থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং
পুরোটা পেতে মরিয়া বিমান মন্ত্রণালয়ে ৯ যুক্তি
- গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সর্বোচ্চ ৫০% করবে বিমান; বাকিটুকু জাপানি প্রতিষ্ঠান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের পুরো দায়িত্ব চায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। তবে সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, টার্মিনালটির আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ করবে বিমান, বাকি অংশের দায়িত্ব দেওয়া হবে জাপানি একটি প্রতিষ্ঠানকে। এই সীমা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে গত ৫ আগস্ট বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে ৯টি যুক্তি তুলে ধরেছে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি।
বিমানের দাবি, কার্যক্রম শুরুর আগেই সক্ষমতা ৫০ শতাংশে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকবে না; বরং নতুন টার্মিনালে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পুরো গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিচালনার সুযোগ দিয়ে সক্ষমতা যাচাই করা উচিত। এরপর প্রয়োজন হলে দ্বিতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
থার্ড টার্মিনাল নির্মিত হয়েছে জাপানি সহায়তায়। কম সুদে ঋণ দিয়ে এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে জাপান এগিয়ে এসেছে। শুরু থেকেই জাপান চেয়েছে তাদের দেশের একটি প্রতিষ্ঠান যেন গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাটা দিতে পারে। তা ছাড়া শাহজালালের বাকি দুই টাির্মনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দিয়ে থাকে বিমান। এই সেবা নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ অবতরণের পর আবার উড্ডয়ন করা পর্যন্ত মাটিতে যে কাজগুলো করতে হয়, তার বড় অংশই গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং।
বিমানের দেওয়া চিঠির তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ জুলাই মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ত্রিপক্ষীয় সভায় টার্মিনাল-৩-এর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় বিমান জানতে পারে, তাদের পাশাপাশি একটি বিদেশি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করতে পারলেও বিমানের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ সীমা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিমান বলছে, এতে দক্ষতা, কর্মক্ষমতা ও সেবার মানের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে প্রশাসনিকভাবে সক্ষমতার সীমা নির্ধারিত হবে। অথচ টার্মিনাল-৩-এ এখনো বিমান বা প্রস্তাবিত বিদেশি প্রতিষ্ঠান কেউ-ই কার্যক্রম পরিচালনা করে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ পায়নি। টার্মিনাল-১ ও ২-এর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে যে সমস্যাগুলো রয়েছে, টার্মিনাল-৩-এর আধুনিক অবকাঠামোয় সেগুলো একইভাবে প্রযোজ্য হবে না বলেও যুক্তি দিয়েছে বিমান।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, টার্মিনাল-৩-এর জন্য এরই মধ্যে জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইক্যুইপমেন্ট (জিএসই) সংগ্রহে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে বিমান। কার্যক্রম ৫০ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকলে এসব বিনিয়োগের পূর্ণ ব্যবহার হবে না। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বিমানের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিমানের হিসাবে, বর্তমানে টার্মিনাল-১ ও ২-এর ১০০ শতাংশ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিচালনা করে এ খাত থেকে সংস্থাটির মোট আয়ের প্রায় ১৩ শতাংশ আসে। ৫০ শতাংশে সীমাবদ্ধ করা হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতের গড় মুনাফা ১ হাজার ১৭৫ কোটি থেকে কমে ৮৪৩ কোটি টাকায় নামতে পারে। অর্থাৎ কমতে পারে ৩৩২ কোটি টাকা। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে মুনাফা ৩৪৭ কোটি টাকায় নেমে যাওয়ার আশঙ্কা করছে বিমান। এতে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ৮২৮ কোটি টাকা। বিমানের আশঙ্কা, আয় কমে গেলে উড়োজাহাজের ঋণ পরিশোধ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, নতুন জনবল এবং গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইক্যুইপমেন্টের ব্যয় বহন করা কঠিন হবে। তখন রাষ্ট্রীয় সংস্থাটিকে সরকারের ওপর নির্ভরশীল হতে হতে পারে। ৫৪ বছরের ইতিহাসে নিজস্ব আয় দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসা বিমানকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে না দেওয়ারও যুক্তি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
নিজেদের সক্ষমতার উদাহরণ হিসেবে টার্মিনাল-১ ও ২-এর সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেছে বিমান। মাত্র আটটি বোর্ডিং ব্রিজ, সংকীর্ণ ব্যাগেজ বেল্ট এলাকা এবং আউট বে থেকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের মতো সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল পরিস্থিতির মধ্যেও তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত প্রশিক্ষণকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত জনবল এবং আধুনিক গ্রাউন্ড সার্ভিস ইক্যুইপমেন্ট থাকার কথাও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, টার্মিনাল-৩ পরিচালনার জন্য জাপানি সাব-ওয়ার্কিং গ্রুপের (এসডব্লিউজি) কাছে দরপত্রের নথি, প্রস্তাব আহ্বানপত্র ও খসড়া কনসেশন চুক্তি দেওয়া হয়েছে। ওই খসড়া চুক্তিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করবে বলে উল্লেখ রয়েছে। এই সীমা পরিবর্তন করতে হলে জাপানি এসডব্লিউজির সঙ্গে নতুন করে আলোচনা এবং কনসেশন চুক্তিতে পরিবর্তন আনতে হবে। এতে চুক্তি সম্পন্নের সময়সূচি পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেছেন, টার্মিনাল-৩-এ ১০০ শতাংশ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিচালনার সক্ষমতা বিমানের আছে কি না, তা বাস্তব কার্যক্রম ও দক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত। সক্ষমতা থাকলে শুধু নির্ধারিত সীমার কারণে জাতীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠানকে পিছিয়ে রাখা সমীচীন হবে না।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বিমান গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য পুরোপুরি সক্ষম। তবে যেহেতু বিষয়টি নিয়ে এখনো নেগোসিয়েশন চলছে এবং জাপানও আমাদের সঙ্গে জয়েন্টলি আছে, তাই ৫০-৫০ শতাংশের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জাপানের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিমান আরও সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।’
তবে বিমান বলছে জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের সুরক্ষা, সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা এবং সমতাভিত্তিক প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে টার্মিনাল-৩-এর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে তাদের জন্য প্রস্তাবিত ৫০ শতাংশ সীমা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।






