জুলাই শহীদ দিবস আজ
দ্রুত রায় কার্যকর চান আবু সাঈদের মা-বাবা

সংগৃহীত ছবি
আজ ১৬ জুলাই। ২০২৪ সালের এই দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ। পার্ক মোড়ে দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে বুক পেতে দেওয়া সাঈদের সেই ভিডিও দেশ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি ২৮ আসামিকে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড। গত ৯ এপ্রিল এ রায় ঘোষণা করা হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়।
তাদের মধ্যে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত তিনজন হলেন সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান, তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ইসলাম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতিভূষণ রায়। বাকি ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার রায় হলেও তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যরা। আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেছেন, ‘দেখতে দেখতে দুটি বছর হয়ে গেল, ছেলেটা নেই। আজ ওর কথা খুব মনে পড়ছে। হত্যা মামলার রায় হয়েছে বটে, তবে আবু সাঈদ হত্যার নির্দেশদাতা বড় বড় পুলিশ কর্মকর্তাই বেঁচে গেছেন।’ এই মামলার সব আসামির ফাঁসি দাবি করেন তিনি।
আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেছেন, ‘ছেলে হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের রায় হয়েছে। এ রায় কার্যকর হলেই আমার আত্মা শান্তি পাবে।’ আসামিদের অনেকেই লঘুদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় রায় বিবেচনা করায় মত দেন আবু সাঈদের বড় ভাই আবু রায়হান। হত্যায় জড়িত সবার ফাঁসি দাবি করেন তিনি।
চব্বিশের ১৬ জুলাই দুপুরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিছিলে অংশ নেন আবু সাঈদ। কোটা আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন তিনি। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা বাধা দেন। শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ও কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে পুলিশ। বুক টান করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে পুলিশ। বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তৎক্ষণাৎ তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। পরদিন সকালে রংপুরের পীরগঞ্জে বাবনপুর গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়।
স্মৃতি সংরক্ষণ কাজে নেই অগ্রগতি: আবু সাঈদের স্মৃতি সংরক্ষণসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের জন্য হাজার কোটি টাকার প্রকল্প দুই বছরেও দেখেনি আলোর মুখ। ঘটনার বছরপূর্তিতে ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই স্থানে আবু সাঈদ তোরণ ও জাদুঘর এবং সংলগ্ন পার্কের মোড়ে স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কিন্তু কার্যক্রম রয়ে গেছে তিমিরেই। এ নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে সাঈদের সহপাঠীসহ শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
জাঁকজমকপূর্ণ সেই আয়োজনে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। এরপর কেটে গেছে আরও একটি বছর। কিন্তু ভিত্তিপ্রস্তরের ফলক ছাড়া প্রকল্পের আর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলী বলেছেন, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) এরই মধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন মিললেই মূল নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
আজকের যত আয়োজন: বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আবু সাঈদের কবর জিয়ারত, লালব্যাজ ধারণ ও শোক শোভাযাত্রা, আবু সাঈদ চত্বরে পুষ্পস্তবক অর্পণ, জুলাই শহীদ স্মরণে বিশেষ স্মরণসভা এবং দোয়া ও মিলাদ মাহফিল হবে।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আশরাফুল ইসলাম, ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন ও যুগান্তর সম্পাদক কবি আব্দুল হাই শিকদার।
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন রংপুরের পীরগঞ্জ প্রতিনিধি




