ইরানকে ঘিরে মার্কিন নতুন কৌশল, উপসাগরে দুশ্চিন্তা

ইরানের তেহরানের বিপ্লব চত্বরে বিশাল মার্কিন-বিরোধী বিলবোর্ড। ছবি:ফাতেমেহ বাহরামি; আনাদোলু এজেন্সি
আমেরিকা ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে। যুদ্ধ শুরুর সময় ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, সামরিক শক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে দ্রুত তেহরানকে চাপে ফেলা সম্ভব হবে। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, সেই হিসাব ততই জটিল হয়েছে। ইরানকে সামরিকভাবে পরাস্ত করা তো সম্ভব হয়ইনি, বরং যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্যও আমেরিকার জন্য বাড়তে শুরু করেছে। এই বাস্তবতায় ওয়াশিংটন এখন কৌশল পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। ক্ষেপণাস্ত্রের বদলে অর্থনৈতিক চাপ- এটাই যেন নতুন অস্ত্র।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের ঘোষিত ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত। তেহরানের অবশিষ্ট আয়ের উৎসগুলোকে আঘাত করা, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি এবং ইরানের অর্থনীতিকে আরো বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া- এই কৌশলের মূল লক্ষ্য।
বেসেন্ট একে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযান’। তার ভাষায়, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে কেউ নয়। তিনি এও বলেছেন- বিশ্বকে বেছে নিতে হবে তারা ইরানের পক্ষে, নাকি আমেরিকার পক্ষে! কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ কি সামরিক যুদ্ধের বিকল্প হতে পারবে? নাকি এটি বরং নতুন সামরিক সংঘাতের পথ তৈরি করবে? প্রশ্নটি শুধু ওয়াশিংটন বা তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য। কারণ ইরান ও আমেরিকার দ্বন্দ্বের সবচেয়ে বড় ভৌগোলিক মঞ্চ এখন উপসাগরীয় অঞ্চল।
উপসাগরের সবচেয়ে বড় ভয়- হরমুজ
হরমুজ প্রণালি শুধু একটি জলপথ নয়; এটি বিশ্ব জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনী। শান্তিকালে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়।
যুদ্ধের মধ্যে ইরান যখন কার্যত হরমুজকে বন্ধ করে দিয়েছে, তখন এর প্রভাব শুধু ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আঘাত এসেছে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমানসহ গোটা উপসাগরীয় অর্থনীতিতে।
এখানেই উপসাগরীয় দেশগুলোর সবচেয়ে বড় সংকট। একদিকে তাদের নিরাপত্তার জন্য মার্কিন সামরিক উপস্থিতি প্রয়োজন। অন্যদিকে সেই মার্কিন সামরিক উপস্থিতিই ইরানের কাছে তাদের ভূখণ্ডকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। অর্থাৎ আমেরিকা তাদের রক্ষা করছে, আবার আমেরিকার উপস্থিতিই তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
এখন ওয়াশিংটন যখন ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ আরও তীব্র করছে, তখন উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে- তারা যেন ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক কমিয়ে দেয়।
তেহরান কী করবে?
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ি এরইমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছেন, ইরানের প্রতিবেশী কোনো দেশ যদি আমেরিকার অর্থনৈতিক যুদ্ধে শামিল হয়, তাহলে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ দিয়ে এক ফোঁটা তেলও বের হতে দেওয়া হবে না। এটি নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ হরমুজকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।
আরব আমিরাত কেন সবার আগে?
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত এরইমধ্যে ওয়াশিংটনের অবস্থানের সবচেয়ে কাছাকাছি গেছে। আবুধাবি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে এগিয়েছে। এর পেছনে বাস্তব কারণও রয়েছে।
যুদ্ধের সময় ইরানের হামলায় আরব আমিরাতের ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আবাহাম চুক্তিরও অন্যতম অংশীদার তারা। ফলে ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা সংঘাতে আবুধাবির অবস্থান অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি স্পষ্ট। কিন্তু সৌদি আরব, কাতার কিংবা ওমানের কৌশলগত বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।
কাতার ও ওমান কেন ইরানকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইবে না?
ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন আসল চ্যালেঞ্জ শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা নয়। চ্যালেঞ্জ হলো এমন চাপ তৈরি করা, যা ইরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনবে- কিন্তু ইরান এমন চ্যালেঞ্জের মুখে কতটুকু নত হবে সেটাও চিন্তার বিষয়। অযাচিত বা অনাকাঙ্খিত চাপ সুষ্টি হলে তেহরান আবার ক্ষেপণাস্ত্রের পথ বেছে নিতে পারে
কাতারের অর্থনীতি এলএনজি-নির্ভর। হরমুজের অচলাবস্থা তাই দোহার জন্য ভয়াবহ অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে। তেলের কিছু বিকল্প পথ বের করা গেলেও এলএনজি এবং পেট্রোকেমিক্যালের ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা করা অনেক কঠিন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- ইরানের সঙ্গে কাতারের বিশাল গ্যাসক্ষেত্রের সংযুক্তি। ফলে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করা শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি কাতারের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।
ওমানের অবস্থান আরও স্পষ্ট। বহু বছর ধরে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসছে মাস্কাট। এখন হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়েও ওমান ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছে। এরইমধ্যে একটি চুক্তিও হয়েছে। সুতরাং ওমানের জন্য ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন নীতি অনুসরণ করা মানে নিজের কূটনৈতিক ভূমিকার ভিত্তিটিই দুর্বল করা।
সৌদি আরবের হিসাব আরও গভীর
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সৌদি আরবের অবস্থান। রিয়াদ ইরানকে শক্তিশালী অবস্থানে দেখতে চায় না। কিন্তু একই সঙ্গে ইরান রাষ্ট্রব্যবস্থার পতনও চায় না। কারণ তেহরানে সরকার পতনের পর যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে, তা পুরো অঞ্চলকে গ্রাস করতে পারে।
সৌদি আরব গত কয়েক বছরে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী নীতি নিয়েছে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন তার বড় উদাহরণ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নীতির পরিবর্তন। রিয়াদ এখন আর কেবল ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করতে চাইছে না। পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সাম্প্রতিক মক্কা চুক্তি সেই বহুমুখী নিরাপত্তা কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক যুদ্ধে সৌদি আরব কতটা সরাসরি যোগ দেবে, সেটি এখনও বড় প্রশ্ন। কারণ ইরানের ওপর চাপ বাড়ালে শুধু তেহরান নয়, ইরান-সমর্থিত শক্তিগুলোর পাল্টা আঘাতের ঝুঁকিও বাড়বে।
অর্থনৈতিক যুদ্ধ কি সামরিক যুদ্ধকে ফিরিয়ে আনবে?
এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আমেরিকা হয়ত হিসাব করছে, সামরিক অভিযানে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার পর অর্থনৈতিক চাপই এখন সবচেয়ে কার্যকর পথ। ইরানের তেল বিক্রি কমিয়ে দেওয়া, ব্যাংকিং ব্যবস্থা সংকুচিত করা, বাণিজ্যিক অংশীদারদের ভয় দেখানো এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দেওয়া- সব মিলিয়ে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।
কিন্তু ইরানের অতীত আচরণ বলে, চাপের মুখে তেহরান সবসময় আত্মসমর্পণ করে না। বরং অনেক সময় পাল্টা চাপ সৃষ্টি করে। সেই পাল্টা চাপ কোথায় আসতে পারে? প্রথম ও প্রধান জবাব হলো- হরমুজে। তারপরে উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোয়। এরপর মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে। এবং ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মাধ্যমে।
অর্থাৎ অর্থনৈতিক যুদ্ধ যদি তেহরানকে কোণঠাসা করে, তাহলে সেটি সামরিক উত্তেজনা কমানোর বদলে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
ওয়াশিংটনের হিসাব বনাম উপসাগরের বাস্তবতা
এখানে আমেরিকা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বার্থের পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট। ওয়াশিংটন হয়ত মনে করছে, হরমুজের বিকল্প কিছু নৌপথ তৈরি হয়েছে, আমেরিকার ওপর সরাসরি অর্থনৈতিক চাপ তুলনামূলকভাবে কম এবং মার্কিন নৌ-ব্লকেড ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করেছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালানোর ক্ষেত্রে সময় আমেরিকার পক্ষে কাজ করতে পারে। কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সময় এতটা নিরপেক্ষ নয়।
হরমুজ যত দীর্ঘ সময় অচল থাকবে, তাদের অর্থনীতির ক্ষতি তত বাড়বে। আর আমেরিকা যদি মনে করে দীর্ঘ অর্থনৈতিক যুদ্ধ সহ্য করা সম্ভব, তাহলে ওয়াশিংটন হয়ত হরমুজের অচলাবস্থাকেও দীর্ঘায়িত হতে দিতে পারে। এটাই উপসাগরীয় দেশগুলোর সবচেয়ে বড় ভয়।
তাহলে সামনে কী?
বর্তমান পরিস্থিতি একটি অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে একদিকে আমেরিকা- যার সামরিক শক্তি তাদের নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ গ্যারান্টি। অন্যদিকে ইরান- যার সঙ্গে সংঘাত হলে তাদের ভূখণ্ড, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ফলে তাদের সামনে দুটি পথ- ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড়ানো, অথবা তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের দরজা খোলা রাখা।
বাস্তবতা বলছে, সৌদি আরব, কাতার ও ওমান দ্বিতীয় পথটিই পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইবে না। কারণ শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধের সামরিক বিজয় কার হবে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- যুদ্ধের পর এই অঞ্চলটি কেমন থাকবে?
ইরানকে দুর্বল করা এক বিষয়। কিন্তু ইরানকে এমনভাবে কোণঠাসা করা, যাতে হরমুজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে এবং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে আগুন জ্বলে ওঠে- সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
তাই ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন আসল চ্যালেঞ্জ শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা নয়। চ্যালেঞ্জ হলো এমন চাপ তৈরি করা, যা ইরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনবে- কিন্তু ইরান এমন চ্যালেঞ্জের মুখে কতটুকু নত হবে সেটাও চিন্তার বিষয়। অযাচিত বা অনাকাঙ্খিত চাপ সুষ্টি হলে তেহরান আবার ক্ষেপণাস্ত্রের পথ বেছে নিতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলেও জানে, অর্থনৈতিক যুদ্ধের আগুন যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে তার পরের ধাপ আবারও ক্ষেপণাস্ত্র হতে পারে। আর সেই কারণেই আজ উপসাগরীয় রাজধানীগুলোর সবচেয়ে বড় দাবি সম্ভবত একটাই- নিষেধাজ্ঞা নয়, যুদ্ধ নয়; আগে কূটনীতি।
লেখক: সাংবাদিক ও আন্তজর্জতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক





