কয়রায় খাবার পানির ৫৫.৩ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা
- আইসিডিডিআর, বি ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ গবেষণার ফল

রাজধানীর মহাখালীতে আইসিডিডিআর, বি-এর সাসাকাওয়া মিলনায়তনে আয়োজিত সেমিনারে উপস্থিত অতিথিরা। ছবি : আগামীর সময়
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় খাবার পানির উৎসে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা জনস্বাস্থ্যের জন্য তৈরি করছে বড় উদ্বেগ। কারণ খুলনার কয়রা উপজেলায় জরিপ করা খাবার পানির ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ উৎসে পাওয়া গেছে লবণাক্ততা।
একই গবেষণায় কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ৪০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষের মধ্যে ২১ দশমিক ৬ শতাংশের আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে বলে অনুমান করা হয়েছে।
আইসিডিডিআর, বি ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
আজ সোমবার রাজধানীর মহাখালীতে আইসিডিডিআর, বি-এর সাসাকাওয়া মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশে খাবার পানির লবণাক্ততা এবং স্বাস্থ্য : প্রমাণ, অভিযোজন এবং নীতিগত সমাধান’ শীর্ষক নীতি ও ফলাফল প্রকাশ সেমিনারে গবেষণার এই ফল উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণায় খুলনার কয়রা উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন ১৭২টি গ্রাম এবং তুলনামূলক এলাকা হিসেবে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার পানির উৎস মূল্যায়ন করা হয়। দুই উপজেলায় মোট ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস জরিপ করা হয়। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি বা ২৪ দশমিক ২ শতাংশ উৎস খাবার পানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
এসব খাবার পানির উৎসের মধ্যে কয়রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে দুই উপজেলার ৪০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন প্রাপ্তবয়স্কের হৃদরোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। গবেষণায় ২১ দশমিক ৬ শতাংশের আগামী ১০ বছরে কমপক্ষে ১০ শতাংশ হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে বলে অনুমান করা হয়েছে। কয়রায় এ হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
তবে গবেষণার এই ফলাফলকে লবণাক্ত পানি সরাসরি হৃদরোগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছে না। গবেষকরা খাবার পানিতে সোডিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদানের উপস্থিতি এবং এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলের ভিত্তিতে পানি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে একীভূত করে একটি সমন্বিত ইন্টারভেনশন প্যাকেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় কম লবণাক্ত খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়ানো, কমিউনিটির সচেতনতা বৃদ্ধি, পানির উৎসের সুষ্ঠু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।
পানির কর্মসূচির অংশ হিসেবে কমিউনিটি রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার ও টিউবওয়েল ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি খাবার পানির উৎসগুলোর তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়মিত নজরদারির জন্য ডিজিটাল রেজিস্ট্রি ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব রয়েছে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের স্ক্রিনিং ও চিকিৎসাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। কমিউনিটি মোবিলাইজেশন ও স্বাস্থ্য শিক্ষার পাশাপাশি অ্যালগরিদমভিত্তিক ‘ক্লিনিক্যাল ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম’-এর মাধ্যমে স্ক্রিনিং, রেফারেল, চিকিৎসা ও ফলোআপে সহায়তা করা হবে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিনেইস বলেছেন, খাবার পানির লবণাক্ততার জন্য এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো স্বাস্থ্যভিত্তিক মাত্রা নির্ধারিত হয়নি। সোডিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদান স্বাস্থ্যের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গবেষণা চলমান রয়েছে। খাবার পানির স্বাস্থ্যভিত্তিক মানদণ্ড নির্ধারণে উপযুক্ত নির্দেশিকা প্রণয়নের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
‘গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাস পুকুর ও অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির দীর্ঘমেয়াদি লবণাক্ততার কারণ হতে পারে’, বলছিলেন ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলা।
জলোচ্ছ্বাসের পর পানির উৎস দ্রুত পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি উপকূলীয় পোল্ডার ও বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আইসিডিডিআর, বি-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যগত প্রভাবের সম্পর্ক নিয়ে তথ্যপ্রমাণ এখনো সীমিত। নিরাপদ খাবার পানি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও কমিউনিটির অংশগ্রহণকে একসঙ্গে যুক্ত করে কার্যকর অভিযোজন কৌশল তৈরির কাজ চলছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম বলেছেন, খাবার পানির লবণাক্ততা একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়। এটি মোকাবিলায় পরিবেশ, স্বাস্থ্য, পানি ও স্থানীয় সরকার খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সেমিনারে পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ ও তথ্য আদান-প্রদান জোরদার, খাবার পানিতে সোডিয়ামের স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়ন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় বৃদ্ধি এবং পানির উৎসের টেকসই ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ খাবার পানির সংকটকে শুধু পানি সরবরাহের সমস্যা নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তন, অসংক্রামক রোগ ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সমন্বিত চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছে।







