জলবায়ু মোকাবিলার টাকায় উল্টো পরিবেশ ধ্বংসের প্রকল্প হচ্ছে: আনু মুহাম্মদ

সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘অপরিকল্পিত উন্নয়নে বিপন্ন কক্সবাজার: পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন আনু মুহাম্মদ। ছবি: আগামীর সময়
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে বাংলাদেশ অর্থ সহায়তা চাইলেও সেই অর্থ দিয়ে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যা উল্টো জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তার অভিযোগ, কিছু মানুষের অর্থ উপার্জনের প্রকল্পের কারণে দেশের মানুষের ওপর আর্থিক ও পরিবেশগত বোঝা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও বাড়ছে।
সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘অপরিকল্পিত উন্নয়নে বিপন্ন কক্সবাজার: পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন আনু মুহাম্মদ।
তিনি বললেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা অর্থ সহায়তা চেয়ে থাকেন। কিন্তু সেই অর্থ পাওয়ার পর এমন কিছু প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি আরও বাড়াতে পারে।
আনু মুহাম্মদের মতে, কিছু মানুষের অর্থ উপার্জনের প্রকল্প করতে গিয়ে দেশের মানুষের জন্য আর্থিক বোঝা তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ পরিবেশগত বোঝা। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিও বাড়ছে।
মহেশখালীর পাহাড়ের মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি উল্লেখ করেন, পাহাড় কেটে বা পাহাড়ের মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার কোনো উপায় নয়; বরং এতে সেই ঝুঁকি আরও বাড়বে।
চকরিয়ার সুন্দরবন ধ্বংসের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, উপকূলীয় এলাকার জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করা চকরিয়া সুন্দরবনের এখন আর অস্তিত্ব নেই। চিংড়ির ঘেরসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে গত দুই দশকে ধীরে ধীরে এ বন ধ্বংস হয়েছে।
আনু মুহাম্মদ অভিযোগ করেন, একই ধরনের ঘটনা এখন সোনাদিয়াতেও ঘটছে। সোনাদিয়ার বনাঞ্চলের মধ্যেও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি মহেশখালীর পাহাড়ের মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ আইন বাস্তবায়নে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার অভিযোগ, পরিবেশ আইন মানার ক্ষেত্রে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আগ্রহ বা উদ্যোগ তেমন দেখা যাচ্ছে না।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কক্সবাজার সফরের প্রসঙ্গ তুলে আনু মুহাম্মদ বললেন, পরিবেশ আইন বেশি মানলে উন্নয়ন করা যাবে না- এমন বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বিরক্তি প্রকাশ করেছেন বলে তিনি মনে করেন।
তিনি মত দেন, টেকসই নয় এমন কোনো উন্নয়নকে প্রকৃত উন্নয়ন বলা যায় না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে না- এমন প্রকল্প কিছু মানুষের অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু সেটিকে উন্নয়ন বলা যায় না।
কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিয়েও সমালোচনা করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, পর্যটন নগরী হিসেবে কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক মানুষ গেলেও সেখানে ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত অগোছালো ও অপরিকল্পিত। পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া) হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় বিদ্যমান আইন অমান্য করে নির্মাণকাজ চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ঋণদাতা ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা-জাইকার অর্থায়নে পরিবেশবিধ্বংসী প্রকল্প কেন হচ্ছে, তার জবাবদিহি প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন আনু মুহাম্মদ। একই সঙ্গে অতীতে জাইকা, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো পর্যালোচনার দাবি জানান তিনি।
তিনি বললেন, ঋণের অর্থের দায় শেষ পর্যন্ত দেশের মানুষকেই বহন করতে হয়। তাই ঋণ করে এমন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে দেশের পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তানুকদার, সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির, সহসভাপতি জাকির হোসেন এবং কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহসহ সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।



