স্মরণে জর্জ অরওয়েল
আমরা কি এনিমেল ফার্মেই থাকি?

জর্জ অরওয়েল (জন্ম ২৫ জুন ১৯০৩- প্রয়াণ ২১ জানুয়ারি ১৯৫০)। ছবিটি ১৯৪৩ সালে তোলা।
জর্জ অরওয়েল—জন্ম ১৯০৩ সালের ২৫ জুন, বিহারের মোতিহারিতে—ছেলেবেলায় একবার লন্ডনের স্কুলে শিক্ষককে প্রশ্ন করে বসেছিলেন: আমরা কেন শুধু সিলেবাসের বই পড়ব? কারা নির্ধারণ করে এই সিলেবাস? কেন করে? ক্ষমতার এই প্রশ্নই তাঁকে আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। পরে বার্মায় পুলিশের চাকরি, প্যারিসের নিচুতলার খেটে খাওয়া জীবন, স্পেনের গৃহযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী লড়াই—সব মিলিয়ে অরওয়েল হয়ে ওঠেন এক নির্ভীক সত্যান্বেষী, যিনি দেখেছিলেন ক্ষমতা কেবল বন্দুকের মুখেই নয়, ক্ষমতা ভাষা বিকৃত করেও সত্যকে হত্যা করে।
একার সন্ন্যাসে থাকা অরওয়েল ১৯৪৫ সালে লিখলেন যুগে যুগে প্রাসঙ্গিক থাকতে থাকা ‘অ্যানিমেল ফার্ম’। বইটি বেরোনোর আগেই টি এস এলিয়ট এর পাণ্ডুলিপি ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, বলেছিলেন, এ রচনা “নিছক এক ধরনের নেতিবাচকতা”। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সমালোচনা কেন করবেন? কিন্তু অরওয়েল থামেননি, কারণ তিনি দেখতে পেয়েছিলেন নির্মম সত্য; বিপ্লবের নামে কীভাবে জন্ম নেয় আরও ভয়ংকর স্বৈরতন্ত্র।
‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এর গল্পটা যেন এক রূপকথা, যা শুরু হয় ঘোর অন্ধকারে। ফার্মের মালিক মি. জোনস, যিনি জারের মতোই অদক্ষ আর নিষ্ঠুর। সেখানে প্রাণীদের ওপর চলে অকথ্য অত্যাচার। একদিন ফার্মের বৃদ্ধ শূকর ‘ওল্ড মেজর’ স্বপ্ন দেখায় এক স্বাধীন খামারের, যেখানে কোনো প্রাণী মানুষকে ভয় পাবে না, সবাই সমান। ওল্ড মেজরের মধ্যে মার্ক্স-লেনিনের মিলিত ছায়া—স্বপ্ন দেখানো সেই পুরনো বিপ্লবী। তার মৃত্যুর পর শূকররা নেতৃত্ব দেয়, জন্তুরা মানুষ তাড়িয়ে দেয়, বিপ্লব সফল হয়। খামারের নাম হয় ‘অ্যানিমেল ফার্ম’। দেয়ালে টাঙানো হয় সাতটি মৌলিক প্রতিজ্ঞা: “দুই পায়ে হাঁটা প্রাণী শত্রু”, “সব প্রাণীই সমান”।
কিন্তু বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শত্রু জন্ম নেয় বিপ্লবীর ভেতরেই। নেপোলিয়ন নামের এক "শূকর", যে স্তালিনের প্রতিমূর্তি, ধীরে ধীরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে থাকে। প্রতিভাবান আদর্শবাদী স্নোবল—যার মধ্যে ট্রটস্কির প্রতিচ্ছবি—পরিকল্পনা করে বায়ুকল তৈরির, সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু নেপোলিয়ন ষড়যন্ত্র করে, গোপনে লালন করা কুকুরের দল—এনকেভিডির মতো গোপন পুলিশ—দিয়ে স্নোবলকে খামার থেকে তাড়িয়ে দেয়। তারপর শুরু হয় ইতিহাস-বিকৃতি। স্কুইলার নামের শূকরটি, যে প্রাভদা পত্রিকার মতো প্রচারযন্ত্র হয়ে ওঠে, নেপোলিয়নের প্রতিটি অন্যায়কে ব্যাখ্যা করে চমৎকার যুক্তিতে। খাবার কমে যায়, শূকররা অতিরিক্ত পায়—স্কুইলার বলে, “তোমরা তো চাও না মি. জোনস ফিরে আসুক?” ভেড়ার দল সমস্বরে চেঁচায়: “চার পা ভালো, দুই পা খারাপ!” তারা না বোঝে, না বুঝতে চায়; তারা শুধু অন্ধভাবে মুখস্থ স্লোগান আওড়ায়—ঠিক সেই অন্ধ অনুসারীদের মতো, যাদের আমরা দেশে দেশে রাজপথে মিছিলে মিছিলে আজও দেখি।
গল্পের সবচেয়ে মর্মান্তিক চরিত্র বক্সার, নিষ্ঠাবান ঘোড়া। সে সর্বহারা শ্রেণির প্রতীক, যার একটাই নীতি: “নেপোলিয়ন সব সময় ঠিক” এবং “আরও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।” প্রাণপণ খেটেও যখন বুড়ো আর অকেজো হয়, তখন নেপোলিয়ন তাকে ডেকে পাঠায় আঠার কারখানায়, বিনিময়ে আসে মদের বোতল। বক্সারের মৃত্যু যেন এক নির্মম শ্রেণিহত্যা, যেখানে যে সমাজ বদলের ইঞ্জিন ছিল, সে-ই হয় সবচেয়ে উপেক্ষিত।
আর সেই দেয়ালের সাতটি প্রতিজ্ঞা? প্রতি মাসে রাতে রাতে পাল্টাতে থাকে। একসময় লেখা হয়: “কোনো প্রাণী বিছানায় ঘুমাবে না”, পরে যোগ হয় “চাদর দিয়ে”, তারপর “কোনো প্রাণী মদ্যপান করবে না” হয়ে যায় “অতিরিক্ত মদ্যপান করবে না”, “কোনো প্রাণী অন্য প্রাণীকে হত্যা করবে না” শেষে দেখা যায় শুধু “বিনা কারণে নয়”। আর সব শেষে সবচেয়ে ভয়ংকর এক বাক্যে সব আদর্শের ছাই গায়ে মেখে দেয় নেপোলিয়নের শাসন: “সব প্রাণী সমান, কিন্তু কিছু প্রাণী অন্যদের চেয়ে বেশি সমান।” অরওয়েলের এই এক বাক্যই যেন সভ্যতার হাজার বছরের রাজনৈতিক সত্য আঁকড়ে ধরে রাখে। এক রাতে ঘটে চূড়ান্ত বিভীষিকা: নেপোলিয়ন মানুষ কৃষকের সঙ্গে তাস খেলে, গেলাসে শ্লোক ওঠে, শূকররা দুই পায়ে হাঁটে। বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে শূকরের মুখ আর মানুষের মুখ আর আলাদা করা যায় না। পুরনো নাম ফিরে আসে— 'ম্যানস ফার্ম'।
শুধু কি এটা সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস? নাকি সেই চিরন্তন গল্প, যেখানে আদর্শের নামে ক্ষমতা দখল হয়, আর ক্ষমতা একবার পেয়ে গেলে মুখ পাল্টায়, চরিত্র নয়? অরওয়েল নিজেই ডায়েরিতে লিখেছিলেন, “শাসক ও জনগণের কি চরিত্র পাল্টায়? হয়তো পাল্টায় না। মুখ পাল্টায় শুধু।” অশোক সুব্রামানিয়ান নামে এক বিশ্লেষক সম্প্রতি বলেছেন, “সমাজ সব সময়ই ক্ষমতার দ্বারা চালিত হয়, এবং ক্ষমতা দাঁড়িয়ে থাকে ভয় ও লোভের দুই স্তম্ভে। আমরা যে পরিবর্তন চাই, তা কখনো কিঞ্চিৎ ঘটে, কিন্তু বড় রকমের পরিবর্তন কখনো হয় না।” অ্যানিমেল ফার্ম শেষ হয়ে গেলেও জোন্স আর স্নোবলদের দেখা যায় সবখানেই—নতুন নামে, নতুন পোশাকে।
এই আয়না আরও গাঢ় অন্ধকারে নিয়ে যায় ‘নাইনটিন এইটি ফোর’-এ। সেখানে উইনস্টন স্মিথ বাস করে এক সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রে, যেখানে ‘সত্য মন্ত্রণালয়’ কাজ করে ইতিহাসকে নিত্যদিন মিথ্যা বানাতে। তাকে শেখানো হয়, ২ আর ২ যোগে ৫ হয়। যা দেখছে, তা সত্য নয়; পার্টি যা বলে, তাই সত্য। প্রতিটি ঘরে টেলিস্ক্রিন বসানো, আর সেই পর্দা থেকে উচ্চারিত হয় এক অসহ্য সত্য—‘বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ।’ বড় ভাই চাইলে যে কোনো মুহূর্তে তোমার শ্বাসপ্রশ্বাস গুনতে পারে। ক্ষমতার এই সর্বব্যাপী প্রতীকের মধ্যে মিশে আছে হিটলার আর স্তালিন দুই-ই। গল্পের শেষে প্রেমিক-প্রেমিকা জুলিয়া আর উইনস্টন রাষ্ট্রীয় নির্যাতনে ভেঙে পড়ে, স্বাধীন সত্তার মৃত্যু ঘটে, জন্ম নেয় আরেক অনুগত দাস।
অরওয়েল নিজে যখন এ বই লিখছিলেন, তিনি তখন অসুস্থ, হতাশ, ক্রমশ নিঃশেষিত। এক জায়গায় লিখেছেন, “আমি সব জায়গাতেই একা ছিলাম… আমার সাহিত্যের শুরুতে মিশে আছে সবার থেকে আলাদা হয়ে একা বাস করা এবং এক শিশুর মতো অবাক বিস্ময়ে সবকিছু পরখ করা।” অসুখ তাঁকে বিষণ্ণ করেছিল, কিন্তু সেই বিষাদই জন্ম দিয়েছিল তাঁর সেরা কাজের। অসুস্থতাই যেন টেনে এনেছিল ‘সত্য মন্ত্রণালয়’-এর শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতা।
আর আজ? টি এস এলিয়টের প্রত্যাখ্যান করা সেই পাণ্ডুলিপির পৃথিবী কি বদলেছে? আজ কি ‘যুদ্ধই শান্তি’র বদলে আমরা শুনি না “পারমাণবিক শক্তিই শান্তি”? টেলিস্ক্রিন কি স্মার্টফোনের চোখে আর ডেটা-নজরদারিতে রূপ নিয়েছে? অ্যানিমেল ফার্মের ভেড়ারা কি আজও রাজপথে নয়, সামাজিক মাধ্যমে একই স্লোগান তুলছে? স্কুইলার কি নিউজরুমে বসে “চমৎকার ব্যাখ্যা” দিয়ে যাচ্ছে? অথবা দেখুন নিজেদের দিকে—কতবার আমরা বক্সারের মতো নিঃশব্দে খেটে গেছি এই ভেবে যে “উপরওয়ালা ঠিকই আছেন”, শেষমেশ নিঃশেষিত বঞ্চিত হওয়া ছাড়া আর কী পেয়েছি?
অরওয়েল ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এ যে আয়নাটা ধরেছিলেন, তা কেবল সোভিয়েত রাশিয়া নয়, বরং প্রতিটি সেই সমাজের যেখানে ক্ষমতার কাছে সত্য হার মানে, যেখানে বিপ্লব প্রশ্নকে ভয় পায়, আর নেতা হয়ে ওঠেন নতুন শাসক। শিরোনামের প্রশ্নটাই তাই চূড়ান্ত: “অরওয়েলের এনিমেল ফার্মেই কী আমাদের বসবাস!” উত্তরটা হয়তো বইয়ের শেষ দৃশ্যে লুকিয়ে আছে—যখন শূকর আর মানুষের মুখ আলাদা করা যায় না, তখন আমরা বুঝতে পারি, অ্যানিমেল ফার্ম নামে নয়, বরং পৃথিবীর বুকেই সেই খামার চিরকাল প্রসারিত। আমাদের একমাত্র অস্ত্র চোখ খোলা রাখা—যাতে কোন শূকর কখন দুই পায়ে হাঁটা শুরু করে, আমরা সময়মতো তা দেখতে পাই। কারণ, বড় ভাই এখনো নজর রাখছে, কিন্তু আমরা কি নিজেদের চোখ রাখছি নিজেদের ওপর?
স্বাভাবিক শিক্ষাটুকু নেয়ার পাশাপাশি আসুন স্মরণ করি জর্জ অরওয়েলকে আর মনে মনে হলেও বলি, শুভ জন্মদিন।
লেখক: সাহিত্য সম্পাদক এবং হেড অব ক্রিয়েটিভ, রিসার্চ অ্যান্ড ইভেন্টস, আগামীর সময়




