ফ্রান্স থেকে মহাবিশ্বের পথে ইকরামুল কবির

ইকরামুল কবির। ছবি : সংগৃহীত
মহাবিশ্বের বিশালতার সামনে মানুষের জ্ঞান এখনো সীমিত। কোটি কোটি নক্ষত্র, গ্যালাক্সি আর অজানা শক্তির সমন্বয়ে তৈরি এই মহাবিশ্বের অনেক রহস্যের উত্তর এখনো খুঁজে চলেছেন বিজ্ঞানীরা। সেই অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর অন্যতম হলো ডার্ক এনার্জি। মহাবিশ্বের দ্রুত সম্প্রসারণের পেছনে যে রহস্যময় শক্তির ভূমিকা রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, সেটির প্রকৃতি ও উৎস জানার গবেষণায় যুক্ত হচ্ছেন বাংলাদেশের তরুণ গবেষক ইকরামুল কবির।
বাগেরহাটের মোল্লাহাটের এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা ইকরামুলের পথচলা এখন আন্তর্জাতিক গবেষণার অঙ্গনে। ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি নিজেকে তৈরি করেছেন বিশ্বমানের গবেষণার জন্য। এবার তার সামনে নতুন অধ্যায়। চীনের বিশ্বখ্যাত ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সেখানে ইতালীয় কসমোলজিস্ট অধ্যাপক আন্তোনিনো মারচিয়ানোর তত্ত্বাবধানে ‘কোয়ান্টাম মডেল অব ডার্ক এনার্জি’ বিষয়ে গবেষণা করবেন।
১৯৯৪ সালে বাগেরহাট জেলার মোল্লাহাট উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন ইকরামুল কবির। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে ছিল জানার প্রবল আগ্রহ। আকাশের তারা, নক্ষত্র, প্রকৃতি কিংবা মহাবিশ্বের বিশালতা তাকে ভাবিয়ে তুলত। অন্যরা যেখানে শুধু দেখত, তিনি সেখানে খুঁজতেন কারণ। ছোটবেলায় তার সবচেয়ে বেশি পরিচিত বৈশিষ্ট্য ছিল প্রচুর প্রশ্ন করা।
পরিবারে উচ্চশিক্ষার তেমন কোনো পটভূমি ছিল না। তাই নিজের ভবিষ্যতের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হয়েছে। বিজ্ঞানীদের জীবন ও গবেষণা তাকে ছোটবেলা থেকেই অনুপ্রাণিত করেছে। আলবার্ট আইনস্টাইন, আইজ্যাক নিউটন, গ্যালিলিও গ্যালিলেই ও স্টিফেন হকিংয়ের কাজ তার চিন্তার জগৎকে প্রভাবিত করে।
২০১০ সালে সরকারি ওয়াজেদ মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৩ সালে খুলনার শতদল মহাবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি সম্পন্ন করেন তিনি। পদার্থবিদ্যা ও গণিত ছিল তার বিশেষ আগ্রহের বিষয়। শুধু পরীক্ষার ফল নয়, বিষয়গুলোর গভীরে যাওয়ার প্রবণতাই তাকে এগিয়ে নিয়েছে।
এইচএসসি শেষে বিদেশে পদার্থবিদ্যা নিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেন ইকরামুল। ২০১৫ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ইতালিতে পাড়ি জমান। সেখানে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও কিছুদিন পর উপলব্ধি করেন, তার প্রকৃত আগ্রহ পদার্থবিদ্যায়। নিজের পছন্দের বিষয়ে ফিরতে তিনি ঝুঁকি নেন এবং নতুন করে পথচলা শুরু করেন।
২০১৮ সালে ফ্রান্সে আসেন তিনি। শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি এবং ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ফরাসি ভাষা শেখার পাশাপাশি আবার শুরু করেন পদার্থবিদ্যার পড়াশোনা। কয়েক বছরের স্টাডি গ্যাপ কাটিয়ে ২০২০ থেকে ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি অব লিল থেকে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
স্নাতক পর্যায়ে অ্যাস্ট্রোনমি ও অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের বিভিন্ন কোর্স অধ্যয়নের মাধ্যমে তার আগ্রহ আরও গভীর হয় তাত্ত্বিক কসমোলজিতে। মহাবিশ্বের উৎপত্তি, গঠন, বিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণার এই ক্ষেত্র তাকে আকৃষ্ট করে।
২০২৩ সালে ইতালির পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোফিজিক্স অ্যান্ড কসমোলজি মাস্টার্স প্রোগ্রামের ‘থিওরি অ্যান্ড মডেলিং’ ট্র্যাকে আঞ্চলিক বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হন তিনি। মাস্টার্সের সময় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যারিস অবজারভেটরিতে গবেষণার সুযোগ পান।
প্যারিস পিএসএল বিশ্ববিদ্যালয়ের লুথ গবেষণাগারে অধ্যাপক পিয়ের-স্তেফানো কোরাসানিতির তত্ত্বাবধানে ছয় মাস নন-ডাইনামিক্যাল ডার্ক এনার্জি নিয়ে গবেষণা করেন ইকরামুল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ১১০-এর মধ্যে ১০৩ নম্বর অর্জন করে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিএইচডি গবেষণার বিষয় হবে ‘কোয়ান্টাম মডেল অব ডার্ক এনার্জি’। গবেষণার মাধ্যমে ডার্ক এনার্জির উৎপত্তি, মহাজাগতিক ইনফ্লেশন এবং মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে নতুন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা অনুসন্ধানের চেষ্টা করবেন তিনি।
বিজ্ঞানীদের কাছে ডার্ক এনার্জি এখনো মহাবিশ্বের অন্যতম বড় রহস্য। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ কেন দ্রুত হচ্ছে, এর পেছনের শক্তির প্রকৃতি কী, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। সেই বৈশ্বিক অনুসন্ধানের অংশ হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের এই তরুণ গবেষক।
গবেষণার পাশাপাশি ইকরামুল কবির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ক্যাম-সাস্ট ও জগন্নাথ ফিজিক্স ক্লাবের বিভিন্ন ওয়েবিনারে কসমোলজি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পরামর্শ ও মেন্টরিং করেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনে ইকরামুল কবির একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। তার বিশ্বাস, বিজ্ঞান ও ধর্ম সত্য অনুসন্ধানের দুটি ভিন্ন পথ। সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে ফ্রান্সে গ্রিনপিসের সঙ্গে যুক্ত থেকে পরিবেশ সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং নিরাপদ পারমাণবিক শক্তি নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রমেও অংশ নিচ্ছেন।
বাগেরহাটের মোল্লাহাট থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা এখন ফ্রান্স পেরিয়ে পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক গবেষণার কেন্দ্রে। একসময় যে কিশোর রাতের আকাশ দেখে মহাবিশ্ব নিয়ে প্রশ্ন করত, আজ সেই তরুণই মহাবিশ্বের অজানা রহস্যের উত্তর খুঁজতে গবেষণায় যুক্ত।




