বিশ্বব্যাংকের গ্যারান্টি নাকি জ্বালানি ফাঁদ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির অর্থ পরিশোধে ৭০ কোটি ডলারের গ্যারান্টি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আপাতদৃষ্টিতে এটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য বড় স্বস্তির খবর। আন্তর্জাতিক ব্যাংক থেকে ঋণপত্র খোলা সহজ হবে, এলএনজি সরবরাহে অর্থের জোগানও বাড়বে। কিন্তু এ স্বস্তির আড়ালে জমছে নতুন উদ্বেগ। গ্যারান্টির শর্ত, ঋণের দায়, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির চাপ আর আমদানিনির্ভরতার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, সাময়িক সংকট সামাল দিতে গিয়ে বাংলাদেশ এমন এক আর্থিক ও জ্বালানি কাঠামোয় আটকে পড়ছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা হবে আরও কঠিন।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের এ গ্যারান্টি কোনো অনুদান নয়, এমনকি সরাসরি নগদ অর্থও নয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পেট্রোবাংলার পক্ষে এলএনজি সরবরাহকারীদের অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা দেবে। নির্ধারিত সময়ে পেট্রোবাংলা অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে সেই ব্যাংক সরবরাহকারীকে অর্থ পরিশোধ করবে। পরে পেট্রোবাংলাকে ওই অর্থ ব্যাংককে ফেরত দিতে হবে। আর সেই দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে কার্যকর হবে বিশ্বব্যাংকের গ্যারান্টি। তখন নির্ধারিত জরিমানাসহ অর্থ শোধের দায় পড়বে বাংলাদেশের ওপর।
অর্থাৎ, আজ যে গ্যারান্টি আমদানির পথ সহজ করছে, কাল সেটিই হয়ে উঠতে পারে বাড়তি আর্থিক দায়ের উৎস। যদিও এ কে এম মিজানুর রহমান বলছিলেন, ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরুর পর থেকে নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হননি তারা। ফলে এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এলএনজি সরবরাহকারীদের কাছে অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা হিসেবে স্ট্যান্ডবাই ঋণপত্র সংগ্রহ করতে দীর্ঘদিন ধরেই হিমশিম খাচ্ছিল পেট্রোবাংলা। বিশ্বব্যাংকের গ্যারান্টি সেই সংকট কাটাতে সহায়তা করছে। তবে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, অর্থের নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেও যে জ্বালানি সংকটের কারণে এ বিপুল আমদানি, তার স্থায়ী সমাধান কোথায়?
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরীর মতে, সংকটের সময়ে এ ধরনের আর্থিক নিশ্চয়তা সাময়িক স্বস্তি দিলেও এর সঙ্গে যুক্ত শর্তগুলো শেষ পর্যন্ত আমদানি ব্যয় বাড়াতে পারে। তার ভাষায়, ‘বিপদে পড়লে এমন মহাজন সবসময়ই ওত পেতে বসে থাকে। এখানে তাদের স্বার্থে বেশ কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে, যা পূরণ করতে গেলে এলএনজি আমদানি ব্যয় বাড়বে।’
বিশ্বব্যাংকের জ্বালানি খাতের নিরাপত্তা জোরদার প্রকল্পের আওতায় গত জানুয়ারিতে ৩৫ কোটি ডলারের গ্যারান্টি দেওয়া হয়। পরে আরও ৩৫ কোটি ডলার অনুমোদন করা হয়েছে, যা কার্যকর হবে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে। এ নিশ্চয়তার জন্য এককালীন সূচনা ফি ০.১৫ শতাংশ, যার সর্বনিম্ন পরিমাণ এক লাখ ডলার। এর বাইরে প্রক্রিয়াকরণ ফি সর্বোচ্চ ০.৫০ শতাংশ, শুরুতে ০.২৫ শতাংশ ফি, ব্যবহৃত নিশ্চয়তার ওপর বছরে ০.৩০ শতাংশ এবং চার বছর পর অব্যবহৃত অর্থের ওপর বছরে ০.২৫ শতাংশ স্ট্যান্ডবাই ফি দিতে হবে। রয়েছে আইনগত ও পরামর্শক ব্যয়ও।
গ্যারান্টির বিপরীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ব্যাংক পেট্রোবাংলাকে ২০ কোটি ডলারের স্ট্যান্ডবাই ঋণপত্র, স্পট কার্গো আমদানির জন্য ৯০ দিন মেয়াদি ৫ কোটি ডলারের ঋণপত্র এবং ১০ কোটি ডলারের স্বল্পমেয়াদি ঋণ দেবে। প্রথম দফার গ্যারান্টিতে বছরে ৩৭ থেকে ৪১টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১২২ থেকে ১৩৫ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের এলএনজি আমদানি সম্ভব হবে বলে হিসাব করা হয়েছে। আগামী বছরের দ্বিতীয় দফার গ্যারান্টি যুক্ত হলে এ সুবিধা দ্বিগুণ হবে।
এখানেই উদ্বেগের জায়গা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, আমদানির অর্থ জোগাড়ের ব্যবস্থা যত সহজ হচ্ছে, ততই বাড়ছে বিদেশি জ্বালানির ওপর নির্ভরতা। অথচ দেশের মাটির নিচে থাকা গ্যাসের সম্ভাবনা কাজে লাগানো, পুরনো কূপ সংস্কার কিংবা গ্যাস চুরি বন্ধের মতো উদ্যোগে তুলনামূলক কম বিনিয়োগেই বড় সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরীর দাবি, গ্যাস চুরি বন্ধ করা গেলে দৈনিক ২০০-২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। পুরনো গ্যাসকূপ খনন ও সংস্কার করে ছয় মাসের মধ্যে উৎপাদন ৩০০-৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এজন্য ধাপে ধাপে মাত্র ১২ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিলে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বড় সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরীর প্রশ্ন, ‘এতগুলো সহজ ও টেকসই বিকল্প থাকা সত্ত্বেও আমদানিতে এত ঝোঁক কেন?’ তার মতে, আমদানি করা এলএনজি দিয়ে কখনোই দেশের প্রকৃত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; বরং আমদানিনির্ভরতা বাড়লে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
অবশ্য বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, আমদানি করা এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা গেলে বছরে জ্বালানি ব্যয় ৮০-৯০ কোটি ডলার কমতে পারে। এজন্য গ্যাসের পেছনে খরচ হবে ১৪ থেকে ২০ কোটি ডলার। ফলে নিট সাশ্রয়ের সম্ভাবনা ৬৭ থেকে ৭২ কোটি ডলার। পুরনো ও ব্যয়বহুল তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত বন্ধ করা গেলে আরও প্রায় ৩২ কোটি ডলার এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি আমদানি করা গেলে বছরে প্রায় ৩২ কোটি ডলার সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।
তবে এ সাশ্রয়ের হিসাবের সঙ্গেই সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির নথিতে বলা হয়েছে, সঞ্চালন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, গ্যাসের লাইনে চাপ, মজুদ সক্ষমতার ঘাটতি এবং বিদ্যমান অসম বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির কারণে সম্ভাব্য সাশ্রয়ের পুরোটা অর্জন নাও হতে পারে। অর্থাৎ, যে আর্থিক সুবিধার কথা বলে আমদানির পথ সহজ করা হচ্ছে, বাস্তবে তা কতটা মিলবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এরই মধ্যে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনে কম দামে সরবরাহ করতে গিয়ে পেট্রোবাংলাকে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী, এ ভর্তুকি কমাতে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। এর প্রভাব পড়বে শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহনসহ অর্থনীতির প্রায় সব খাতে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার চাপ শেষ পর্যন্ত পণ্যমূল্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে গিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতেও আন্তর্জাতিক ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে দেশে দফায় দফায় গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর নজির রয়েছে।
বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সদস্য সচিব হাসান মেহেদী মনে করছেন, এলএনজি আমদানির এ আর্থিক নিশ্চয়তা বাংলাদেশের জ্বালানি পরিকল্পনার মৌলিক দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তার মতে, যে অর্থ দিয়ে কয়েক দিনের জ্বালানি চাহিদা মেটানো হচ্ছে, তা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
হাসান মেহেদী বলেছেন, ‘শুরুতে এলএনজি আমদানির দাম ছিল ৭-৮ ডলার, পরে তা ১৩ ডলারে ওঠে। একপর্যায়ে ৩০ ডলারেও পৌঁছেছে। এক কার্গো এলএনজি কিনতে খরচ প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার, যা দিয়ে ১০০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা যায়। সেখান থেকে ২৫-৩০ বছর বিদ্যুৎ পাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে। অথচ এক কার্গো এলএনজি শেষ হয়ে যায় সর্বোচ্চ তিন দিনে।’
তার মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোই হওয়া উচিত ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থাগুলোর সহায়তায় এলএনজি আমদানি ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের পথই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
হাসান মেহেদী উদাহরণ হিসেবে বলেছেন, ২০১৬ সালে মহেশখালীতে এক্সেলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসি প্রায় ১১ কোটি ডলার অর্থায়ন করে। এখন সেই অবকাঠামোয় আমদানি করা এলএনজির মূল্য পরিশোধের নিশ্চয়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। তার ভাষায়, ‘বিশ্বব্যাংক যদি এ অর্থ কিংবা আইএফসি তাদের অর্থ সৌর বা বায়ুবিদ্যুতে দিত, তাহলে ২৫ থেকে ৩০ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ ছিল।’
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নীতিগত সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক একই ধরনের এজেন্ডা (ভর্তুকি কমানো, দাম বাড়ানো, বেসরকারীকরণ) একযোগে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। যেখানে এ গ্যারান্টি প্রকল্পটি একটি বাড়তি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। এর আগে কক্সবাজারের মহেশখালীতে প্রথম এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা-আইএফসি সরাসরি যুক্ত ছিল। এখন সেই অবকাঠামোয় আনা এলএনজির দাম মেটাতে লাগছে বিশ্বব্যাংকের গ্যারান্টি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এলএনজি আমদানির আর্থিক নিশ্চয়তা শুধু একটি বাণিজ্যিক সুবিধা নয়, বরং বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বৃহত্তর অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) নেটওয়ার্কিং অ্যাডভাইজার মনোয়ার মোস্তফার মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর কথা বললেও এলএনজি আমদানিতে গ্যারান্টি দেওয়া বিশ্বব্যাংকের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের উদ্যোগের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার অভিযোগ, এ ধরনের আর্থিক সহায়তা বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যের আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার বদলে আরও বেশি করে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করছে।
আপাতদৃষ্টিতে এ গ্যারান্টিকে ‘সুবিধা’ মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি ও আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মনে করেন মনোয়ার মোস্তফা। তার ভাষায়, ‘বিশ্বব্যাংক যদি বাংলাদেশের ভালো চাইত, তাহলে তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানি কিংবা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অর্থায়ন বা এ গ্যারান্টি দিত। তাদের উদ্দেশ্যে আমরা যাতে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানিনির্ভরতা থেকে বের হতে না পারি।’
দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সংকট মোকাবিলায় নতুন গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বিশ্বব্যাংকের নথিতেও উঠে এসেছে। অথচ আমদানি নিশ্চিতে দেওয়া এ গ্যারান্টি অনুসন্ধান, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরাসরি কোনো ভূমিকা রাখছে না। ফলে যে সংকট মোকাবিলার জন্য এ আর্থিক ব্যবস্থা, তার মূল কারণগুলো অমীমাংসিতই থেকে যাচ্ছে।



