জাতিসংঘে পুলিশ কাউন্সিলর
পদ আছে পদায়ন নেই

নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ সৃষ্টি হয়েছিল সাত বছর আগে। উদ্দেশ্য ছিল শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের স্বার্থরক্ষা, নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা। কিন্তু বছরের পর বছর কেটে গেলেও সেই চেয়ারে বসেননি কেউ।
পুলিশ সদর দপ্তর বারবার চিঠি দিয়েছে, তাগিদ দিয়েছে, কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতার গোলকধাঁধায় আটকে আছে নিয়োগ প্রক্রিয়া। এরই মধ্যে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের উপস্থিতি কমেছে, কমেছে বৈদেশিক আয়ও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিউ ইয়র্কে একজন ‘পুলিশ কাউন্সিলর’ না থাকায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের অংশগ্রহণ বাড়াতে ২০১৯ সালে নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে ‘পুলিশ কাউন্সিলর’ পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। পুলিশ সুপার, উপসচিব কিংবা তার চেয়ে ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তাকে প্রেষণে নিয়োগ দিতে অস্থায়ী ভিত্তিতে পদটি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু সাত বছর পরও নিয়োগ প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ মনে করছেন, বিষয়টি নিয়ে আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেছেন, পুলিশ সদর দপ্তরের উচিত মন্ত্রণালয়ের কাছে তাদের চিঠির জবাব চাওয়া। জানতে চাওয়া, কেন এতদিনেও নিয়োগ হয়নি। প্রশাসনিক জটিলতা থাকলেও যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এর সমাধান সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন দেশের স্থায়ী মিশনে নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তারা জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব পিস অপারেশনসের (ডিপিও) সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় করেন। কোথায় নতুন মিশন আসছে, কোথায় অতিরিক্ত জনবল প্রয়োজন, কোন দেশে বিশেষায়িত ইউনিট পাঠানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে— এসব বিষয়ে তারা সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব অনেকাংশে পালন করেন প্রতিরক্ষা উইংয়ের ডিফেন্স অ্যাডভাইজার। তিনি মূলত সশস্ত্র বাহিনীর কন্টিনজেন্ট ও সদস্য মোতায়েন এবং প্রশাসনিক বিষয় দেখভাল করেন। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ধরন আলাদা হওয়ায় একজন ডিফেন্স অ্যাডভাইজারের পক্ষে পুলিশের সব বিষয় সমানভাবে তদারকি করা কঠিন। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও অনুসরণে ঘাটতি থেকে যায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, শান্তিরক্ষা মিশনে জনবল ও সরঞ্জাম পাঠিয়ে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক আয় করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মিশনে সদস্য সংখ্যা কমে যাওয়ায় সেই আয়ও কমতে শুরু করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, পুলিশ কাউন্সিলর পদে নিয়োগের জন্য একাধিকবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চলতি বছর পুলিশ সপ্তাহের পরও বিষয়টি নিয়ে আবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানিয়েছে, পুলিশ সদর দপ্তরের পাঠানো চিঠি তারা পেয়েছে। পদটিতে নিয়োগ দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার ইতিবাচক।
বাংলাদেশ পুলিশ প্রথম জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেয় ১৯৮৯ সালে। এরপর গত ৩৭ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন মিশনে বাহিনীটির ২১ হাজার ৮১৬ সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে ১৭ হাজার ২৩ জন ছিলেন ফর্মড পুলিশ ইউনিটের সদস্য, ৪ হাজার ৭৭৭ জন ব্যক্তিগত পুলিশ কর্মকর্তা এবং ২৮ জন পেশাদার পর্যায়ের কর্মকর্তা।




