এলপিজির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ব্যবসায়ীদের

বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বিক্রিতে কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা। পাশাপাশি গাড়িতে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দাম বাড়ানোর দাবিও উঠেছে। ব্যবসায়ীদের এসব দাবি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার গণশুনানি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সবকিছু বিবেচনা করে আগামী মাসে নতুন দর ঘোষণা হবে।
ঢাকার বিয়াম মিলনায়তনে গণশুনানির উদ্বোধন করেন বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তার সঙ্গে ছিলেন সদস্য আব্দুর রাজ্জাক, মো. মিজানুর রহমান ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার শাহিদ সারওয়ার।
দেশে সক্রিয় ৩৫টি কোম্পানির মধ্যে এলপিজি আমদানির অবকাঠামোগত সক্ষমতা আছে ২৩টি কোম্পানির। গত মাসে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি কোম্পানি। এর মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি গণশুনানিতে তাদের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডারে বর্তমান কমিশন ২০০ থেকে বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯, ডেল্টা ৩৬০ টাকা দাবি করেছে। তবে সবচেয়ে কম ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে মেঘনা গ্রুপ।
অন্যদিকে পরিবেশকরা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০, খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা নির্ধারণের আবেদন করেছেন। এ ছাড়া পরিবহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের প্রতি লিটারের কমিশন ৮ থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিইআরসির কারিগরি কমিটি আমদানিকারকের কমিশন ২০০ থেকে বাড়িয়ে ২৮০, ডিলারদের ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৭০ এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার পক্ষে মত দিয়েছে।
কমিশন বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগে এলপিজি আমদানিতে জাহাজ ভাড়াসহ প্রিমিয়াম ছিল প্রতি টনে ৮০-১২০ ডলার। এখন তা ২৫০-৪০০ ডলারে ঠেকেছে। পরিচালন খরচ বেড়েছে। সব বিবেচনায় নিয়ে এমন দাম নির্ধারণ করা উচিত, যাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে এক টাকা বেশি বাজারে কেউ নিতে না পারে।’
তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশের এলপিজির বাজার দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে এ খাতে ৪০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। এ বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। বড় জাহাজে আসে কুতুবদিয়া, সেখান থেকে লাইটারেজ ও সড়ক ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হয়। সেই খরচ যোগ করা হয়নি ২০২১ সালের গণশুনানিতে।’
এলপিজি ব্যবসায় নানান জটিলতার কথা উল্লেখ করে অপারেটররা বলছেন, এ ব্যবসা করতে ৩১টি লাইসেন্স নিতে হয়। ঘাটে ঘাটে দিতে হয় টাকা, শুধু ফি-ই দিতে হয় ৩ কোটি টাকার মতো।
অনুমতি থাকার পরও যারা আমদানি করতে পারছে না, তাদের পক্ষ থেকে শুনানিতে ওরিয়ন গ্যাস লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার অনুপ কুমার সেন বলেছেন, ‘নতুন বাস্তবতায় ১০টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে না পারায় তাদের অবকাঠামো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এতে বাজারে সিলিন্ডার সংকট তৈরি হয়েছে। অন্য কোম্পানির কাছ থেকে কিনে নিয়ে বিইআরসির দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়।’
বাজারে কৃত্রিম সংকট কমাতে ও বাড়তি দাম নেওয়া বন্ধে পাইকারি দাম নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তিনি। যত্রতত্র দোকান দিয়ে ব্যবসা করা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন এলপিজি পরিবেশক তাহের এন্টারপ্রাইজের আবু তাহের কোরাইশি।
শুনানিতে বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রকৌশলী মো. সিরাজুল মাওলা বলেছেন, ‘দুই লাখের বেশি গাড়ি এলপিজি দিয়ে চলে। ২০২১ সালে ৮ টাকা কমিশন নির্ধারণ করেছিল। এরপর পাঁচ বছর চলে গেছে। পরিচালন খরচ বেড়েছে।’
তার দাবি, দেশের ১১০০ অটোগ্যাস পাম্পের মধ্যে ৮০ শতাংশই লোকসানে চলছে। কমিশন ১০ টাকা হলে ক্ষতি দূর হবে, কিছুটা মুনাফা দিয়ে ১১ টাকা করার দাবি তাদের।
বিইআরসি জানিয়েছে, শুনানি পরবর্তী কোনো বিষয়ে বক্তব্য থাকলে আগামী রবিবারের মধ্যে লিখিতভাবে জমা দেওয়া যাবে। এরপর সার্বিক দিক বিবেচনা করে কমিশন চূড়ান্ত আদেশ দেবে।
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করে আসছে বিইআরসি। যদিও নির্ধারিত দামে বাজারে এলপিজি বিক্রি হয় না। প্রায়ই বাড়তি দামে গ্রাহকদের এলপিজি কিনতে হয়। চলতি মাসে ১২ কেজিতে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়। কিন্তু সাধারণ গ্রাহকদের ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।



