‘টাকা দিলেই ফিট, না দিলেই আনফিট’ কুয়েতগামীদের রক্ত চুষছে মেডিকেল সিন্ডকেট

প্রতীকী ছবি
চোখে রঙিন স্বপ্ন আর সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার বুকভরা আশা নিয়ে লাখো তরুণ পা বাড়ান প্রবাসের পথে। ধারদেনা করে কিংবা জমানো শেষ সম্বলটুকু বাজি রেখে কুয়েতের ভিসা হাতে পাওয়ার পর শুরু হয় এক অনিশ্চিত লড়াই। কুয়েতের নিয়মানুযায়ী ভিসা পাওয়ার পর অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে ভিসা প্রসেসিং ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। এই স্বল্প সময়কে পুঁজি করে দেশের সরকার নির্ধারিত কিছু মেডিকেল সেন্টার গড়ে তুলেছে এক মূর্তিমান ত্রাস ও সিন্ডিকেট। প্রবাসীদের এই তাড়াহুড়াকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা আর না দিলে উপহার দেওয়া হচ্ছে মনগড়া রিপোর্ট।
স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে এই সেন্টারগুলোতে চলছে অভিনব প্রতারণা ও হয়রানি। সামান্য অজুহাতে রক্তে জন্ডিস কিংবা বুকে দাগের মতো মনগড়া রিপোর্ট ধরিয়ে দিয়ে সুস্থ মানুষকেও আনফিট ঘোষণা করা হচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, যখনই এই অসহায় প্রবাসীরা নির্ধারিত ফি-এর অতিরিক্ত টাকা বা ঘুষ দিতে বাধ্য হন, তখনই জাদুকরী উপায়ে তাদের রিপোর্ট ফিট হয়ে যায়। এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সাধারণ কর্মীরা।
প্রথম টেস্টে ফলাফল আনফিট আসার পর নিয়ম অনুযায়ী আরও দুবার টেস্ট করানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গামকা অফিসগুলোও এক ধরনের সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে। ভালো মানুষের রিপোর্ট টাকার লোভে আনফিট করে গামকা অফিসের লোকজন তাদের মনমতো মেডিসিন বা ওষুধ সেবন করিয়ে সাত দিন পর আবার আসতে বলে। অথচ বিদেশগামী ওই ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ থাকেন। মাঝপথে সুস্থ মানুষকে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ খাইয়ে তার শারীরিক অবস্থাও খারাপ করে দেওয়া হয়।
এভাবে দুবার যাওয়ার পর প্রবাসীদের বলা হয়, আপনার আর কোনো সুযোগ নেই, তবে টাকা দিতে পারলে ব্যবস্থা করে দেব। এরপর মোটা অঙ্কেকের টাকার বিনিময়ে রিপোর্ট সঠিক করে দেওয়া হয়।
বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। দেশে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ভুয়া রিপোর্ট আনফিট থেকে ফিট করিয়ে কুয়েতে আসার পর অধিকাংশ প্রবাসী পুনরায় মেডিকেল পরীক্ষার মুখোমুখি হন। বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, কুয়েতে আসার পর সেই প্রবাসীরা পুনরায় মেডিকেল পরীক্ষায় কোনো প্রকার ঝামেলা ছাড়াই সম্পূর্ণ সুস্থ বা ফিট হিসেবে উত্তীর্ণ হন। এতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, দেশের কিছু অসাধু মেডিকেল ও গামকা সিন্ডিকেটের কারসাজিতেই সুস্থ প্রবাসীদের অনর্থক হয়রানির শিকার হতে হচ্ছেন।
ভুক্তভোগী প্রবাসী রাজু আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি নিয়মিত রক্তদাতা। কয়েক মাস অন্তর তিনি রক্ত দান করেন। সব ঠিকঠাক থাকার পরও মেডিকেলে আমাকে জন্ডিস ও বুকে দাগ আছে বলে আনফিট করা হয়েছিল। বারবার ঘোরাঘুরি করার পর টাকা চেয়েছিল। হাতে সময় খুবই অল্প ছিল কোনো উপায় না পেয়ে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার পর মুহূর্তেই তারা আমাকে ফিট সার্টিফিকেট দিল। এটা প্রকাশ্য প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়।
আরেক ভুক্তভোগী আব্দুল কাদির জানান, ভিসার মেয়াদ খুব কম থাকে, এই সুযোগটাই তারা নেয়। রক্তে সামান্য সমস্যা দেখিয়ে জন্ডিসের মিথ্যা রিপোর্ট দেয়। বাধ্য হয়ে ধার করে টাকা দিয়ে পাস করতে হয়েছে। আমরা গরিব মানুষ, এভাবে পদে পদে শোষিত হলে যাব কোথায়?
সিলেট থেকে আসা আরেক প্রবাসী বুরহান উদ্দিন বলেন, সরকার নির্ধারিত মেডিকেল সেন্টারগুলোর এমন স্বেচ্ছাচারিতা দেখে বিশ্বাসই হয় না। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এই সিন্ডিকেটের কারণে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।
এই অসহনীয় পরিস্থিতি ও প্রতারণা থেকে দ্রুত পরিত্রাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী কুয়েত প্রবাসীরা। অবিলম্বে মেডিকেল সেন্টার ও গামকা অফিসগুলোর কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি, সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ করার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় প্রবাসীদের এই স্বপ্নভঙ্গ ও হয়রানি রোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।



