উপদেষ্টার নাম ভাঙিয়ে মিল্ক ভিটা দখল!
- ছাত্রলীগ নেতা থেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’
- নিয়োগ-বদলি-পদোন্নতি ও টেন্ডার বাণিজ্য
- তদন্তের পর হারালেন সহসভাপতির পদ

সংগৃহীত ছবি
পরিচয় বদলেছেন। বদলেছেন রাজনৈতিক খোলস। কিন্তু বদলায়নি প্রভাব বিস্তারের কৌশল। ছাত্রলীগ নেতা থেকে বনে যান ‘জুলাই যোদ্ধা’। এরপর বিএনপি পরিবারের সদস্য। এভাবেই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটায় (বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড) প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আনোয়ার হোসাইনের বিরুদ্ধে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবশালী এক উপদেষ্টার নাম ব্যবহার করে নিতেন প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি থেকে টেন্ডার— সবখানেই ছিল তার দাপট। এমন একাধিক অভিযোগের পর শুরু হয় অভ্যন্তরীণ তদন্ত। বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। সবশেষ অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর মিল্ক ইউনিয়নের সহসভাপতির পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয় সরকার।
জানা গেছে, গত ৬ আগস্ট সমবায় অধিদপ্তরের এক আদেশে জানানো হয় অব্যাহতির এ সিদ্ধান্ত। এর আগে ২৯ জুলাই মিল্ক ইউনিয়নের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় আনোয়ার হোসাইনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে হয় আলোচনা। অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা লিখিতভাবে তার ওপর জানান অনাস্থা।
৮৩ লাখ টাকার চিনি কেলেঙ্কারি: চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি মিল্ক ভিটার ৩৫০ টন চিনির টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ উঠে আনোয়ারের বিরুদ্ধে। সর্বনিম্ন দরদাতা মেসার্স পূর্ণতা ইন্টারন্যাশনাল দর দিয়েছিল প্রতি কেজি ৯৯ টাকা। কিন্তু উদ্যোগ নেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটিকে বাদ দেওয়ার। কাজ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয় চতুর্থ সর্বোচ্চ দরদাতা ফার্স্ট এন্টারপ্রাইজকে। এ প্রতিষ্ঠানের দর ছিল প্রতি কেজি ১২২ টাকা ৮০ পয়সা। এতে মিল্ক ভিটার ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৮৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এরই মধ্যে ওই প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
চাকরি-বদলিতে অর্থের খেলা: আনোয়ারের বিরুদ্ধে শুধু টেন্ডার নয়, রয়েছে নিয়োগ-বদলি ও পদোন্নতির নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও। অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ভাঙিয়ে চাকরি ও বদলি করিয়ে দেওয়ার কথা বলতেন তিনি। বিনিময়ে নিতেন মোটাঅঙ্কের টাকা। জামালপুরের মাদারগঞ্জের সরদারপাড়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি সাধন গোপের অভিযোগও একই ধরনের। গত ২০ জুলাই মিল্ক ভিটা চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া অভিযোগে তিনি বলেছেন, ‘মিল্ক ইউনিয়নের সদস্যপদ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ৫ লাখ টাকা নেন আনোয়ার। সদস্য করতে না পারায় পরে ফেরত দেন ২ লাখ টাকা। এখনো ফেরত দেননি বাকি ৩ লাখ টাকা। অর্থ লেনদেনের প্রমাণও আগামীর সময়ের হাতে রয়েছে।’
ভুয়া সমবায়ী পরিচয়: আনোয়ারের সমবায়ী পরিচয় নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে, তিনি প্রকৃত দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায়ী ছিলেন না। পদ পাওয়ার জন্য ব্যবহার করেন ভুয়া কাগজপত্র। প্রথমে ময়মনসিংহের ফুলপুরের একটি সমিতির সদস্য পরিচয় দেন। পরে একইভাবে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর আরেকটি সমিতির সদস্য হওয়ার কাগজ ব্যবহার করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ছাত্রলীগ থেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’: রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আনোয়ারের চমকবাজি কম নয়। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সহসভাপতি ছিলেন— এমন প্রমাণ থাকার কথা জানালেন মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যান এস এম আমীর হামজা শাতিল। তিনি বললেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আনোয়ার বদলে ফেলেন পরিচয়। নিজেকে দাবি করেন জুলাই যোদ্ধা ও সমন্বয়ক। এরপর বিএনপি পরিবারের সদস্য পরিচয়ে গত ২৩ এপ্রিল বাগিয়ে নেন মিল্ক ইউনিয়নের সহসভাপতির পদ।’
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ কয়েকজনের নাম ভাঙিয়ে মিল্ক ভিটায় প্রভাব বিস্তার করতেন আনোয়ার। বিষয়টি সমবায় অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেন মিল্ক ইউনিয়নের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটির সাত সদস্য। তারা আনোয়ারের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে দুদক, এনবিআর ও গোয়েন্দা সংস্থাকে তদন্তের সুপারিশ করেন।
মিল্ক ভিটার ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান এস এম আমীর হামজা শাতিল বললেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর আনোয়ারের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আসে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর তাকে অপসারণের জন্য নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। তার বিরুদ্ধে দুদক ও গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’ তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করলেন আনোয়ার হোসাইন। তার দাবি, তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। বললেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা ছিল না। আমার পরিবারের সদস্যরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মিল্ক ভিটার দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় আমি অনেকের চক্ষুশূল হয়েছি।’
আনোয়ার হোসাইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে বক্তব্য জানতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল ও বার্তা পাঠানো হলেও মেলেনি তার কোনো সাড়া।



