বিদ্যুৎ বিলের চাপে ৬৯ শতাংশ পরিবার, সেবার মানে অসন্তোষ ৫৫ শতাংশের

বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গণসংলাপের আয়োজন করে ক্যাব
দেশে বিদ্যুতের প্রসার পরিবর্তন এনেছে জীবনযাত্রার মানে। তবে এই সুবিধার বিপরীতে বিদ্যুৎ বিলের চাপও বেড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌরসভা এলাকার ৫৫৬টি পরিবারের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে এ চিত্র।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৬৯ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, আয়ের তুলনায় বিদ্যুৎ বিলের চাপ বেড়েছে। অন্যদিকে ৫৫ শতাংশ গ্রাহক বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতাকে খারাপ বা খুব খারাপ বলেছেন।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পরিচালিত দশ বছরের তুলনামূলক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা বাড়লেও নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের ব্যয় ও সরবরাহসংক্রান্ত অসন্তোষ রয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য কাজে লাগিয়ে দরিদ্র পরিবার শনাক্ত এবং তাদের জন্য সহায়তা কার্যক্রম আরও কার্যকর করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
আজ বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক গণসংলাপে সমীক্ষার এ ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
সমীক্ষা অনুযায়ী, গত এক দশকে লাইফলাইন (প্রান্তিক) গ্রাহকদের জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ৮৫ শতাংশ পরিবারের বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে। ৭৭ শতাংশ পরিবারের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সংখ্যা ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ফ্রিজের মালিকানা ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ এবং টেলিভিশনের মালিকানা ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৮ শতাংশ হয়েছে। এ ছাড়া ৭৬ শতাংশ পরিবারে পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত হয়েছে।
বিদ্যুৎ জীবনমান উন্নত করেছে বলে মনে করেন ৮৯ শতাংশ উত্তরদাতা। রাতে বিদ্যুতের কারণে বেশি নিরাপদ বোধ করেন ৯৭ শতাংশ। তবে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর আর্থিক সামর্থ্যের সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে সমীক্ষায়। বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা ধরে রাখতে গিয়ে পরিবারগুলোকে বাড়তি আর্থিক চাপ সামলাতে হচ্ছে কি না, তা বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে ক্যাব।
দরিদ্র পরিবার শনাক্তে নতুন করে জরিপ পরিচালনার পরিবর্তে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্যকে প্রাথমিক নির্দেশক হিসেবে কাজে লাগানোর প্রস্তাব দিয়েছে ক্যাব। সংগঠনটির মতে, নিয়মিত মিটার রিডিংয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবারগুলোকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এরপর তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাই করে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার নির্ধারণ করা সম্ভব।
এ পদ্ধতি কার্যকর হলে দরিদ্র পরিবার খুঁজে বের করতে সময় ও অর্থ ব্যয় কমতে পারে। ক্যাবের প্রস্তাবনায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২১৬ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় সাশ্রয়ের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
গণসংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে লুটপাটের সুযোগ তৈরি করতেই আওয়ামী লীগ সরকার দায়মুক্তি আইন পাস করেছিল। জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে কোনো খাতেই অনিয়মের সুযোগ থাকবে না। গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় প্রতিটি খাত ও প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’
‘দেশে শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চল ও চরাঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত। দরিদ্র অনেক পরিবারকে ভাগাভাগি করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয়। ফলে শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বিবেচনা করে হতদরিদ্র মানুষের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা কঠিন’, যোগ করেন তিনি।
রিজভী বলছিলেন, ‘বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দারিদ্র্য নিরূপণের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। গবেষণার মাধ্যমে নতুন ধারণা ও প্রশ্ন সামনে আসা প্রয়োজন। কোনো পরিসংখ্যানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে তা যাচাই-বাছাই করতে হবে।’
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা তুলে ধরে রিজভী বলেছেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও আগ্রহ আছে। নিজেদের চাহিদা পূরণের পর উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।’
গবেষক ও সাংবাদিক কাজল রশিদ শাহিন বলেন, ‘বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্যের ভিত্তিতে দারিদ্র্য নিরূপণের প্রস্তাবটি সময়োপযোগী। তবে এ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো পরিবার ভুলভাবে তালিকা থেকে বাদ না পড়ে।’
বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্যের ভিত্তিতে দরিদ্র পরিবার শনাক্তের প্রস্তাব বাস্তবায়নে ১২ দফা কর্মপরিকল্পনা দিয়েছে ক্যাব। এতে পরীক্ষামূলকভাবে পদ্ধতিটি চালু করা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও সমন্বয় নির্ধারণ, মিটার ও প্রকৃত পরিবারের সম্পর্ক যাচাই এবং টানা ১২ মাসের বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সীমা পরীক্ষা, প্রতিনিধিত্বশীল এলাকায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা, স্বাধীনভাবে ফলাফল তুলনা এবং গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড আগেই নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
ক্যাবের সুপারিশে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুৎ সহায়তার পরিমাণ ও বিতরণপদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন এবং সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও রয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনটির জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। সেশন পরিচালনা করেন ক্যাবের গবেষণা সমন্বয়ক প্রকৌশলী শুভ কিবরিয়া।
গণসংলাপে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক শিহাব উদ্দিন এবং গবেষক আনিস রায়হান বক্তব্য দেন।
একই অনুষ্ঠানে রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও শৈলকুপা পৌরসভা এলাকায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনাও তুলে ধরে ক্যাব। গবেষণা অনুযায়ী, ৩১টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ৫২ দশমিক ৫০ মেগাওয়াট, ১৫০টি কলেজ এলাকায় ৫১ দশমিক ১২ মেগাওয়াট, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৪ দশমিক ৬০ মেগাওয়াট এবং শৈলকুপা পৌরসভা এলাকায় ৪ দশমিক শূন্য ৬ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।



