ঘোড়াশাল তৃতীয় রি-পাওয়ারিং
বিদ্যুৎকেন্দ্র যেন সময় বৃদ্ধির মেশিন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পুরনো যন্ত্রাংশ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নয়ন করে একই জ্বালানি ব্যবহার করে অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল। ‘ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং’ প্রকল্পের মাধ্যমে সেই লক্ষ্যই অর্জন করতে চেয়েছিল সরকার। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা পূরণ হয়নি। উল্টো প্রকল্পটি যেন পরিণত হয়েছে সময় বৃদ্ধির মেশিনে।
আড়াই বছরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটির মেয়াদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৯ বছরে। একই সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ও। যদিও এর পেছনে ঠিকাদারের চুক্তি লঙ্ঘন ও বাতিলসহ ১৩ ধরনের কারণের কথা বলা হচ্ছে, তবু প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা, পরিকল্পনা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, শুরুতেই বৈদেশিক ঋণচুক্তি কার্যকর করতে প্রায় দুই বছর সময় লেগে যায়। এরপর দুর্ঘটনা, মামলা-মোকদ্দমা, আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতাসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রকল্পটি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
তবে আশার খবর হলো, গত মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৯৭ শতাংশে পৌঁছেছে। যদিও আর্থিক অগ্রগতি এখনো তুলনামূলক কম। যা দাঁড়িয়েছে ৭৭ দশমিক ২৯ শতাংশে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনের খসড়ায় উঠে এসেছে প্রকল্পটির দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত নানা জটিলতার তথ্য।
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এত বেশি সময় বৃদ্ধি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এক্ষেত্রে কারণগুলো ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। প্রকল্প নেওয়ার আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের জানা উচিত ছিল বাস্তবায়ন পর্যায়ে কী কী সমস্যা হতে পারে। তাহলে যে সমস্যাগুলোর কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো বড় বাধা হওয়ার কথা নয়। প্রকল্প নেওয়ার আগেই সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল। এক্ষেত্রে কার গাফিলতি আছে তা বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।’
আইএমইডি সূত্র বলছে, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ নির্ধারণ করে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রথমে দুই বছর বাড়িয়ে মেয়াদ করা হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপর প্রথম সংশোধনে আরও এক বছর এবং দ্বিতীয় সংশোধনে আরও দুই বছর বাড়িয়ে তা নেওয়া হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
তাতেও কাজ শেষ না হওয়ায় সর্বশেষ তিন দফায় আরও ৩ বছর ৭ মাস সময় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। ফলে আড়াই বছরের প্রকল্প শেষ হতে সময় লাগছে প্রায় সাড়ে ৯ বছর। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ২৯০ শতাংশে।
শুধু সময়ই নয়, বেড়েছে প্রকল্প ব্যয়ও। শুরুতে ২ হাজার ৫১৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা থাকলেও তা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪৩৫ কোটি টাকা। গত মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটিতে খরচ হয়েছে ২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনের খসড়ায় আইএমইডি বলছে, প্রকল্পের আওতায় গ্যাস টারবাইন ইউনিট ও অক্সিলারিজসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ শেষে ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি তা ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তখন গ্যাস টারবাইনের আইসিও (ওপেন সাইকেল অপারেশন) সম্পন্ন করে পরিচালনার জন্য ইউনিটটি প্রস্তুত করা হয়েছিল। পরবর্তী ২ বছর ৭ মাসে প্রায় ৯২ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। তবে গ্যাসের স্বল্পতার কারণে ১৫ মাস ইউনিটটি পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।
এর মধ্যেই ২০২১ সালের জুলাই মাসে চলমান অবস্থায় গ্যাস টারবাইনের কম্প্রেসরে যান্ত্রিক দুর্ঘটনা ঘটে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ মেরামতের জন্য সুইজারল্যান্ডভিত্তিক জিই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়। কিন্তু যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ায় দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়।
অবশেষে ২০২৫ সালের জুন মাসে আইনি জটিলতা কাটিয়ে যন্ত্রাংশ প্রকল্প এলাকায় এসে পৌঁছায়। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ দল মেরামত ও কমিশনিং কার্যক্রম শুরু করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকল্পে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এতে ১৩টি আপত্তি উত্থাপিত হয়। যার মধ্যে একটি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বাকি আপত্তিগুলো এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পের দুর্বল দিক হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ঋণের অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, অগ্রিম অর্থ পরিশোধে দেরি, একাধিকবার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ঋণচুক্তি সংশোধনের বিষয়গুলো।
এ ছাড়া বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা, পুরনো যন্ত্রপাতির অনির্ভরযোগ্যতা, জ্বালানি প্রাপ্যতা এবং বিভিন্ন কারিগরি চ্যালেঞ্জকে ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল ১৫ শতাংশ অগ্রিম অর্থ পরিশোধ। কিন্তু ঋণদাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মিগা থেকে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। ফলে শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় বাস্তবায়ন কার্যক্রম। এ ছাড়া সাইট দখলমুক্ত ও হস্তান্তর জটিলতা, বৈশ্বিক করোনা মহামারি, পিজিসিবির ২৩০ কেভি জিআইএস সাবস্টেশন নির্মাণে বিলম্ব, আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা, মেরামত-পরবর্তী প্রস্তুতি, দেশি-বিদেশি মামলা, সুইজারল্যান্ডের উদ্ভূত সংকট এবং যান্ত্রিক দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে প্রকল্পটি বারবার হোঁচট খেয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ২৬০ দশমিক ৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস টারবাইন জেনারেটিং ইউনিট স্থাপন, গ্যাস বুস্টার কম্প্রেসার এবং অক্সিলারিজসহ ডিজেল জেনারেটর স্থাপন। এ ছাড়া বিদ্যমান ২১০ মেগাওয়াট স্টিম টারবাইন জেনারেটিং ইউনিট আধুনিকায়ন, হিট রিকভারি স্টিম জেনারেটর সংগ্রহ, স্টেপ-আপ ট্রান্সফরমার, সুইচগিয়ার, অক্সিলিয়ারি ট্রান্সফরমার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং বিদ্যমান পাওয়ার ইভাকুয়েশন সিস্টেমের সংস্কার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এর পাশাপাশি গ্যাস টারবাইনের জন্য নতুন পাওয়ার ইভাকুয়েশন সিস্টেম স্থাপন, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ, পরিমাপক ও নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং বিভিন্ন পূর্তকাজ বাস্তবায়নের বিষয়ও রয়েছে।







