জুনে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব তবে...

রায়ানের বয়স মাত্র ১০ মাস। এ বয়সে তার পৃথিবী হওয়া উচিত ছিল খেলনা, হাসি আর মায়ের কোলে নিশ্চিন্ত ঘুম। কিন্তু কয়েক দিন ধরে সেই পৃথিবী বদলে গেছে। ওর ছোট্ট শরীর জুড়ে হাম। এমন অবস্থা যে, গায়ে জামা রাখা যাচ্ছে না। সামান্য ছুঁলেই কেঁদে উঠছে। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে বসে থাকা মায়ের চোখে এখন শুধু ভয় আর উৎকণ্ঠা। তার একটাই প্রশ্ন, এ কষ্ট আর কতদিন চলবে?’
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে বিন্দুমাত্র ফাঁক থাকলে অপেক্ষা করছে মহাবিপদ। তাদের ভাষ্য, টিকার কাভারেজ নিয়ে সরকারের দেওয়া হিসাবে ফাঁকফোকর থাকে। এত দ্রুত সময়ের মধ্যে সব এলাকায় বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চলে শতভাগ টিকা দেওয়া কঠিন। কোনো এলাকা কাভারেজের বাইরে থেকে গেলে হামের নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। সরকারের এ হিসাব তৃতীয় পক্ষ থেকে যাচাই করা দরকার।
প্রায় ৩০ বছর মা ও শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ইশতিয়াক মান্নান। আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করা এই জনস্বাস্থ্যবিদ বলছেন, ‘হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে হার, তাতে এখন পিক চলছে বলা যায়। সরকার টিকাদানের যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা বলছে, এতে এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে হামের প্রকোপ কমার কথা। যদি না কমে তাহলে একজন জনস্বাস্থ্যবিদ হিসেবে বলতে পারি, টিকা কাভারেজে ঘাটতি রয়েছে। সঠিক তথ্য উঠে আসছে না।’
সামনের ঈদে হামের সংক্রমণ বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছেন ইশতিয়াক মান্নান। তিনি বলছেন, ঈদযাত্রায় যেভাবে ট্রেন, লঞ্চ, বাসে উপচেপড়া ভিড় থাকে। তাতে সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা আছে। পাশাপাশি ঈদে দেখা-সাক্ষাতের যে সংস্কৃতি, সেটাও সংক্রমণ বাড়াতে পারে। এক্ষেত্রে সবার মধ্যে সচেতনতা দরকার।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে হাম নতুনভাবে আলোচনায় আসে। মার্চ থেকে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর খবর আসতে শুরু করে। এপ্রিল ও চলতি মাসে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যু; উভয়ই বাড়তে থাকে। প্রতিদিনই হামে অনেক শিশু মারা যাচ্ছে, যাদের বেশিরভাগের বয়স দুই বছরের কম। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে হামে শিশুমৃত্যুর হার বেশি বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তিন দশক পর বাংলাদেশে হামে এত প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
হামের প্রাদুর্ভাবের পর সরকার দেশের ১৮টি জেলার ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় গত ৫ এপ্রিল থেকে টিকা দেওয়া শুরু করে। এরপর সারা দেশে টিকার ক্যাম্পেইন শুরু হয় ২০ এপ্রিল, যা এক মাস ধরে চলেছে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে হামের টিকার আওতায় নিয়ে আসা। গত ১৭ মে পর্যন্ত ১ কোটি ৮২ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৫ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার বেশি শিশু টিকা পেয়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে টিকার প্রথম ডোজ ৯ মাসে দেওয়া হতো। হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে টিকা দেওয়ার নির্ধারিত নতুন বয়স ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর করা হয়েছে। কিন্তু ছয় বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকা দেওয়া হয়েছে। কোরবানি ঈদের পর হামের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন অবশ্য বলছেন, টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে মাইক্রোপ্ল্যান করা হয়নি। হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও টিকা ক্যাম্পেইন চালাতে হবে। এক্ষেত্রে তার পরামর্শ, গ্রামে ঘরে ঘরে গিয়ে টিকা দেওয়া। শহরে রাতে ভ্রাম্যমাণ দল দিয়ে টিকাদান কর্মসূচি চালানো। এসব উদ্যোগ নিলে জুন নাগাদ হামের প্রকোপ কমতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবশ্য শুনিয়েছে আশার কথা। রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক মো. হালিমুর রশীদ অবশ্য বলেছেন, টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে যেখানে যত ফাঁক আছে, খুঁজে খুঁজে সেখানে টিকা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া আছে। এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে হাম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
কিন্তু রায়ানের মায়ের মতো অসংখ্য অভিভাবকের কাছে সময় যেন এখনো থমকে আছে। প্রতিটি রাত কাটছে আতঙ্কে, প্রতিটি কান্না তাদের বুক কাঁপিয়ে দিচ্ছে। তারা শুধু অপেক্ষা করছেন, আবার কবে শিশুদের মুখে স্বস্তির হাসি ফিরবে, কবে হাসপাতালের ভিড় কমবে আর কবে এই অদৃশ্য আতঙ্ক থেকে মুক্তি মিলবে।






