কেউ সন্তানহারা কেউ নিঃস্ব

হাসপাতালের ওয়ার্ডের এক কোণে বসে ছলছল চোখে চেয়ে বাবা। পেশায় অটোরিকশাচালক। কোলে ছটফট করছে ১১ মাসের ফুটফুটে সন্তান। সাত দিন পর জানা গেছে, শিশুটির শরীরে বাসা বেঁধেছে হাম। কিন্তু ততদিনে চিকিৎসকদের টানাহেঁচড়া আর ভুল পরীক্ষার পেছনে শেষ হয়ে গেছে এই হতদরিদ্র বাবার জীবনভর জমানো সব টাকা। এখন চড়া সুদে ধারদেনা করে হাসপাতালের মেঝেতে বসে প্রহর গুনছেন ছেলের হামমুক্তির খবর শোনার।
এটি শুধু একজন শানহাল দারানীর গল্প নয়; রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তরের প্রায় সব হাসপাতালের করিডর, সিঁড়ির কোণ আর মেঝেতে এখন কান পাতলে শোনা যাচ্ছে এমন শত শত নিঃস্ব মা-বাবার বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস। হামের সঙ্গে লড়তে গিয়ে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো শুধু সন্তানের জীবন বাঁচানোর লড়াই-ই করছে না, জড়িয়ে পড়ছে নির্মম এক অর্থনৈতিক টানাপড়েনে। ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী থেকে শিশু হাসপাতাল— সবখানেই যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বেড না পেয়ে রোগীরা কাতরাচ্ছে করিডর, সিঁড়ির পাশ বা খোলা মেঝেতে। ভ্যাপসা গরম, শিশুর কান্না আর স্বজনদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হাসপাতালের বাতাস।
তবে চিকিৎসা শুরুর আগেই শুধু হাসপাতালে ঠাঁই নিতেই লড়তে হচ্ছে আরেক লড়াই। ভর্তির জন্য টিকিট কাটতে জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে দীর্ঘ লাইনে। টিকিট কাটতেই পেরিয়ে যাচ্ছে কয়েক ঘণ্টা। অভিযোগ রয়েছে, িনরাপত্তাকর্মীদের অতিরিক্ত টাকা না দিলে ভেতরে ঢোকারই সুযোগ মিলছে না। আর সিট পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করতে করতে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে মুমূর্ষু শিশুরা।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি চলছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। আইসিইউর শয্যা না পেয়ে অনেক শিশুকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের মাঝপথেই নিভে যাচ্ছে প্রাণ। এর ওপর যোগ হয়েছে ওষুধের আকাশচুম্বী দাম; জীবন রক্ষাকারী একটি ইনজেকশনের দামই ১৭ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে সন্তানের জীবন বাঁচাতে দিশাহারা বিত্তহীন বাবা-মায়েরা।
‘আমাদের সব টাকা শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু ধার করে চলছি।’ হাসপাতালে ছেলের বিছানার পাশে বসে ছলছল চোখে কথাগুলো বলছিলেন মোহাম্মদ শানহাল দারানী। অটোরিকশাচালক এই বাবা জানেন না, সন্তানের চিকিৎসা কতদিন চলবে। তবে এতটুকু জানেন— হাম শনাক্ত হতে দেরি হওয়ায় এবং বারবার ওয়ার্ড পরিবর্তনের কারণে তাদের সীমিত সঞ্চয়ের সবটুকুই প্রায় শেষ।
ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ। গতকাল শনিবার দুপুর ২টার দিকে হাসপাতালটির ৪২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ঢুকতেই শোনা যায় শিশুদের কান্না। অনুভব করা যায় রোগীর ক্লান্ত স্বজনদের দীর্ঘশ্বাস। ওয়ার্ডের এক কোণে ১১ মাসের সাইফকে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন বাবা শানহাল দারানী। শিশুটির দিকে তাকিয়ে মা হালিমা বেগম বলে উঠলেন, ‘সাত দিন হলো হাসপাতালে আছি। প্রথমে বলল হাম না, পরে ৩১৩নং ওয়ার্ডে পাঠায়। পাঁচ দিন পর এসে বলে হাম। আগে ঠিকভাবে ধরলে (রোগ শনাক্ত) এত কষ্ট হতো না। টাকাও কিছুটা বেঁচে যেত।’
হালিমার অভিযোগ, রোগ শনাক্তে দেরি হওয়ায় এবং বারবার ওয়ার্ড পরিবর্তনের কারণে সাইফের চিকিৎসা শুরুতেও বিলম্ব হয়েছে। সেইসঙ্গে বাইরে থেকে বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে গিয়ে চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়েছে কয়েকগুণ।
একবুক হতাশা নিয়ে শানহাল দারানী বলে উঠলেন, ‘কাজ বন্ধ, আয় বন্ধ। ধার করে চলছি। সব টাকা শেষ।’
একই ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলছে দুই মাসের হামজার। তার পরিবারও একই সংকটের মুখে। পাবনা থেকে আসা শিশুটির দাদি তাসলিমা খাতুন চোখমুখ অন্ধকার করে বললেন, ‘এখন পর্যন্ত অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে। সামনে আরও লাগবে।’
হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেল, শুধু ওয়ার্ড নয়— করিডর, সিঁড়ির পাশ ও খোলা জায়গাতেও অবস্থান করছেন রোগীর স্বজনরা। কেউ শিশুকে কোলে নিয়ে হাঁটছেন, কেউবা বসে মেঝেতে। কেউ আবার ক্লান্ত শরীর দেয়ালে হেলান দিয়ে নিচ্ছেন বিশ্রাম।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হাম প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ জ্বর বা ভাইরাল সংক্রমণের মতো মনে হতে পারে। ফলে শনাক্তে দেরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে দ্রুত শনাক্ত ও আইসোলেশন না হলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
মহাখালীর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডেও দেখা গেল একই চিত্র। সেখানে চিকিৎসা চলছে ছয় মাসের তাবাসসুমের। তার বাবা আল-আমীন বললেন, ‘পাঁচ দিন আগে জ্বর শুরু হয় মেয়ের, পরে শরীরে দানা ওঠে। এখন একটু ভালো— এটাই স্বস্তি।’
একই সঙ্গে এ-ও জানালেন, সীমিত আয়ের কারণে মেয়ের চিকিৎসার ব্যয় বহন তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন জানালেন, হামে আক্রান্তের ক্ষেত্রে প্রাথমিক উপসর্গ সাধারণ জ্বরের মতো হওয়ায় শনাক্তে দেরি হয়। কিন্তু দ্রুত শনাক্ত ও আইসোলেশন অত্যন্ত জরুরি। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘আক্রান্ত রোগীকে অন্তত চার দিন আলাদা রাখা প্রয়োজন, কারণ এই সময় সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।’
তার মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার চাইলে এটিকে ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারে এবং কমিউনিটি পর্যায়ে গড়ে তুলতে পারে অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র ও আইসোলেশন ব্যবস্থা।
টিকিট পেতে দীর্ঘ লাইন ও আইসিইউ সংকট: বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আইসিইউ সংকট ও ভর্তি জটিলতায় অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়ছেন অভিভাবকরা। অনেক শিশুকেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় আনার পর আইসিইউ না পেয়ে নিতে হচ্ছে অন্য হাসপাতালে। ৬৮১ শয্যার এই হাসপাতালে জরুরি বিভাগের সামনে প্রতিদিন দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লাইন। টিকিট কাটতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগায় চিকিৎসার শুরুতে হচ্ছে দেরি। অভিযোগ রয়েছে, নিরাপত্তাকর্মী বা পরিচিত হাসপাতাল কর্মীদের অতিরিক্ত টাকা দিলে দ্রুত ঢোকার সুযোগ পান কেউ কেউ। সিট না থাকায় ভর্তিপ্রক্রিয়া বারবার পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে— কখনো দেড়টা, কখনো ২টা বা ৩টার পর বলা হচ্ছে আসতে।
আইসিইউ না পেয়ে চিকিৎসা বিলম্বে চার মাস বয়সী জুরাইসার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ তার বাবার। তিনি বললেন, চার দিন আগেই আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও ব্যবস্থা হয়নি। অন্যদিকে পটুয়াখালী থেকে আসা এক শিশুর বাবা সাইফুল জানালেন, চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি ইনজেকশনের দাম ১৭ হাজার টাকা, লাগবে পাঁচটি। কিন্তু একটি ছাড়া বাকিগুলো জোগাড় করতে পারছেন না। সন্তানের জীবন বাঁচাতে খুঁজে পাচ্ছেন না কোনো দিশা।






