিখলাম। সেসময়ে দেখা মানুষের অন্তহীন যাতনা আমাকে নির্বাক করেছিল। সব বয়সের মানুষের বেঁচে থাকার কষ্ট আমার বুকে চেপে বসেছিল। সেই যাতনা হৃদয়ে নিয়েই আমি লিখেছিলাম ‘যশোর রোড’ কবিতা।’
১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর সেইন্ট জর্জ চার্চে ‘বাংলাদেশের জন্য মার্কিনিরা’ শিরোনামে কবিতা পাঠের আসর বসে। সেখানে গিন্সবার্গ আবৃত্তি করেন ‘যশোর রোড’। অগণিত দর্শকের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বব ডিলানও। এভাবে বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন গিন্সবার্গ।
এর প্রায় তিন মাস আগে, ১ আগস্ট নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ গান গেয়েছিলেন বব ডিলান। এবার কবিতা থেকে গান হয়ে উঠল ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। গানটিতে কণ্ঠ দেন স্বয়ং কবি গিন্সবার্গ, আর গিটার বাজান ডিলান। পরে জন লেননের পরামর্শে ১৯৮৩ সালে গানটি রেকর্ড আকারে প্রকাশ করেন গিন্সবার্গ।
১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের ১৫২ লাইন দীর্ঘ ‘যশোর রোড’ কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটিতে কবিতার অর্ধেক ছাপা হয়েছিল। কবিতার সঙ্গে ছবি এঁকেছিলেন ডেনিশ ব্যঙ্গচিত্রশিল্পী ক্লাউস অ্যালব্রেকস্টেন।
পুরো কবিতাটি গিন্সবার্গের ‘দ্য ফল অব আমেরিকা’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কাব্যগ্রন্থে কবিতাটির নাম বদলে রাখা হয় ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালের ১ জুন। ১৯৭৩ সালে কাব্যগ্রন্থটি আমেরিকার ‘ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অসহায় মানুষের দুর্দশার কথা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে অ্যালেন গিন্সবার্গকে ‘ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার’ সম্মাননায় ভূষিত করে।
লেখক: নারী জাগরণ কর্মী ও গবেষক



