খরচ বাড়ায় আকর্ষণ হারাচ্ছে শহুরে জীবন
- গ্রাম থেকে আসা মানুষের সংখ্যা কমেছে
- বেড়েছে শহর থেকে গ্রামে যাওয়া

সংগৃহীত ছবি
শহরের চাকচিক্য আর ঝলমলে জীবন সব সময় গ্রামের মানুষকে টানে। এটা চিরায়ত। কারণ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা শহরে। কর্মসংস্থান বেশি ওখানেই। এমনকি সাহায্য-সহায়তাও ওই শহরে। মানুষকে গ্রাম থেকে বের হয়ে আসতে হাতছানি দেয় শহর।
কিন্তু এখন ফোকাসে ধরা পড়েছে উল্টো চিত্র। গ্রাম থেকে শহরে আসা কমেছে। কেন এই উল্টোযাত্রা? এর সবচেয়ে বড় কারণ জিনিসপত্রের দাম খুব বেশি। স্থির থাকছে না কোনো কিছুই। কিন্তু আয় তো নড়ে না। যা আছে তা-ই। বাড়ার লক্ষণও নেই। দাম বেড়ে যাওয়াই মূল কারণ এই শহরে থিতু না হওয়ার। উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও সংসার চালানোর উপকরণ জোগানো যাচ্ছে না।
শুধু গ্রাম থেকে শহরে আসা কমেছে, এমনটাই নয়; শহর ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার সংখ্যাও বেড়েছে। অর্থাৎ দুই দিক থেকেই গ্রামে থাকার বা ফিরে যাওয়ার সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের সংখ্যা কমার বা শহর থেকে গ্রামে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ার এমন তথ্য দিচ্ছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোও (বিবিএস)।
বিবিএস বলছে, ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্টাটিসটিকস ২০২৩’-এ প্রতিবেদনটি স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের (এসভিআরএন) একটি আউটপুট, যা চালু হয় ১৯৮০ সালে। প্রতিবছর একটি করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলেও ২০২৩ সালের পর আর তা হয়নি।
সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলার সীমানার মধ্যে স্থানান্তরের তথ্যে দেখা যায়, গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রতি হাজার জনসংখ্যায় ১৯ দশমিক ৪-এ। ২০২২ সালের প্রতিবেদনে এ সংখ্যা ছিল ৫৭ দশমিক ৩।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, আন্তঃজেলা অভ্যন্তরীণ যাওয়া-আসার চিত্র উল্টো, অর্থাৎ শহর থেকে পল্লিতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৩ সালের হিসাবে এ সংখ্যা ছিল প্রতি হাজারে ১৩ দশমিক ৮। ২০২২ সালের হিসাবে সেটি ছিল ১০ দশমিক ৯ জন, ২০২১ সালে ৫ দশমিক ৯ জন।
প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসভিআরএস) ইন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. আলমগীর হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, ওই বছর (২০২৩) সবচেয়ে বেশি যেটি ঘটেছে, সেটি হলো পোস্ট কভিডের প্রভাব। তখন যারা কাজ হারিয়ে গ্রামে চলে গেছেন, তারা নতুন করে কাজের ব্যবস্থা করে ফিরে আসতে অনেক সময় নিয়েছেন। ফলে শহরমুখী মানুষের স্রোতে ২০২৩ সালেও ভাটা লক্ষ করা গেছে। কেউ কেউ হয়তো আর আসেননি।
তিনি আরও বলেছেন, শহরে বাসাভাড়াসহ জীবনযাত্রার খরচ বাড়ায় মানুষ ব্যয় সাশ্রয়ের কৌশল হিসেবে এখন মূল শহরে না থেকে শহরতলি বা আশপাশে থাকার চেষ্টা করছে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় তারা সেখান থেকেই শহরে অফিস বা কাজ করতে পারছেন। এ ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এরকম বিকল্প পথ অবলম্বন করছে বেশি।
শহর ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার হার বৃৃদ্ধি এবং গ্রাম ছেড়ে শহরে আসার হার কমার কারণ হিসেবে মূল্যস্ফীতিকেই দুষছেন বিশেষজ্ঞরা। যারা যেতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের অনেকেই গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। পাশাপাশি গ্রামেও এখন বিদ্যুৎ, সিলিন্ডার গ্যাসসহ নানা আধুনিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। এ জন্য গ্রাম ছেড়ে শহরে আসা কমিয়েছে সাধারণ মানুষ।
ঢাকা ও সাভারের জীবন ছেড়ে চলে যাওয়াদের মধ্যে একজন হচ্ছেন মাগুরার মো. রহমত উল্লাহ। তিনি চাকরি করতেন সাভারের একটি বেসরকারি কোম্পানিতে। পাশাপাশি ছিল ফার্নিচারের ব্যবসা। তার ক্রেতার বেশিরভাগই ছিল পোশাক কারখানার শ্রমিক। তারা বাকিতে ফার্নিচার ক্রয় করতেন। কিন্তু করোনার কারণে বাকি নেওয়া ক্রেতাদের খুঁজে পাননি। ফলে ব্যবসায় বিপুল অঙ্কের টাকা লোকসান দিয়ে বন্ধ করে দিতে হয়। এরপর চাকরিটাও চলে যায়। বাধ্য হয়েই চলে আসেন ঢাকার গেণ্ডারিয়ায়।
একটি জীবন বীমা কোম্পানিতে চাকরি নেন। সেখানে যা বেতন, এতে বাজারের খরচ, বাসাভাড়া, সন্তানদের পড়ালেখার খরচ জোগানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে চলে যান গ্রামের বাড়ি মাগুরায়। ২০২৫ সালে পরিবারের সদস্যদের গ্রামে রেখে একাই ফিরে এসেছেন ঢাকায়। শুধু রহমত উল্লাহই নন; এরকম অনেক মানুষই শহরে টিকতে না পেরে পাড়ি জমিয়েছেন গ্রামে। শহরের প্রত্যেক মানুষের হতাশা বেড়েছে। এ জন্য গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের স্রোত কমেছে। আবার উল্টোদিকে শহর ছেড়ে গ্রামে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে।






