Agamir Somoy E-Paper
শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
আগামীর সময়
জামালের ‘সেলুন লাইব্রেরি’
শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় প্রবাস

নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার তিন যুগের প্রস্তুতি

বিশ্বজিত সাহা
agamir somoy
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ২০:০৮
নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার তিন যুগের প্রস্তুতি

বিশ্বজিত সাহা

আমি যখন নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার দীর্ঘ পথচলার দিকে ফিরে তাকাই, তখন এটি আমার কাছে নিছক একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনের সীমায় আবদ্ধ থাকে না; বরং এটি প্রবাসে বাঙালি অস্তিত্বের এক গভীর ইতিহাসের প্রতীক হয়ে ওঠে। এই মেলা একদিকে যেমন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ধারাবাহিক চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করেছে, অন্যদিকে তেমনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করার এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।

প্রবাসের ভিন্ন বাস্তবতায়, যেখানে ভাষা ও পরিচয়ের সংকট প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, সেখানে এই বইমেলা হয়ে উঠেছে আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের এক সৃজনশীল ও সম্মিলিত প্রয়াস। এই আয়োজনের ভেতরে লুকিয়ে আছে বহু মানুষের স্বপ্ন, ত্যাগ ও নিরলস পরিশ্রমের গল্প; যেখানে সাহিত্যপ্রেমী, সংগঠক, লেখক ও শিল্পীরা একত্রে একটি সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ করেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মেলা শুধু বই বিক্রির জায়গা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি রূপ নিয়েছে বাঙালি বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময়, চিন্তার আদান-প্রদান এবং নতুন সৃষ্টিশীলতার উন্মেষস্থলে।

এখানে নতুন লেখকের আত্মপ্রকাশ যেমন ঘটে, তেমনি প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের সঙ্গে পাঠকের এক আন্তরিক সংযোগও গড়ে ওঠে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই বইমেলা প্রবাসে বসবাসরত বাঙালিদের জন্য এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক ঘর’ তৈরি করেছে; যেখানে তারা ভাষা, স্মৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেদের পুনরায় সংযুক্ত করতে পারে। ফলে নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা এখন আর শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি প্রবাসী বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এবং সৃজনশীল ধারাবাহিকতার এক জীবন্ত দলিল।

সূচনা: ১৯৯১-১৯৯২ : স্বপ্ন থেকে বাস্তবতা

আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রার সূচনা ঘটে ১৯৯১ সালে, যখন নিউ ইয়র্কে ‘মুক্তধারা’র কার্যক্রমকে একটি সুসংগঠিত রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে প্রকৃত অর্থে বইমেলার জন্ম হয় ১৯৯২ সালে- এই বছরটিকেই আমি এই ঐতিহাসিক উদ্যোগের ভিত্তিবর্ষ হিসেবে বিবেচনা করি। ১৯৯২ সালে আমার সঙ্গে ছিলেন হারুন আলী, আব্দুর রহিম বাদশা, ছাখাওয়াত আলী, সজল পাল, শামীম হোসেন এবং দিলদার হোসেন দিলু। আমরা সাত তরুণের উদ্যম দিয়ে বইমেলার ভিত্তি তৈরি করেছিলাম। প্রসঙ্গত বলা দরকার, ১৯৯২ সালে একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিউ ইয়র্কে বাংলা বইমেলার যাত্রা শুরু হয়েছিল অত্যন্ত সীমিত পরিসরে, কিন্তু গভীর সাংস্কৃতিক স্বপ্নকে সামনে রেখে। ব্রুকলিনের একটি পাবলিক স্কুল এবং একই সময়ে কুইন্সের একটি ছোট্ট চার্চে টেবিলের ওপর বই সাজিয়ে সেই প্রথম বইমেলার আয়োজন করা হয়। প্রবাসজীবনের বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে ঘিরে একটি সাংস্কৃতিক স্বদেশ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাই ছিল এই উদ্যোগের মূল শক্তি।

প্রথম দিকের সেই ছোট্ট আয়োজন ধীরে ধীরে নিউ ইয়র্কের বাঙালি সমাজে এক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের রূপ নেয়। পরবর্তীকালে বইমেলাটি মূলত কুইন্সকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। এস্টোরিয়া, উডসাইড ও জ্যাকসন হাইটসসহ বিভিন্ন এলাকায় গত তিন দশক ধরে বইমেলার আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিউ ইয়র্কের বহুসাংস্কৃতিক নগরজীবনের ভেতরে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিক উপস্থিতি গড়ে তুলতে এই মেলার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৩ সাল থেকে বইমেলাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে জ্যামাইকা পারফরমিং আর্টস সেন্টারে (JPAC) ; সবুজে ঘেরা পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক এই পরিবেশ অনেকের কাছেই বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের আবহকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ফলে প্রবাসের মাটিতে বইমেলাটি এখন শুধু একটি বাণিজ্যিক বা প্রকাশনা অনুষ্ঠান নয়, বরং এক ধরনের সাংস্কৃতিক পুনর্মিলন ও স্মৃতির ভ্রাম্যমাণ স্বদেশভূমিতে পরিণত হয়েছে। শুরুর সময় সংগঠনটির নাম ছিল ‘মুক্তধারা নিউ ইয়র্ক’। পরে ২০০৬ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশনে’ রূপ নেয়। এই রূপান্তর শুধু একটি সাংগঠনিক পরিবর্তন ছিল না; বরং প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ছিল। একসময় বইমেলার সময়সূচি ও সাংস্কৃতিক দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন বাংলা সাহিত্যের প্রবীণ ও বিশিষ্ট সাহিত্যিকরা। শহীদ কাদরী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের মতো লেখকদের পরামর্শ ও উপস্থিতি বইমেলাকে এক বিশেষ সাহিত্যিক মর্যাদা দিত। এর ফলে বইমেলাটি শুধু প্রবাসী বাঙালিদের মিলনমেলা নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পরিসরেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

১৯৯২ সালের সেই ছোট্ট সূচনায় কয়েকটি টেবিল জুড়ে বই সাজিয়ে মেলা শুরু হয়েছিল। সেসময় তারিক মাহবুবের একটি প্রতিষ্ঠান এবং বিএটিএস মেলায় স্টল দিয়েছিল। ধীরে ধীরে এই আয়োজনের পরিসর বাড়তে থাকে। ১৯৯৪ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশকরা সরাসরি অংশগ্রহণ শুরু করেন। এর মধ্য দিয়ে নিউ ইয়র্কের বাংলা বইমেলা বাংলাদেশ ও প্রবাসী বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির এক সেতুবন্ধনে পরিণত হয়, যা আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রবাসী বাংলা বইমেলা হিসেবে স্বীকৃত।

১৯৯২ সালের প্রেক্ষাপটটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেসময় প্রবাসে বসবাসরত বাঙালিদের জন্য একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্‌যাপন বা ভাষা-সাংস্কৃতিক চেতনা প্রকাশের মতো কোনো শক্তিশালী ও ধারাবাহিক প্ল্যাটফর্ম ছিল না। সেই শূন্যতা থেকেই আমাদের উদ্যোগের সূচনা। আমরা জাতিসংঘ সদরদপ্তরের সামনে একটি অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করি— যা শুধু একটি প্রতীকী নির্মাণ নয়, বরং প্রবাসে বাংলা ভাষার মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের দাবিকে দৃশ্যমান করে তোলার এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়েই মূলত আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভিত্তি রচিত হয়। ভাষার প্রতি ভালোবাসা, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং প্রজন্মান্তরে সেই চেতনা পৌঁছে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়।

সেই একই বছর আমরা বইমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সূচনা করি— একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে: প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখা এবং নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ‘মুক্তধারা নিউ ইয়র্ক’ এবং ‘বাঙালি চেতনা মঞ্চ’ যৌথভাবে কাজ শুরু করে। সম্মিলিত প্রচেষ্টা বইমেলাকে একটি ধারাবাহিক ও প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করে, যা ধীরে ধীরে প্রবাসী বাঙালিদের বৃহত্তর পরিচয় নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে, এই সাংগঠনিক উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেওয়া হয়।

একুশে থেকে প্রতিষ্ঠান: সাংস্কৃতিক রূপান্তর

প্রথমদিকে এই উদ্যোগটি ছিল নিখাদ আবেগ, দায়বদ্ধতা এবং ভাষা-ভালোবাসা থেকে উৎসারিত একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টা। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা উপলব্ধি করি— শুধু আবেগ দিয়ে এমন একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব নয়; এটিকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন সুসংগঠিত পরিকল্পনা, ধারাবাহিকতা এবং একটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। সেই উপলব্ধি থেকেই আমরা ধাপে ধাপে বইমেলাকে একটি স্থায়ী ও কার্যকর সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের কাজ শুরু করি। প্রথমত, আমরা বইমেলাকে একটি নিয়মিত আয়োজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করি— যাতে এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা না হয়ে, বরং প্রবাসী বাঙালিদের ক্যালেন্ডারের একটি প্রত্যাশিত সাংস্কৃতিক মুহূর্ত হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, বই বিক্রির পরিসীমা ছাড়িয়ে আমরা এর সঙ্গে যুক্ত করি বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম- সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাহিত্য আলোচনা, সেমিনার, কবিতা পাঠ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ। এর ফলে বইমেলা একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়, যেখানে জ্ঞান, শিল্প ও সৃজনশীলতার সম্মিলন ঘটে। তৃতীয়ত, আমরা বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের লেখক, প্রকাশক এবং সংস্কৃতিকর্মীদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করি। এর মাধ্যমে প্রবাস ও স্বদেশের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি হয়, যা বাংলা সাহিত্যকে একটি বৈশ্বিক পরিসরে উপস্থাপনের সুযোগ করে দেয়। লেখক-পাঠকের সরাসরি সংযোগ এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক বিনিময় বইমেলাকে আরও প্রাণবন্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পাবলিক লাইব্রেরিতে বাংলা বই পৌঁছে দেওয়া।

আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, প্রবাসে বাংলা ভাষার টিকে থাকার জন্য শুধু অনুষ্ঠান নয়, জ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক প্রবাহও জরুরি। সেই লক্ষ্যেই আমরা লাইব্রেরিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করি এবং ধীরে ধীরে বাংলা বই সরবরাহ শুরু করি। ২০১২ সালের মধ্যে আমরা প্রায় ২৬টি লাইব্রেরিতে বাংলা বই পৌঁছে দিতে সক্ষম হই— যা আমাদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল। এই উদ্যোগের ফলে বাংলা ভাষা শুধু প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি আন্তর্জাতিক পাঠকসমাজের কাছেও পৌঁছানোর একটি পথ তৈরি করেছে। এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই একসময় আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করি- আমরা আর শুধু একটি বইমেলা আয়োজন করছি না; আমরা আসলে একটি দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক অবকাঠামো নির্মাণ করছি। এটি এমন এক পরিসর, যেখানে ভাষা, সাহিত্য, স্মৃতি ও পরিচয় একত্রে বিকশিত হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মিত হয়।

আকারে ও প্রভাবে বিস্তার

পুনরায় বলছি, শুরুতে আমাদের এই বইমেলা ছিল অত্যন্ত সীমিত পরিসরের- একটি ছোট অডিটোরিয়ামে একদিনের সরল আয়োজন। ব্রুকলিনের একটি স্থানীয় স্কুলে অল্প কিছু বই, হাতে গোনা কয়েকজন তরুণ কর্মী এবং স্বল্পসংখ্যক দর্শনার্থীকে সঙ্গে নিয়েই এই যাত্রার সূচনা। পরে কুইন্সের একটি চার্চের মিলনায়তনে স্থানান্তরিত হয়ে ধীরে ধীরে এটি প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। সে সময় আমাদের ছিল নানা সীমাবদ্ধতা- স্থান, অর্থ, প্রচার- সবকিছুরই অভাব ছিল; কিন্তু একটি জিনিসের অভাব ছিল না, তা হলো ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং সেই ভালোবাসাকে টিকিয়ে রাখার দৃঢ় সংকল্প।

বছরের পর বছর ধরে লেখক, পাঠক, শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের আন্তরিক অংশগ্রহণে এই ক্ষুদ্র উদ্যোগ ক্রমে বিস্তৃত হতে থাকে। একসময় যে আয়োজন ছিল কেবল প্রবাসী কিছু মানুষের আবেগের বহিঃপ্রকাশ, সেটিই ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে প্রতিটি দশকই বইমেলার বিকাশে একেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৯০-এর দশকে ছিল এর ভিত্তি স্থাপনের সময়- সীমিত পরিসরে হলেও একটি ধারাবাহিক উদ্যোগ হিসেবে বইমেলাকে দাঁড় করানোর সংগ্রাম। বিশের দশকে লেখক ও প্রকাশকদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়; বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত সাহিত্যিকদের উপস্থিতি মেলাটিকে নতুন মাত্রা দেয়। ২০০৭ সালে একটি সংগঠিত আহ্বায়ক কাঠামোর সূচনা এই উদ্যোগকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, যা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্থিতিশীলতা আনে।

২০১০-এর দশকে বইমেলা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে শুরু করে- বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লেখক, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীরা এতে যুক্ত হতে থাকেন। এই সময় থেকেই এটি প্রবাসে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ২০২০ সালে বৈশ্বিক মহামারির সময়, যখন সবকিছু স্থবির হয়ে পড়েছিল, তখনও আমরা থেমে থাকিনি; বরং ভার্চুয়াল মাধ্যমে ১০ দিনের বইমেলার আয়োজন করে নতুন বাস্তবতায় অভিযোজনের সক্ষমতা দেখিয়েছি। পরবর্তীকালে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বইমেলা পূর্ণাঙ্গ চার দিনের আন্তর্জাতিক ফরম্যাটে প্রতিষ্ঠিত হয়- যা এর পরিণত ও বিস্তৃত রূপের প্রতিফলন।

২০২৪ সালে প্রায় ৪০টি প্রকাশনা সংস্থা এবং শতাধিক লেখকের অংশগ্রহণ এই বিস্তারের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে, যা আমাদের দীর্ঘ পথচলার সাফল্যকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে। আজ সেই একদিনের ছোট আয়োজনই পরিণত হয়েছে চার দিনের এক বৃহৎ আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলায়- যেখানে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লেখক, প্রকাশক ও পাঠকরা একত্রিত হন। এটি এখন আর শুধু একটি বইমেলা নয়; এটি প্রবাসে বাঙালি পরিচয়, সাহিত্যচর্চা এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যের এক অনন্য ও শক্তিশালী মঞ্চ, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে তিন দশকের বেশি সময়ের এক অবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম, স্বপ্ন ও সৃজনশীলতার ইতিহাস।

নেতৃত্ব: সম্মিলিত দায়িত্ব ও ধারাবাহিকতা

এই মেলার একটি অন্যতম শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য হলো এর সুপরিকল্পিত ও বহুমাত্রিক নেতৃত্ব কাঠামো, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটিকে টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। ২০০৭ সাল থেকে আহ্বায়কভিত্তিক কমিটি গঠনের মাধ্যমে আমরা একটি নতুন সাংগঠনিক ধারা প্রতিষ্ঠা করি। এই কাঠামোর মূল ভিত্তি তিনটি- রোটেশনাল নেতৃত্ব, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, এবং প্রজন্মান্তরের সংযোগ। অর্থাৎ, নেতৃত্ব একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত না থেকে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হয়েছে; সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন মত ও অভিজ্ঞতা; এবং প্রবীণ ও নবীন- উভয় প্রজন্মের মধ্যে একটি কার্যকর সংলাপ ও সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে হাসান ফেরদৌস, ড. নূরুন নবী, রোকেয়া হায়দারসহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এই দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের সম্মিলিত অবদান এই বইমেলাকে ব্যক্তি-নির্ভর উদ্যোগ থেকে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় উন্নীত করেছে, যেখানে ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়েছে।

এই প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় মেলার উদ্বোধকদের উত্তরাধিকার ধারায়। ১৯৯২ সালে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু, তা পরবর্তী সময়ে শহীদ কাদরী, হুমায়ূন আহমেদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বাংলা সাহিত্যের দিকপালদের উপস্থিতিতে সমৃদ্ধ হয়েছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, সেলিনা হোসেন, পবিত্র সরকার, ফরিদুর রেজা সাগর, মুহম্মদ নূরুল হুদা, শাহাদুজ্জামান এবং ২০২৬ সালে ইমদাদুল হক মিলনের মতো বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণ এই ধারাবাহিকতাকে আরও সুদৃঢ় করেছে। এই তালিকা কেবল কিছু নামের সমষ্টি নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে বাংলা সাহিত্যের মূল স্রোত এবং প্রবাসী উদ্যোগ একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা কোনো বিচ্ছিন্ন বা প্রান্তিক আয়োজন নয়; বরং এটি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় প্রবাহের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। এখানে প্রবাস ও স্বদেশের মধ্যে একটি সৃজনশীল বিনিময় ঘটে, যা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বৈশ্বিক বিস্তারে একটি অনন্য ভূমিকা পালন করে।

সাম্প্রতিক রূপান্তর: ২০২০-২০২৬

সাম্প্রতিক সময়- বিশেষত ২০২০ থেকে ২০২৬- নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের পর্ব হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই সময়কাল শুধু ধারাবাহিকতার নয়, বরং সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ২০২০ সালে বৈশ্বিক মহামারির আঘাতে যখন বিশ্বের প্রায় সব সাংস্কৃতিক আয়োজন স্থবির হয়ে পড়ে, তখন আমরা থেমে থাকিনি। বরং নতুন বাস্তবতাকে গ্রহণ করে বইমেলাকে ১০ দিনের একটি ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত করি। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি বিকল্প আয়োজন ছিল না; এটি ছিল আমাদের সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত অভিযোজন এবং সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার এক শক্তিশালী প্রকাশ। অনলাইন মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পাঠক, লেখক ও দর্শকদের যুক্ত করে আমরা দেখিয়ে দিই- সাংস্কৃতিক আন্দোলন কোনো পরিস্থিতিতেই থেমে থাকে না।

২০২৩ সালে ৩২তম মেলার মাধ্যমে আমরা আবার সরাসরি আয়োজনের জগতে ফিরে আসি। এই প্রত্যাবর্তন ছিল শুধু শারীরিক উপস্থিতির নয়, বরং এক ধরনের পুনর্জাগরণ- যেখানে দীর্ঘ বিরতির পর মানুষ আবার একত্রিত হয়, বই হাতে নেয়, আলোচনায় অংশ নেয় এবং সাংস্কৃতিক উচ্ছ্বাসে শামিল হয়। ২০২৪ সালে ৩৩তম মেলা “যত বই, তত প্রাণ’’ স্লোগানে নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছায়। এই বছরটি ছিল আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের একটি মাইলফলক, যেখানে মেলার পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা আরও বিস্তৃত হয়। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা, কার্যক্রমের বৈচিত্র্য এবং গণমাধ্যমের মনোযোগ- সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি পরিণত আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ইভেন্ট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। ২০২৫ সালে মেলা আরও বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করে। ২৫টিরও বেশি প্রকাশনা সংস্থার অংশগ্রহণ, আন্তর্জাতিক অতিথিদের উপস্থিতি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা এবং আলোকচিত্র প্রদর্শনী- এসব উপাদান মেলাটিকে একটি সমন্বিত সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত করে। এখানে ইতিহাস, সাহিত্য, চিত্রকলার মতো বিভিন্ন ধারার সম্মিলন ঘটে, যা মেলার বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা ও বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে। ২০২৫-এর ৩৪তম আসর আবার অন্য মাত্রা যোগ করে। সেবারের মেলা উদ্বোধন করেন সাদাত হোসাইন; প্রধান অতিথি ছিলেন ফিলিস টেইলর; বিশেষ অতিথি ছিলেন রেহমান সোবহান, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, রওনক জাহান ও সিতারা বেগম।

অবশেষে ২০২৬ সালে ৩৫তম মেলা এক বিশেষ মাইলফলক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ২২ থেকে ২৫ মে পর্যন্ত জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই আয়োজন সময়সূচির দিক থেকেও সুপরিকল্পিত- উদ্বোধনী দিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা, এবং পরবর্তী দিনগুলো সকাল ১১টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। এই বছর নতুন লোগো, সমৃদ্ধ স্মারক গ্রন্থ এবং ব্যাপক আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ মেলাটিকে এক নতুন পর্যায়ে উন্নীত করেছে। সব মিলিয়ে, ২০২০ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত এই সময়কাল প্রমাণ করে- নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা কেবল একটি ধারাবাহিক আয়োজন নয়; এটি একটি অভিযোজনশীল, সৃজনশীল এবং ক্রমবিকাশমান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, যা সময়ের চ্যালেঞ্জকে ধারণ করে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করতে সক্ষম।

চার দিনব্যাপী এই মেলায় তিন দশকের বেশি সময়ের অভিযাত্রার সফল প্রতিফলন হিসেবে বেশ কিছু বিশেষ ও স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছে:

বিশেষ ঘটনা ১: ইমদাদুল হক মিলনের শুভ উদ্বোধন ও ৩ দশকের ইতিহাস প্রদর্শন: বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন ফিতা কেটে ৩৫তম মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এই তিন যুগের মাইলফলককে স্মরণীয় করে রাখতে মেলার প্রবেশপথে ১৯৯২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরের উদ্বোধকদের নাম, ছবি ও পরিচিতি সম্বলিত একটি দৃষ্টিনন্দন সংক্ষিপ্ত ইতিহাস প্রদর্শন করা হয়, যা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রবাসে আমাদের ধারাবাহিক পথচলার এক জীবন্ত দলিল হিসেবে দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

বিশেষ ঘটনা ২: প্রধান অতিথি অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে আজীবন সম্মাননা: এবারের মেলার প্রধান অতিথি ছিলেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও চিন্তাবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘মুক্তধারা সুকৃতজ্ঞ সম্মাননা’ ও আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়।

বিশেষ ঘটনা ৩: ২৫টির অধিক প্রকাশকের মেলা ও ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষের ঢল: এবারের মেলায় বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত ২৫টিরও অধিক (২৬টি) শীর্ষ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রচুর বই নিয়ে অংশগ্রহণ করে। মেলার প্রথম দুই দিন প্রবল ঝড়বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া থাকা সত্ত্বেও আমেরিকার বাইরে এবং দূর-দূরান্ত থেকে কয়েক হাজার মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে মেলায় অংশ নেন। তাঁরা ক্ষণিকের জন্যও অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ না করে পুরো আয়োজন উপভোগ করেছেন এবং আনন্দের সাথে রেকর্ড পরিমাণ বই কিনেছেন। এটি ছিল প্রকৃত অর্থেই একটি 'বিশ্ব বাঙালির মেলা।’

তিনটি স্তম্ভ: বইমেলার দর্শন

তিন দশকেরও বেশি সময় (৩৫ বছর) ধরে এই বইমেলার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে আমি এটিকে কেবল একটি আয়োজন হিসেবে দেখি না; বরং এটি তিনটি মৌলিক স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি সুসংহত সাংস্কৃতিক দর্শন হিসেবে প্রতিভাত হয়। প্রথমত, ভাষা ও একুশের চেতনা- এই বইমেলার প্রাণশক্তি এখানেই নিহিত। প্রবাসে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষা কোনো স্বতঃসিদ্ধ বিষয় নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক সংগ্রামের ফল। এই মেলা সেই সংগ্রামকে দৃশ্যমান করে তোলে, যেখানে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এখানে বাংলা ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয়ত, এটি একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য-বাজার হিসেবে কাজ করে।

বইমেলা লেখক, প্রকাশক এবং পাঠকের মধ্যে একটি সক্রিয় সংযোগস্থল তৈরি করে, যেখানে সৃষ্টিশীলতা ও বাণিজ্য একে অপরকে পরিপূরক করে। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত থেকে আগত অংশগ্রহণকারীরা এখানে মিলিত হন- ফলে বাংলা সাহিত্য একটি বৈশ্বিক পরিসরে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ পায়। নতুন বইয়ের প্রকাশ, লেখক-পাঠক সংলাপ এবং প্রকাশনা বিনিময়ের মাধ্যমে এটি একটি গতিশীল সাহিত্যিক অর্থনীতি গড়ে তোলে। তৃতীয়ত, এই মেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পাবলিক স্পেস। এখানে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য এবং সমকালীন পরিচয়ের প্রশ্নগুলো একত্রে আলোচিত হয়। এটি এমন এক উন্মুক্ত পরিসর, যেখানে মতের বিনিময়, স্মৃতির পুনর্নির্মাণ এবং সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। ফলে বইমেলা একটি সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে রূপ নেয়, যা প্রবাসী সমাজকে আত্মপরিচয়ের দিক থেকে আরও সুসংহত করে।

এই তিনটি স্তম্ভের ভেতর দিয়েই আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি গড়ে উঠেছে। আমার কাছে এই মেলা মানে একটি ভাষার টিকে থাকার লড়াই, একটি সংস্কৃতির পুনর্গঠন, এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে স্মৃতি ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিক হস্তান্তর। আমি নিজের চোখে দেখেছি- যারা একসময় শিশু বা কিশোর হিসেবে এই মেলায় অংশ নিয়েছিল, তারাই আজ লেখক, গবেষক বা সংগঠক হিসেবে ফিরে আসছে। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, আমাদের এই প্রচেষ্টা কেবল সাময়িক সাফল্যের নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক বিনির্মাণের অংশ। আর এই রূপান্তরই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

নতুন দিগন্ত: ৩৬তম মেলাকে ঘিরে আমাদের বিশ্ব-প্রস্তুতি

৩৫তম আসরের বর্ণাঢ্য সমাপ্তির সমাপনী মঞ্চ থেকে ইতিমধ্যেই আগামী বছরের মেলার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে. ২০২৭ সালের ৩৬তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে ২১ মে থেকে ২৪ মে পর্যন্ত। তিন যুগ পার করে এখন আমাদের প্রস্তুতি ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক।

৩৬তম মেলাকে ঘিরে আমরা এক নতুন ও বৈপ্লবিক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছি

বাংলা ও ইংরেজি ভাষার বাঙালি লেখকদের বিশ্ব-সমাবেশ: ৩৬তম মেলার মূল আকর্ষণ হবে- এখানে শুধু বাংলা ভাষার লেখক নন, বরং সারা পৃথিবীর বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লেখালেখি করা বাঙালি লেখকদের এক অভূতপূর্ব সমাবেশ ঘটবে। অনুবাদ ও বৈশ্বিক সাহিত্যের মেলবন্ধন: প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম এবং বিশ্বপাঠকের কাছে বাংলা সংস্কৃতির সুবাস পৌঁছে দিতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা যেসকল বাঙালি লেখক ইংরেজি সাহিত্যে অবদান রাখছেন, তাঁদেরকে এই মেলায় বিশেষ সম্মাননা ও একক গুরুত্ব দেওয়া হবে। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষার মেলবন্ধনে এটি হবে বিশ্বমঞ্চে বাংলা সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক পাবলিক স্পেস।

গত ৩৫ বছর এখানে কেবল একটি সময়ের পরিমাপন নয়; এটি একটি ধারাবাহিক বিবর্তনের ইতিহাস- সংগ্রাম, স্বপ্ন, অভিযোজন এবং সৃজনশীলতার এক দীর্ঘ যাত্রা. ১৯৯২ সালের যে ছোট, সীমিত উদ্যোগটি শুরু হয়েছিল, সেটিই আজ তিন যুগেরও বেশি সময়ের প্রস্তুতি ও নিষ্ঠায় পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাংলা সংস্কৃতির এক সুপ্রতিষ্ঠিত গৌরবময় মঞ্চে। ৩৫তম বইমেলা অতীতের সকল অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে আরও সুসংহত ও বিস্তৃত করে দিয়ে শেষ হয়েছে. "যত বই তত প্রাণ"- এই চিরন্তন সত্যকে বুকে ধারণ করে ৩৬তম আসরের নতুন বিশ্ব-প্রস্তুতি নিয়ে আমাদের এই মিলনমেলা নতুন দিগন্তে বিকশিত হতে থাকবে, প্রবাসের বুকে চিরকাল সগৌরবে জাগিয়ে রাখবে এক টুকরো অপরূপ বাংলাদেশ।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও, মুক্তধারা ফাউন্ডেশন, নিউ ইয়র্ক 

    শেয়ার করুন:
    Advertisement
    দূষণের শুরু আমাদের ঘর থেকেই

    দূষণের শুরু আমাদের ঘর থেকেই

    ০৫ জুন ২০২৬, ০১:১৭

    ঢাকায় হাকান ফিদান, সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের প্রত্যাশা

    ঢাকায় হাকান ফিদান, সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের প্রত্যাশা

    ০৫ জুন ২০২৬, ০০:১৮

    সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ছাড়

    সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ছাড়

    ০৫ জুন ২০২৬, ০০:২০

    জলবায়ু মোকাবিলায় অগ্রাধিকার পাবে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রশিক্ষণ

    জলবায়ু মোকাবিলায় অগ্রাধিকার পাবে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রশিক্ষণ

    ০৫ জুন ২০২৬, ০১:১৬

    জামালের ‘সেলুন লাইব্রেরি’

    জামালের ‘সেলুন লাইব্রেরি’

    ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:৪৩

    অর্থ উঠানোর পর ব্যবসায় ধস

    অর্থ উঠানোর পর ব্যবসায় ধস

    ০৫ জুন ২০২৬, ০০:৩৯

    ইউট্যাব থেকে পদত্যাগ করেছেন ঢাবি ভিসি, নেপথ্যে কী

    ইউট্যাব থেকে পদত্যাগ করেছেন ঢাবি ভিসি, নেপথ্যে কী

    ০৫ জুন ২০২৬, ১১:০৭

    বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ঢাকায় এনসিপির বিক্ষোভ

    বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ঢাকায় এনসিপির বিক্ষোভ

    ০৫ জুন ২০২৬, ০০:৩৮

    ফিরছে জীববৈচিত্র্য, দ্বীপবাসী জীবিকার সংকটে

    ফিরছে জীববৈচিত্র্য, দ্বীপবাসী জীবিকার সংকটে

    ০৫ জুন ২০২৬, ০০:৫৯

    যাত্রীরা আগে নেমে যাওয়ায় এড়ানো গেছে প্রাণহানি

    যাত্রীরা আগে নেমে যাওয়ায় এড়ানো গেছে প্রাণহানি

    ০৫ জুন ২০২৬, ১২:১৬

    বিদেশি বিনিয়োগ প্রণোদনা নীতিমালা অনুমোদন

    বিদেশি বিনিয়োগ প্রণোদনা নীতিমালা অনুমোদন

    ০৫ জুন ২০২৬, ০১:০৬

    কৃষকের হাটে কৃষক নেই

    কৃষকের হাটে কৃষক নেই

    ০৫ জুন ২০২৬, ০০:৩৩

    সাগরের শহরে নেই সুপেয় পানি

    সাগরের শহরে নেই সুপেয় পানি

    ০৫ জুন ২০২৬, ০৬:০৭

    দূষণের দেশে ২২৮ পরিবেশ মামলা

    দূষণের দেশে ২২৮ পরিবেশ মামলা

    ০৫ জুন ২০২৬, ০০:৫৫

    বন্ধ কারখানা চালুর বহুমুখী উদ্যোগ

    বন্ধ কারখানা চালুর বহুমুখী উদ্যোগ

    ০৫ জুন ২০২৬, ০০:১৫

    advertiseadvertise