মুঠোবন্দি পৃথিবীতে মানুষ হচ্ছে একা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাত প্রায় ১১টা। ডাইনিং টেবিল গুছিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়েছেন মা। বাবা বিছানায় আধশোয়া, হাতের মুঠোফোনের স্ক্রিনে চোখ। ছেলেটি কানে হেডফোন লাগিয়ে গেম খেলছে। মেয়েটিও তার ফোনে স্ক্রল করছে একের পর এক ভিডিও। চারজন মানুষ, একই ছাদের নিচে থাকছেন— তবু যেন তাদের দূরত্ব অনেক। যেন প্রত্যেকেরই আলাদা পৃথিবী!
পৃথিবীটা ছোট হতে হতে এখন হাতের মুঠোয় বন্দি। মুঠোফোনে মুহূর্তেই ঘুরে আসা যায় দুনিয়ার দশ দিক। হাজার মাইলের দূরত্ব ঘুচে জ্বলজ্বলে স্ক্রিনে। অথচ এই জ্বলজ্বলে স্ক্রিনই দূরত্ব বাড়াচ্ছে মানুষে মানুষে। ঠিক চার সদস্যের ওই পরিবারটির মতো। যেখানে রাতের খাবারের টেবিলে আগের মতো থাকে না দিনের গল্প, হাসি আর ক্লান্তি ভাগ করে নেওয়ার সময়। ফলে ঢিলে হয়ে পড়ছে পারিবারিক বন্ধন। একা হয়ে যাচ্ছে মানুষ।
অথচ এই দূরে যাওয়াটা অনেকে বুঝে উঠতে পারেননি। যেমনটা বলছিলেন, রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা নুসরাত জাহান।
চাকরিজীবী এ নারী জানালেন, আগে অফিস থেকে বাসায় ফেরার পর কিছুক্ষণ গল্প হতো বাসার সবার সঙ্গে। কিন্তু এখন আর নেই সে অভ্যাস। বাসার সব সদস্যই যে যার ফোন নিয়ে ব্যস্ত। নুসরাত জাহানের আক্ষেপ, কখন যে তার পরিবারের সদস্যদের ভেতরে এত দূরত্ব তৈরি হয়েছে, কখন যে তিনি একা হয়ে গেলেন বুঝতেই পারেননি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন নুসরাত জাহানের মতো ভুগছেন একাকিত্বে। তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এই প্রবণতা। যা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে জনস্বাস্থ্য সমস্যায়। কারণ একাকিত্বের সঙ্গে সম্পর্কও পাওয়া যাচ্ছে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, হৃদরোগ— এমনকি অকাল মৃত্যুর।
সংস্থাটির কমিশন অন সোশ্যাল কানেকশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্বের কারণে প্রতিবছর মৃত্যু হচ্ছে প্রায় ৮ লাখ ৭১ হাজার মানুষের; অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০০ জন।
অথচ পারিবারিক বন্ধন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এসব মৃত্যু কমিয়ে আনতে পারে বলে মনে করেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। সম্পর্কে বিশ্বস্ততা, বোঝাপড়া ও সংযোগ তৈরি হওয়ার জন্য সময়ের কোনো বিকল্প নেই বলেও মত তাদের।
তারা বলছেন, মানুষ একই একই ঘরে থাকলেও ঠিকই কিন্তু তাদের বসবাস ভিন্ন ভিন্ন জগতে। মানসিকভাবে কেউই তারা পরস্পরের কাছাকাছি নেই। এ জন্য মোটাদাগে তারা দায় দিচ্ছে প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাসের ওপর।
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বলছেন, প্রযুক্তি শুধু মানুষের সময়ই কেড়ে নিচ্ছে না, ধীরে ধীরে নিবিড় সম্পর্কের ভেতরও তৈরি করছে দূরত্ব।
অবশ্য প্রযুক্তির চাইতে মানুষের অভ্যাসকে বেশি দায় দিলেন তিনি। বললেন, একই খাবার টেবিলে বসেও আমরা অনেক সময় ডুবে থাকি মোবাইলে। যে সময়টুকু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা দরকার সে সময়টাতে ডুবে থাকছি ভার্চুয়াল জগতে। ফলে পরিবারের সদস্যরা যতটুকু সময় ও মনোযোগ পাওয়ার কথা তা হয়ে আসছে সংকুচিত। ছোট হয়ে আসছে সমাজ। বড় হয়ে উঠছে শূন্যতা ও বিচ্ছিন্নতা বোধ।
দূরন্ত শৈশবও আটকা পড়ছে এই শূন্যতার ফাঁদে। অনিয়ন্ত্রিত ডিভাইস ব্যবহার তীব্র ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে শিশু-কিশোরদের মধ্যেও। এর বড় দায় অবশ্য অভিভাবকেরই।
ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের স্ক্রিন টাইম ও অভিভাবকের তদারকি নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৫৬ শতাংশই অভিভাবকের তদারকি ছাড়া ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৪২০ শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত হয় গবেষণাটি। দেখা যায়, যেসব শিশু দীর্ঘসময় স্ক্রিন ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে মাথাব্যথা ও ঘুমের সমস্যার প্রবণতা বেশি। পাশাপাশি আচরণগত সমস্যাও লক্ষ্য করা গেছে অনেকের মধ্যে।
গবেষণাটির তথ্যমতে, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের গড় স্ক্রিন টাইম দৈনিক প্রায় ৫ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। আর বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট।
মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুদের স্ক্রিন টাইম কমালেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন পরিবারের ভেতরে সময়, মনোযোগ আর কথোপকথন ফিরিয়ে আনা। কারণ অনেক শিশু এখন একই ঘরে থেকেও বাস্তবের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি অভ্যস্ত। বিশেষ করে শহরে এই প্রবণতা অনেক বেশি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব কায়সারের মতে, শহুরে জীবনে এখন ‘ম্যাস লোনলিনেস’ বা গণ-একাকিত্বের প্রবণতা বাড়ছে। পরিবারে থেকেও মানুষ মানসিকভাবে একা হয়ে যাচ্ছে।
তার অভিযোগ, শুধু যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়াই নয়, সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনও বাড়াচ্ছে দূরত্ব। আগে শিশুর বিকল্প ছিল মাঠ, বন্ধু বা টেলিভিশন। এখন সেই জায়গা মোবাইল ও সোশ্যাল মিডিয়ার দখলে।
মা-বাবা ঘরে থাকলেও অনেক সময় সন্তানের সঙ্গে বাস্তব যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে না দাবি মাহবুব কায়সারের। ফলে পরিবারে থেকেও একাকিত্ব অনুভব করছে শিশুরা।
এই পরিবর্তনের বড় প্রভাব নতুন প্রজন্মের ওপর পড়লেও তার আঁচ সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন বয়স্করা। গাজীপুরের ৫৮ বছর বয়সী আব্দুল কাদের অতীতের স্মৃতিচারণা করে বলছিলেন, আগে বিকাল হলেই পাড়ার মানুষ উঠানে বসে গল্প করতেন। চায়ের দোকানে আড্ডা হতো। এখন সবাই ফোন নিয়ে ব্যস্ত। পাশের বাসার মানুষও একে অপরের খোঁজ রাখেন না। আর আক্ষেপ, এখন নিজের বাসার লোকজনই সব আলাদা। নাতির সঙ্গে কথা বলতে গেলেও দেখেন সে ব্যস্ত মোবাইল নিয়ে!
অথচ একসময় সন্ধ্যা নামলে উঠানে পাটি বিছিয়ে বসত কিসসার আসর। দাদা-দাদি, নানা-নানিকে ঘিরে বসত নাতিপুতিরা। প্রতিবেশীরাও এসে যোগ দিত তাতে। ফাঁকে ফাঁকে হতো প্রতিদিনের সুখ-দুঃখের আলাপ। তাদের সেই আলাপনেই বুনন হতো মানবিক সম্পর্কের।






