যেখানে আরবদের চেয়ে আলাদা ইরান

সংগৃহীত ছবি
ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল হামলার পর ইরান আরব বিশ্বের বেশকিছু দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। আরব বিশ্ব ও ইরানের মধ্যকার বিরোধ দীর্ঘদিনের। তবে এ ঘটনায় এই বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ধর্মীয়ভাবে ইরান ও আরব বিশ্বের দেশগুলো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বা ইসলামি রাষ্ট্রগুলোকে একভাবে দেখা হলেও, সামগ্রিকভাবে দৃশ্যপট অনেকটাই ভিন্ন।
পারস্য সাম্রাজ্য বনাম আরব বিজয়
ইসলামের আগমনের আগে পারস্য (বর্তমান ইরান) ছিল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য। সপ্তম শতাব্দীতে আরবরা পারস্য জয় করে এবং সেখানে ইসলাম প্রচার করে।
ইরানিরা ইসলাম গ্রহণ করলেও তাদের হাজার বছরের পুরনো পারস্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ছাড়েনি। তারা সবসময় নিজেদের আরবদের চেয়ে সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত মনে করে এসেছে।
আরবরা যখন পারস্য শাসন করছিল, তখন থেকেই ইরানিদের মধ্যে একটি স্বাতন্ত্র্যবোধ কাজ করত, যা পরবর্তীতে শিয়া-সুন্নি বিভাজনের মাধ্যমে আরও প্রকট হয়।
আধুনিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব
বর্তমান সময়ের দ্বন্দ্বের শুরু মূলত ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে।
বিপ্লবের পর ইরান একটি ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং রাজতন্ত্রের বিরোধিতা শুরু করে। সৌদি আরবসহ অধিকাংশ আরব দেশে রাজতন্ত্র বিদ্যমান, ফলে তারা ইরানকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে (যেমন: সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবানন ও ইরাক) ইরান এবং সৌদি আরব ভিন্ন ভিন্ন পক্ষকে সমর্থন দেয়। একে বলা হয় ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধ।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরব দেশগুলো (বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত) বেশ উদ্বিগ্ন। তারা মনে করে ইরান পারমাণবিক শক্তি অর্জন করলে পুরো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যাবে।
ধর্মীয় বিভাজন
ইরান ও আরব বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিভাজনের দিকটি হলো ধর্মীয় মতাদর্শগত। ইরান বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। শিয়াপন্থি আদর্শে পরিচালিত হয় দেশটি।
অন্যদিকে আরব বিশ্বের দেশগুলো সুন্নি মুসলিম প্রধান। দেশগুলোর শাসনব্যবস্থাও পরিচালিত হয় সুন্নি মতাদর্শের ভিত্তিতে।
যার ফলে ধর্মীয় মতাদর্শগত এই বিভাজন ঐতিহাসিকভাবেই ইরান ও আরব বিশ্বকে আলাদা করে রেখেছে। এই সুন্নি-শিয়া বিভেদ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে অনেক বড় ভূমিকা রাখে।
জাতিগত ও ভাষাগত পার্থক্য
আরবরা মূলত সেমিটিক জাতি। তাদের পূর্বপুরুষ আরব উপদ্বীপ থেকে এসেছে। আরবদের ভাষা আরবি।
অন্যদিকে ইরানিরা ইন্দো-ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত। তারা নিজেদের ‘আর্য’ বলে পরিচয় দেয়। ‘ইরান’ শব্দটির অর্থই হলো ‘আর্যদের ভূমি’। তাদের প্রধান ভাষা ফারসি। এটি ব্যাকরণগতভাবে ইংরেজি বা অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। তবে ফারসি বর্ণমালা আরবি থেকে ধার করা হয়েছে বলে দেখতে অনেকটা একই মনে হয়।
সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়
ইরানিরা নিজেদের প্রাচীন পারস্য সভ্যতার উত্তরাধিকারী মনে করে (সাইরাস, দারিয়ুস, পারস্য সাম্রাজ্য)।
আরবরা আরব উপদ্বীপ ও ইসলামের প্রাথমিক বিস্তারের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে।
৭ম শতাব্দীতে আরবরা পারস্য জয় করলেও ইরানিরা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি বেশিরভাগটাই ধরে রেখেছে।

