তিন দশকে সর্বোচ্চ শিশুমৃত্যু

ওষুধ কেনার নেই টাকা, মিলছে না আইসিইউ, হাসপাতালের বারান্দায় নিথর সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নির্বাক মা-বাবা। দেশের হাসপাতালগুলোতে এমন চিত্র এখন নিত্যদিনের। নব্বইয়ের দশকের পর যে মরণব্যাধি প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল, কয়েক দশক পর সেই হাম যেন এবার ফিরে এসেছে যমদূত হয়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ (হু) অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান বলছে, হামে শিশুমৃত্যুর দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সব দেশকে ছাড়িয়ে শীর্ষে। মাত্র দুই মাসে নিভে গেছে ৫১২টি নিষ্পাপ প্রাণ, যাদের বয়স ছোঁয়নি পাঁচ বছরও। একসময়ের টিকাদানের রোল মডেল এ দেশের হাসপাতালগুলোতে এখন কান পাতলে প্রায়ই শোনা যাচ্ছে সন্তান হারানো মা-বাবার বুকফাটা আর্তনাদ।
দায়টা কে নেবে?
২৪ মে ২০২৬
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ বলছে, হামে শিশুমৃত্যুর দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে, যার পরই রয়েছে সুদান। তিন দশকের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীর উদ্বেগে ফেলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৩ মে পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর সংখ্যা ৭১ হাজার। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার শিশু নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১২-এ। আক্রান্তের বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, যাদের অনেকেই টিকা নেয়নি বা নির্ধারিত ডোজ সম্পূর্ণ করেনি।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালে হামে মৃত্যুর দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান, যেখানে অন্তত ৭১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এরপর রয়েছে মেক্সিকো (৩২), ইয়েমেন (২৫), অ্যাঙ্গোলা (১৫) ও গুয়াতেমালা (১০)। তবে এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশ ও সুদানে মৃত্যুহার উদ্বেগজনকভাবে বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
কেউ সন্তানহারা কেউ নিঃস্ব
২৪ মে ২০২৬
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন, মেক্সিকো, অ্যাঙ্গোলা, কাজাখস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ক্যামেরুনসহ বহু দেশে হামের নতুন প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। উন্নত দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়ও সংক্রমণ ফিরে এসেছে। তবে মৃত্যুর হার ও শিশুমৃত্যুর সংখ্যার কারণে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ ও সুদান ঘিরে।
চলতি মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় প্রকাশিত ‘মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা গ্লোবাল সিচুয়েশন আপডেট’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছরের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে ৩ হাজার ২৭৬ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়। এই সময়ে শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে থাকলেও মৃত্যুর দিক থেকে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বৈশ্বিকভাবে হাম আবারও ফিরে এসেছে। তবে বাংলাদেশে মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু সংক্রমণ নয়; বরং একটি বহুমাত্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যর্থতার প্রতিফলন।
বাংলাদেশে ১৯৯০-এর দশকে হাম ছিল শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। সে সময় গ্রাম থেকে শহর— সবখানেই রোগটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ির পর অনেক শিশু নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অপুষ্টিজনিত জটিলতায় মারা যেত। তখন টিকাদান কাভারেজ সীমিত থাকায় পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।
ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের তথ্য বলছে, ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ হাজার শিশু হামে মারা যায়। ওই দশকে প্রতি বছর গড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার শিশুর মৃত্যু হতো। পরবর্তী সময়ে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) শক্তিশালী হওয়ায় পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে। ২০০০ সালের পর ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকাকেন্দ্র বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয়তা এবং গণসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে টিকাদান কাভারেজ প্রায় ৮৯ শতাংশে পৌঁছে যায়। ২০১২ সালে চালু হয় দ্বিতীয় ডোজ এমআর টিকা এবং ২০১৪ সালে ৫ কোটি ৩০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার বৃহৎ ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ ছিল।
তবে করোনা মহামারীর (২০২০-২০২২) সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা থেকে বঞ্চিত হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এমআর-১ কাভারেজ ৮৮.৬ থেকে কমে ৮৬ শতাংশে এবং এমআর-২ কাভারেজ ৮৯ শতাংশ থেকে নেমে প্রায় ৮১ শতাংশে দাঁড়ায়। এতে দেশে তৈরি হয় বড় ধরনের ইমিউনিটি গ্যাপ। এই ঘাটতির প্রভাব এখন স্পষ্ট। ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চল, বস্তি এবং দুর্গম এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অপুষ্টিতে ভোগা ও টিকা না নেওয়া শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ— টিকাদানের ঘাটতি, পুষ্টিহীনতা, দেরিতে চিকিৎসা নেওয়া এবং সচেতনতার অভাব। অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকটও চিকিৎসা বিলম্বিত করছে, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৬-এ বিভাগভিত্তিক টিকা প্রদানের তথ্য অনুযায়ী প্রায় সব বিভাগেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ ও অতিক্রম করা হয়েছে। বরিশাল, খুলনা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে কাভারেজ পৌঁছেছে ১০১ শতাংশে। চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রংপুর বিভাগে টিকা প্রদানের হার উন্নীত হয়েছে ১০৩ শতাংশে। এ ছাড়া সব বিভাগেই লক্ষ্যমাত্রার সমান বা বেশি টিকা প্রদান করা হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিএইচআইএস২ ও ইপিআই অ্যান্ড সার্ভিল্যান্সের তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। সারা দেশে টিকাদান কার্যক্রমে বড় সাফল্য দেখা গেলেও কিছু সংখ্যাগত অসংগতি থাকায় তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন মনে করছেন, হাম নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি পর্যায়ে দ্রুত চিকিৎসা ও টিকাদান সেবা বাড়াতে হবে, প্রয়োজনে তাঁবু হাসপাতাল বা অস্থায়ী কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষণারও আহ্বান জানান, যাতে মানুষ আরও সতর্ক হয় এবং রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যায় কার্যকর পদক্ষেপ।
চিকিৎসক-নার্সদের ঈদের ছুটি বাতিল: হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় থাকা চিকিৎসক, নার্স ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় সংশ্লিষ্টদের ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান। মন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা (সার্কুলার) জারি করা হয়েছে। তিনি বললেন, ‘হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়ায় চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা জরুরি। এ কারণে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্বে থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে রোগীদের সেবা ব্যাহত না হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।’









