ফেরার পথরেখায় পড়ে থাকে শুধু স্মৃতিময় টান

শুটিংয়ের ফাঁকে হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল (২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৮— ৩০ জুলাই, ২০২৪) ও পারভেজ চৌধুরী
জীবন একটা ধাবমান ট্রেনের গল্প। সব কিছু পেছন ফেলে কেবলই সামনে এগোয়। আমাদের কৈশোর বেলায় ইন্টারনেট, সেলফোন কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। আমরা গান শোনতাম ক্যাসেটে।
বন্ধু সাব্বির সেলিমের হাতে গায়ক জুয়েলের গানের অডিও অ্যালবাম দেখে চমকে উঠি। কভারে শিল্পীর চোখ দুটি ভীষণ জ্বলজ্বলে, ভাবালুতায় ভরা। সাব্বিরদের সবাই বরিশাল থেকে ময়মনসিংহে এসেছে কিছুদিন আগে। শহরের কাঁচিঝুলিতে ‘অবশেষে‘ নামে বাড়ি করেছে। সাব্বিরের বড় সোহেল ভাই, ছোট তানভীর তমাল খুবই মিশুক। তারাও আমার বন্ধু। তমাল দারুণ গান করে, গায়ক জুয়েলের বন্ধু। সময় পেলেই জুয়েলের গান শোনায়, গল্প করে। এসব শুনে শুনে মনে হতো শিল্পী জুয়েল সম্ভবত আমারও বন্ধু!
নব্বইয়ে স্বৈরাচার পতনের পর আমি চলে যাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। কবিতা লেখার পাশাপাশি ক্যাম্পাসে গ্রুপ থিয়েটার করি। প্রায় বিকালেই ভার্সিটির বাসে করে চলে আসি ঢাকায়। আড্ডা দিই আজিজ মার্কেট, শাহবাগ, চারুকলা আর টিএসসি এলাকায়। দূর থেকে দেখি গায়ক জুয়েলকে। কখনো আড্ডা দিচ্ছে, মঞ্চে গান গাইছে। কোনো দিন কথা হয়নি। বিটিভিতেও গান করে। রাস্তায় বের হলে সবাই তাকে চেনে। পাশ দিয়ে গেলে মানুষজন ফিসফাস করে। অটোগ্রাফ চায়। পরিচিত মুখ, সেলিব্রেটি।
ওয়ার্ল্ডভিও বাংলাদেশ নামে ঢাকার ধানমন্ডিতে একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। সেখানে ভিডিও প্রোগ্রাম প্রোডাকশনের ওপর বেসিক কোর্স করানো হতো। বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশনের যারা আইস-ব্রেকার প্রযোজক ও কলাকুশলী বেশিরভাগই ওয়ার্ল্ডভিও থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। জুয়েলও সেখানকার প্রাক্তন। আমি মাস্টার্সের ছাত্রাবস্থায় কোর্সটি করতে যাই। কোর্স করতে করতে দেখি এখানে নিয়মিত গায়ক জুয়েল আসেন। ততদিনে তিনি বেশ ব্যস্ত ভিডিও প্রোগ্রাম নির্মাতা। সেখানে থেকেই তার সঙ্গে সরাসরি আলাপ ও যোগাযোগ।
১৯৯৭-৯৮ সালে বাংলাদেশে শুরু হয় যুগান্তকারী একুশে টেলিভিশন। যোগ দেয় জুয়েল ভাইসহ বাংলাদেশের আরও অনেক প্রতিশ্রুতিশীল নির্মাতারা। প্রযোজক হিসেবে আমিও জয়েন করি। সবার নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে। একুশেকে ‘ম্যাড হাউস’ বলতাম আমরা, মানে যারা কাজ করতাম সেখানে।
আমার আর জুয়েল ভাইয়ের জয়েনিং ছিল দু’রকম। আমি ইনহাউজ। ইটিভি বাদে বাইরের কোনো কাজ করতে পারতাম না। সোজাসাপটা যাকে বলে চাকরি। জুয়েল ভাই কমিশনিং। ইটিভির কাজ করতেন, স্বাধীনভাবে বাইরের কাজও করতে পারতেন। যাকে বলে ইনডিপেনডেন্ট মেকার। ফলে জুয়েল ভাইয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান নির্মাণে লাইন প্রডিউসার হিসেবে একজন ইনহাউজের প্রযোজককে থাকতে হতো। যার কোনো ক্রিয়েটিভ ইনপুটে ভূমিকা থাকত না শুধু অফিসিয়াল কাজে ফ্যাসিলেটেড করা ছাড়া। আমাকেও তার কিছু অনুষ্ঠানে লাইন প্রডিউসার হিসেবে কাজ করতে হয়েছে। ফলে একসঙ্গে ঢাকার বাইরেও গিয়েছি অনেকবার। চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম, সঙ্গে একুশে টেলিভিশনের এমডি, আমাদের টেলিভিশন ব্রডকাস্টিংয়ের গুরু সাইমন ড্রিং। সে এক স্মৃতিময় ভ্রমণ!
পুরো বাংলাদেশ চমকে যাচ্ছে একুশে টেলিভিশন দেখে। সংবাদ, বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠানমালা। জুয়েল ভাইসহ অন্য প্রযোজকরা একের পর এক চোখ-ধাঁধানো অনুষ্ঠান নির্মাণ করছে। আমার নিয়মিত সব অনুষ্ঠান বাদেও শুরু করি এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ নিয়ে ‘আশে পাশের দেশে’। এই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক নিই জুয়েল ভাইকে। সহকর্মী বা বন্ধু বলে নেওয়া না। তিনি খুব সাবলীল এবং সপ্রতিভ উপস্থাপক ছিলেন।
‘আশেপাশের দেশে’র প্রথম দেশ নির্বাচন করি সিঙ্গাপুর। অনুষ্ঠানের চিত্রগ্রাহক বাংলাদেশের স্বনামধন্য আলোকচিত্রী মহীউদ্দীন আহমেদ শাহীন। শুটিং শেষে অনএয়ার হওয়ার সাথে সাথে দর্শক ফিডব্যাক খুবই ভালো। সিদ্ধান্ত হয় অনুষ্ঠানটির পরিসর আরও বড় করে বিশ্বব্যাপী করা হবে ‘বাক্স পেটরা’ নাম। জুয়েলসহ সংগীতশিল্পী মেহরীন থাকবেন আরেকজন উপস্থাপক। উজবেকিস্তান দিয়ে বাক্স পেটরার শুটিং শুরু। সমরখন্দ, বোখারা শেষ করে ইতিহাসখ্যাত সিল্করুটে শুটিং করছিলাম। ‘বাক্স পেটরা’র এই পর্বের চিত্রগ্রাহক হুমায়ুন কবীর। সেখান থেকে শুনতে পাই একুশে টেলিভিশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভেঙে গেল আমাদের স্বপ্নঘর। ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সবার কর্মক্ষেত্র। তবুও আমাদের পারস্পরিক যোগাযোগ ছিল।
শেষের দিকে জুয়েল ভাই ইংল্যান্ডে থাকা শুরু করলেন। আমি অভিবাসী হয়ে কানাডায়। কিন্তু প্রায়ই ফোনে কথা, মেসেজ আদান-প্রদান হতো।
স্বভাবে ভীষণ স্পষ্টবাদী। শোবিজ স্টার, টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল কিন্তু কখনোই জনপ্রিয়তাকে উদযাপন করেনি, গায়ে মাখেননি। যে তারকা তার নাম-যশ-খ্যাতি থেকে জনপ্রিয়তা, সেলিব্রিটিনেসকে ঝেড়ে ফেলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে— সেই তো আসল সেলিব্রিটি!





