মধুময় পৃথিবীর ধূলিতে একজন নিসর্গসখা

সংগৃহীত ছবি
এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি—
অন্তরে নিয়েছি আমি তুলি
এই মহামন্ত্রখানি,
চরিতার্থ জীবনের বাণী।
দিনে দিনে পেয়েছিনু সত্যের যা-কিছু উপহার
মধুরসে ক্ষয় নাই তার।
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনের অন্তিম প্রান্তে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ পৃথিবীর দিকে শেষবার ফিরে তাকাচ্ছেন—আর তার চোখে ধরা পড়ছে অপার মমতা, বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতার দীপ্তি। জগতের সবকিছুই তার কাছে মধুময়; পৃথিবীর ধূলিকণাও তুচ্ছ নয়। জীবনের পথে যত দুঃখ, যত দুর্যোগই আসুক, তার আড়ালেও তিনি দেখতে পেয়েছেন এক অমলিন আলো।
মানুষের চারপাশে অর্থহীনতার ধুলো উড়ে বেড়ায়; কিন্তু মানুষকে তার কাজ, চিন্তা ও অস্তিত্ব দিয়ে জীবনের সঙ্গে অর্থের সেতু গড়ে তুলতে হয়। কীভাবে বেঁচে থাকাকে গভীরতর করা যায়, কীভাবে প্রতিদিনের ক্ষুদ্রতার মধ্যেও বিস্ময়ের আভাস খুঁজে পাওয়া যায়—এই শিক্ষা সবাই রেখে যেতে পারেন না যাঁরা পেরেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা অন্যতম।
তাঁর জন্ম ১৯২৯ সালের ২৯ মে, ব্রিটিশ ভারতের সিলেট জেলার মৌলভীবাজারের বড়লেখার শিমুলিয়া গ্রামে। বাবা চন্দ্রকান্ত শর্মা ছিলেন খ্যাতিমান কবিরাজ। শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামের পাঠশালা, বই-পত্রিকা আর পাথারিয়া পাহাড়ের অরণ্যের সান্নিধ্যে। প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার শুরু সেখানেই।
পরে করিমগঞ্জ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু উচ্চতর গণিত তাঁর কাছে দুর্বোধ্য মনে হওয়ায় ত্রিপুরার মহারাজা বীরবিক্রম কলেজে চলে যান এবং ১৯৪৯ সালে সেখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। মায়ের ইচ্ছা ছিল তিনি ডাক্তার হবেন। কিন্তু দেশভাগ, দাঙ্গা আর বাস্তবতার টানাপোড়েনে সেই পথ আর এগোয়নি।
কিছুদিন নিজের স্কুলে শিক্ষকতা করে পরে কলকাতায় যান। মেডিক্যালে ভর্তি হওয়ার সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় ভর্তি হতে পারলেন না। অনার্স ছাড়াই পড়াশোনা শুরু করেন।
এই প্রসঙ্গে তাঁর খেদোক্তি ‘অনার্স কোর্স বলে কিছুর যে অস্তিত্ব যে ছিলো তা আমার জানা ছিল না। গ্রাম থেকে কলকাতা গেছি, প্রেসিডেন্সি কলেজের নাম জানতাম না, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের নাম পর্যন্ত জানতাম না, এমন এক গাঁইয়া আমি।’ এই সময় মার্কসবাদী নানা বই পড়ার সুযোগ পান, যদিও সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হননি।
সিটি কলেজের পাঠ শেষ করে ফিরে এলেন আপন ভূখণ্ডে। একদিন 'আজাদ' পত্রিকায় চোখে পড়ল বিজ্ঞাপন— বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে বায়োলজির একজন ডেমনস্ট্রেটর চাওয়া হয়েছে। বরিশাল কোথায়, তা তখন তাঁর জানা ছিল না। বিজ্ঞাপনটি পড়ে প্রথমবার খুলে বসলেন বাংলার মানচিত্র। দেখলেন, বরিশাল বঙ্গোপসাগরের খুব কাছে। পাহাড়ের সন্তান, সমুদ্র তখনও তাঁর অদেখা। সেই আকর্ষণেই পাঠিয়ে দিলেন দরখাস্ত। অল্পদিনের মধ্যেই এলো টেলিগ্রাম।
বরিশালে এসে তাঁর নতুন জীবন শুরু হলো। ডেমনস্ট্রেটরের কাজ তাঁকে আনন্দ দিলেও তাঁর ইচ্ছে ছিল শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা। সেই স্বপ্ন পূরণে ১৯৫৬ সালে ভর্তি হলেন -এর উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে। বিএম কলেজ তাঁকে হারাতে চাইলো না— কোর্স শেষে পুনরায় প্রতিষ্ঠানে প্রভাষক পদে যোগদানের আমন্ত্রণসহ কোর্স চলাকালীন ৫০ টাকা মাসোহারা প্রদান করা হতে থাকলো।
কোর্স শেষে ১৯৫৮ সালে আবার ব্রজমোহন কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।তাঁর স্বপ্ন ছিল বিজ্ঞানী হওয়ার। ডাবলিন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক্সপেরিমেন্টাল ট্যাক্সোনমি নিয়ে গবেষণার সুযোগও এসেছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নিজের সুপারভাইজার আর বিভাগীয় প্রধানের দ্বন্দ্বের কারণে তিনি দ্বিতীয় বিভাগ পেলেন এবং তাঁর ইচ্ছাটি অপূর্ণ রয়ে যায়। বরিশালে ফিরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন— ‘বরিশাল ফ্লোরা’ নিয়েই গবেষণা করবেন। তাঁর নিষ্ঠা ও উদ্ভিদপ্রেমের স্মারক হয়ে আজও রয়েছে বিএম কলেজের বোটানিক্যাল গার্ডেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন সেই সবুজ ভুবন।
১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে ব্রজমোহন কলেজের মাত্র দুজন শিক্ষক গ্রেফতার হয়েছিলেন; তাঁদের একজন দ্বিজেন শর্মা। অভিযোগ ছিল, তিনি আন্দোলনরত ছাত্রদের গোপনে সহযোগিতা করছেন। জেলখানার দিনগুলোকে তিনি পরে বলেছিলেন— তাঁর “দুর্লভ সৌভাগ্য”। জেল থেকে বেরিয়ে গবেষণাকর্ম আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। বরিশাল ছাড়তে হয় তাঁকে। সেই সঙ্গে হারিয়ে যায় বরিশালের উদ্ভিদকূল নিয়ে সম্ভাবনাময় এক গবেষণার বড় অধ্যায়। এর আগে ১৯৬০ সালের ২৭ নভেম্বর তাঁর বিয়ে হয় বরিশালবাসী আইনজীবী সুধীর কুমার চক্রবর্তীর কন্যা দেবী চক্রবর্তীর সাথে।
১৯৬৪ সালে ঢাকার নটর ডেম কলেজে যোগ দেন। ১৯৭৪ সালে দ্বিজেন শর্মা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রকাশনা সংস্থা প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদক হিসেবে যোগ দিতে মস্কোয় যান। অনুবাদ-পুস্তক ছাড়াও দ্বিজেন শর্মা ৩০টি বই লিখেছেন।
মস্কো থেকে লন্ডন, ডারউইনের বাড়ি থেকে কিউ গার্ডেন—পার্কের সবুজে দাঁড়িয়ে তিনি কল্পনা করেছেন,
বাংলাদেশও একদিন হবে বৃক্ষছায়ায় মোড়া এক উদ্যান-শহর—
যেখানে নদীর ধারে শিশুরা দৌড়াবে মুক্ত বাতাসে,
আর মানুষ প্রকৃতির পাশে ফিরে পাবে নিজেকে।
পৃথিবীর পরিবেশ বদলে যাচ্ছে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে পৃথিবীর সম্পদকে – জল ও জমিকে – নষ্ট করছে। উন্নয়নের রাজনীতি, হিংস্র নগরায়নে ঢাকা শহর পরিণত হয়েছে এক দুস্বপ্নের নগরীতে।
সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী এই মহীরূহ সমাজতন্ত্রের উত্থান দেখেছেন, পতনও দেখেছেন খুব কাছ থেকে। স্বপ্ন ভাঙতে দেখেছেন, ইতিহাস বদলাতে দেখেছেন, তবুও মানুষের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ভাঙেনি। বলেছেন, "পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিজয় প্রমাণিত হয়েছে, এটা যারা বলে, তারা ঠিক বলে না। এই পুঁজিবাদ শুধু মানুষের শোষণ-বঞ্চনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে মানবসভ্যতাকে (মিসিং শব্দ) করতে উদ্যত হয়েছে সে। সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে উৎপাদন ও পরিভোগের এই ব্যবস্থা বদলাতে হবে। বদলাতে হবে সব বিষয়ে এথনোপোসেন্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। সবার ওপরে মানুষ সত্য নয়, পৃথিবীর ইকোসিস্টেমে একটি কীটেরও ন্যায্য জায়গা রাখতে হবে।
শ্যামলী নিসর্গ বইটির ভূমিকায় লিখেছিলেন, প্রকৃতিকে দোহন করে নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেই নগরে প্রকৃতিকে স্থাপন করার ব্যাপারে জোর দিতে হবে।
দ্বিজেন শর্মা প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। সংগঠনের সভাপতি ও আয়োজক হিসেবে তিনি তরুণ গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবীদের প্রায়ই রমনা পার্ক, বলধা গার্ডেন ও বোটানিক্যাল গার্ডেনে নিয়ে যেতেন। গাছপালা ও বৃক্ষরাজির সঙ্গে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিতেন। শেখাতেন দেশি ফুলের জাতপাত ও রকমফের। শেখাতেন প্রকৃতিকে ভালোবাসতে ও শ্রদ্ধা জানাতে। যদিও তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ আন্দোলন এখনো মূলত প্রসাধনমূলক (লোক দেখানো)।
জাপানি কৃষক-দার্শনিক মাসানোবু ফুকুওকা বলেছিলেন, “Before researchers become researchers, they should become philosophers.” এই উচ্চারণ যেন গভীরভাবে এসে মিলে যায় দ্বিজেন শর্মার জীবন ও দর্শনের সঙ্গে।
আজ বিশ্বব্যাপী পুঁজির আগ্রাসনে সভ্যতা যখন ধ্বংসপ্রায়, নদী শুকিয়ে যায়, বন হারিয়ে যায়, মানুষ ক্রমেই দূরে সরে যায় প্রকৃতি থেকে—এমন এক বাস্তবতায় দ্বিজেন শর্মার কণ্ঠ আরও জরুরি হয়ে ওঠে। তাঁর কন্ঠে উচ্চারিত সবুজের আহ্বান,
“মানুষ, বৃক্ষের মতো আনত হও, হও সবুজ।”
তথ্যসূত্র
জীবনস্মৃতি : মধুময় পৃথিবীর ধূলি, দ্বিজেন শর্মা
কাহার জন্য ঘন্টা বাজে?, দ্বিজেন শর্মার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ, মুক্তমনা ব্লগ, দীপেন ভট্টাচার্য
দ্বিজেন শর্মা : শ্যামলী নিসর্গের মহান সাধক, কালি ও কলম, মোকারম হোসেন
দ্বিজেন শর্মা : এক অবিনশ্বর প্রাণ, কালি ও কলম, সামসুল ওয়ারেস
লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি ব্রজমোহন কলেজ।






