ভাইরাল হলেই টনক নড়ে প্রশাসনের
- ঘটনার পেছনের ঘটনা কেউ দেখে না
- চাঁদাবাজি-দখলদারি সব ঘটনায়ই যেন প্রয়োজন ভাইরাল
- ভাইরালের প্রবণতায় বেশি ঝুঁকলে পরে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা : বিশেষজ্ঞ
- দু-একটা ভাইরাল হয়, ভাইরাল ছাড়াও তদন্ত করা হচ্ছে : পুলিশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অপরাধের শিকার হয়ে থানায় গেলেন, অভিযোগ জানালেন, প্রতিকারের আশায় অপেক্ষাও করলেন। কিন্তু তেমন সাড়া মিলল না। অথচ একই ঘটনার একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়তেই বদলে গেল দৃশ্যপট। শুরু হলো পুলিশের তৎপরতা, আটক হলেন অভিযুক্ত, নেওয়া হলো প্রশাসনিক ব্যবস্থা। যে অভিযোগ এতদিন গুরুত্ব পায়নি বলে ভুক্তভোগীর দাবি, সেটিই মুহূর্তে হয়ে উঠল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এমন অভিজ্ঞতা থেকে অনেকের প্রশ্ন— দেশে অপরাধের বিচার পেতে হলে এখন শুধু অভিযোগ জানালেই চলে না, সেটি ভাইরালও করতে হয়?
অভিযোগের এই চিত্রের বিপরীতে পুলিশের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। তাদের দাবি, সব অপরাধের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসে না, তবু নিয়মিত অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু ভাইরাল হওয়ার পর একের পর এক ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নজির জনমনে প্রশ্ন তুলছে— যে ঘটনায় প্রশাসন পরে তৎপর হতে পারে, সেই ঘটনায় শুরুতেই কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায় না?
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সহিংসতা ও নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র। সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর— এই ৯ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭৩ জন নিহত এবং সাড়ে ছয় হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ১৮৭ জন। নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৪৯১টি মরদেহ। এ ছাড়া নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৪০৪টি; এর মধ্যে ৬৫৭ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একেকটি পরিবার, একেকটি ক্ষতবিক্ষত জীবন এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। কিন্তু সব ঘটনা সমানভাবে আলোচনায় আসে না। কোনোটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, কোনোটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে; আবার কোনো ঘটনা ভুক্তভোগীর পরিবার, স্থানীয় মানুষ কিংবা থানার নথির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে গিয়ে অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। কারও জমি দখল, কারও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, কারও বসতবাড়িতে ভাঙচুর— ঘটনার পর প্রতিকার চাওয়ার পাশাপাশি অভিযুক্তদের হুমকির মুখেও পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে এক বৃদ্ধকে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনাটি এমন প্রশ্নকে সামনে এনেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এক যুবক ওই বৃদ্ধকে মারধর করেন। ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকলেও তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ না করার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। পরে ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অভিযুক্তকে আটক করা হয় এবং দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।
একই ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জমি দখল, হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগের বেলায়ও। একটি জমিতে প্রবেশ করে স্থাপনা ভাঙচুর এবং মালামাল সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনায় আসে। পরে মামলা ও গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়।
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও অনেকটা একই রকম। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাস্থলের কাছেই শাহ আলী থানা থাকলেও হামলার সময় প্রত্যাশিত পুলিশি সহায়তা পাওয়া যায়নি। পরে ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হলে পুলিশ তৎপর হয় এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের খবর প্রকাশিত হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন— ঘটনার সময় যে সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেটিই যদি না মেলে, তবে পরে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা কিংবা দায়িত্বে অবহেলার জন্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তাদের তাৎক্ষণিক ক্ষতি কতটা পূরণ করতে পারে?
রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকায় সদ্য সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনের অস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে পদক্ষেপের বিষয়টি সামনে আসে।
এর আগে শিশু রামিসা আক্তার ও আছিয়ার ঘটনা দেশ জুড়ে মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। দুটি ঘটনাই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং অপরাধের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি সামনে আসে। তবে এসব ঘটনা শুধু অপরাধের ভয়াবহতা নয়, জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হলে রাষ্ট্রীয় তৎপরতা কতটা দৃশ্যমান হতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। ঘটনাটি দেশ জুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তদন্ত শেষে মামলার বিচার দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনার ১৯ দিনের মধ্যে বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণার বিষয়টি দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ার নজির হিসেবে আলোচনায় আসে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের মার্চে মাগুরায় বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয় আট বছরের শিশু আছিয়া। গুরুতর আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় দেশ জুড়ে প্রতিবাদ ও বিচারের দাবি ওঠে। একই বছরের ১৭ মে বিচারিক আদালত মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং অন্য তিন আসামিকে খালাস দেন। পরে ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট হাইকোর্ট হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রামিসা ও আছিয়ার মামলার বিচারিক অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব আলোচিত ঘটনার সঙ্গে অন্য অপরাধের প্রতিকার পাওয়ার প্রশ্নটি গুলিয়ে ফেলা যাবে না। কোনো ঘটনার সামাজিক গুরুত্ব, প্রমাণের ধরন ও বিচারিক প্রক্রিয়া আলাদা হতে পারে। কিন্তু এসব ঘটনা জনসমক্ষে আসার পর যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তা অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্তের গতি এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আগামীর সময়কে বলেছেন, কোনো ঘটনা সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর প্রশাসনের জোরালো তৎপরতা ইতিবাচক হতে পারে; তবে এটি নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বিকল্প নয়। একজন নাগরিক থানায় অভিযোগ করার পরই সেটি গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া পুলিশের দায়িত্ব।
এমন প্রশ্ন নতুন নয়। ২০২০ সালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে নির্যাতনের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশ জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। ঘটনাটি সামনে আসার পর ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। উচ্চ আদালতও ঘটনাটির পরিপ্রেক্ষিতে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ খতিয়ে দেখার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
অপরাধের তথ্য যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার ছাড়াও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব— এমন নজিরও রয়েছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে একটি অটোরিকশার গ্যারেজে পুলিশ পরিচয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অভিযোগ অনুযায়ী, চোরাই অটোরিকশা রাখার কথা বলে গ্যারেজ মালিককে ভয়ভীতি দেখিয়ে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকেই চারজনকে গ্রেপ্তার করে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া শাখার উপকমিশনার আকতার হোসেনের বক্তব্যও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, পুলিশ তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে কোনো ঘটনার বিষয়ে পুলিশ আগে থেকে জানতে পারে না। পরে সেটি ভাইরাল বা আলোচিত হলে পুলিশ বিষয়টি জানতে পারে এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
তার ভাষ্য, পুলিশের আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া ১০০টি ঘটনার মধ্যে হয়তো একটি বা দুটি ঘটনা ভাইরাল হয়। ফলে ভাইরাল হওয়া অল্প কয়েকটি ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা হলেও এর বাইরে পুলিশ যে অসংখ্য অভিযোগ গ্রহণ করছে এবং তদন্ত করছে, সেগুলো আলোচনায় আসে না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ পর্যালোচনা সভায় কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, কোনো ঘটনায় পুলিশের গাফিলতি থাকলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বা মত বিবেচনা না করে অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই দেখতে হবে। সব অপরাধের ক্ষেত্রে সুষ্ঠু তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কোনো ধরনের দখল কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন।
ড. তৌহিদুল হক মনে করছেন, ভাইরাল হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হলে মানুষের মধ্যে এমন ধারণা জন্মাতে পারে যে, সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার ছাড়া অভিযোগের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না।






