স্মরণ
চিরবিদ্রোহী রাজনীতিক অলি আহাদ

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন চলাকালে প্রখ্যাত সাংবাদিক জহুর হোসেন চৌধুরী ‘দৈনিক সংবাদ’-এর যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। সরকারি মহলে ভালো যোগাযোগ থাকায় একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে সরকারের কঠোর মনোভাবের কথা তিনি জানতেন। ভাষাসংগ্রামী অলি আহাদকে তিনি খুব স্নেহ করতেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি নিজের বাসভবনে তিনি অলি আহাদকে জানালেন, আন্দোলন দমন করতে সরকার প্রয়োজনে সেনাবাহিনী ও ট্যাংক ব্যবহার করবে। জবাবে অলি আহাদ বলেছিলেন, ‘দাসত্বের চেয়ে মৃত্যু ভালো।’ এই সাহসী ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষটির ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ২০ অক্টোবর।
আমাদের ইতিহাসের নানা বাঁকে জড়িয়ে রয়েছে অজস্র ঘটনা। এসব ঘটনার রয়েছে নায়ক ও খলনায়কসহ নানা চরিত্র। তেমনি ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ভাষাসৈনিক অলি আহাদ। তিনি ছিলেন এক চিরবিপ্লবী ও চিরবিদ্রোহী রাজনীতিক, যার জীবনে আপস বলে কিছু ছিল না। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি আদায় করেই তিনি থেমে থাকেননি; বরং স্বাধিকার, স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার আদায়ের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাতালিকার শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও তিনি কোনো নিশ্চিত পেশা বেছে নেননি। জনগণের মুক্তির জন্য তিনি বেছে নেন রাজনীতিকে। আজকের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে এই অসম্ভব মেধাবী, জ্ঞানী মানুষটির জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আলোচনা করলে প্রশ্ন জাগে, তিনি কি আসলে সফল ছিলেন রাজনীতিতে? কারণ বর্তমান বাস্তবতায় মন্ত্রী-এমপি হওয়াকেই রাজনৈতিক সফলতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তা যত আদর্শহীন বা অন্ধকার পথেই হোক না কেন।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করতে গিয়েই তাকে প্রথম কারাগারে যেতে হয়। ১৯৪৮ সালের ২৯ মার্চ তৎকালীন সরকার তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার বছর বহিষ্কার করে। বিকম সম্পন্ন করলেও এমকম পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ ৫৮ বছর পর ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেই আদেশ প্রত্যাহার করে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাতীয় রাজনীতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জীবনের শেষভাগে তিনি ‘ডেমোক্রেটিক লীগ’ গঠন করে আমৃত্যু এর সভাপতি ছিলেন। তিনি আশির দশকের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘ইত্তেহাদ’-এর সম্পাদক এবং ঐতিহাসিক ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-১৯৭৫’ গ্রন্থের প্রণেতাও ছিলেন।
আজকের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে এই অসম্ভব মেধাবী, জ্ঞানী মানুষটির জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আলোচনা করলে প্রশ্ন জাগে, তিনি কি আসলে সফল ছিলেন রাজনীতিতে
১৯২৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইসলামপুরে জন্ম নেওয়া অলি আহাদের বাবা আবদুল ওহাব ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার। পড়াশোনার হাতেখড়ি পরিবারে। ১৯৪৪ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে গণভোটে তিনি ত্রিপুরা জেলার চার সদস্যের ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনের কারণে ১৯৪৬ সালে আইএসসি পরীক্ষা বিসর্জন দিতে হয়। ১৯৪৭ সালে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিকমে ভর্তি হন।
তিনি ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় নুরুল আমিনের সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। আওয়ামী লীগ অফিসে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে ১৪৪ ধারা না ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে বদ্ধপরিকর ছিল। সংগ্রাম পরিষদের সভায় আবদুল মতিন, অলি আহাদ ও গোলাম মওলা ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে ভোট দেন।
পুলিশ নিরাপত্তা আইনে আবুল হাশিম, আবদুল হামিদ খান ভাসানী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক অজিতকুমার গুহ, পুলিন দে, অধ্যাপক পৃথ্বিশ চক্রবর্তী, অলি আহাদ প্রমুখকে গ্রেপ্তার করে। নুরুল আমিন সরকার ভাষা আন্দোলনকারীদের ‘ভারতের চর’, ‘হিন্দু’, ‘কমিউনিস্ট’ ইত্যাদি আখ্যা দেয়।
ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নায়ক এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অলি আহাদ তার জীবনের দীর্ঘ ১৯ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাঙ্গে রাজনীতি করা এই নেতা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।
১৯৫৭ সালের কাগমারি সম্মেলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনৈতিক মেরূকরণের সময় তিনি মওলানা ভাসানীর সঙ্গে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান নেন এবং শাসকদের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও তিনি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। আশির দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন ভূমিকার কারণে তাকে বারবার কারাবরণ করতে হয় এবং তার সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ’ নিষিদ্ধ করা হয়।
১৯৮২ সালের পর এরশাদ সরকারের বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে তিনি যে ঐতিহাসিক জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তা আজও আমাদের সব সংগ্রামের প্রেরণা। ক্ষমতার মোহ তাকে কখনো টলাতে পারেনি। শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান কিংবা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ— সবাই তাকে ক্ষমতার পাশে রাখতে চাইলেও তিনি তা অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করেছেন।
রাজনীতিতে পড়াশোনার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন। আদর্শিক রাজনীতির ধ্রুবতারা ভাষাবীর অলি আহাদ ২০১২ সালে ৮৩ বছর বয়সে ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে মারা যান। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ২০০৪ সালে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয়।
ক্ষমতার রাজনীতিতে দৃশ্যত অলি আহাদ সফল ব্যক্তি নন। কিন্তু গণমানুষের কল্যাণে, জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের ভূমিকা বিশ্লেষণে তার সফলতা ঈর্ষণীয়। আজকের পরিবর্তিত বাস্তবতায় অলি আহাদের ধ্যান-ধারণার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হলে সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারা বিকাশ লাভ করতে পারে।
লেখক: বিশ্লেষক ও লেখক



