মন্ত্রণালয়ের নির্দেশও মানে না আরইবি
- দেড় বছর ধরে অনিশ্চয়তায় ৪৪ পরিবার
- আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির পরও শাস্তি হয়নি আরইবির ৬ কর্মকর্তার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) অনিয়ম-দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে চাকরি খুইয়েছেন, কঠিন কঠিন ধারায় তিনটি পৃথক মামলা দেওয়া হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ আইনি পথ পাড়ি দিয়ে এসব মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তারা। বিদ্যুৎ বিভাগও চাকরিচ্যুতদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু তা আমলে নিচ্ছে না আরইবি।
এতে সামাজিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চাকরিচ্যুত ৪৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবার চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।
অন্যদিকে, মন্ত্রণালয়কে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে আরইবির ৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশসহ বেশ কিছু নির্দেশনা কার্যকর করছে না আরইবি। নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকে তাদেরই নির্দেশনা একের পর না মানায় আরইবি’র প্রশাসনিক জবাবদিহি ও কর্তৃত্বের সীমা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
দেশের ৪ কোটি ৯৭ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে ৩ কোটি ৮০ লাখ গ্রাহক আরইবি’র। সংস্থাটি দেশজুড়ে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। মূলত মাঠপর্যায়ে থেকে মূল কাজ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ৪৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। আর তদারকির দায়িত্ব পালন করে আরইবি। সংস্থাটির বিরুদ্ধে নানান বঞ্চনাসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ রয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মীদের। এমনকি আরইবি’র বিরুদ্ধে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক মালামাল কেনাসহ নানারকম অনিয়ম-দুর্নীতিরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এসব নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই দ্বন্দ্ব চলছে। প্রতিকার চেয়ে লিখিত আবেদন করেও মেলেনি কোনো সমাধান।
সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অভিন্ন চাকরি বিধিমালা প্রণয়ন, আরইবি ও সমিতির একীভূতকরণ এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের চাকরি নিয়মিতকরণসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলনে নামেন। যার মধ্যে দেশব্যাপী অবস্থান ধর্মঘট, মানববন্ধন ও গণছুটির মতো কর্মসূচিও ছিলো।
আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুত করে আরইবি। পরদিন ঢাকায় ও কুমিল্লায় তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশসহ বিভিন্ন আইনে পৃথক তিনটি মামলা করে সংস্থাটি। এর বাইরে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয় ১৬০ জনকে। ওই ঘটনায় আন্দোলন জোরদার হলে বিভিন্ন সময়ে আরও ২৬ জনকে চাকরিচ্যুত করার পাশাপাশি চার হাজারেও বেশি কর্মীকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এরপর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের দফায় দফায় বৈঠক এবং তাদের দাবি পর্যালোচনার আশ্বাসে বন্ধ হয় আন্দোলন। পর্যালোচনায় গঠিত হয় একাধিক কমিটি। এসব কমিটি বিভিন্ন সুপারিশ করলেও তার বেশিরভাগই কার্যকর না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মোশাহিদা সুলতানা আগামীর সময়কে বলছিলেন, পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির উপর আধিপত্য চর্চার সংস্কৃতি তৈরি করেছে আরইবি। তারা কর্মীদের অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করেছে। যেহেতু আদালত মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে এবং মন্ত্রণালয়েরই নির্দেশনা রয়েছে, এখন এসব কর্মীদের ক্ষতিপূরণসহ চাকরিতে পুনর্বহাল করা উচিত আরইবি’র। কাজটা আরও আগেই করা দরকার ছিলো।
তার অভিযোগ, আরইবিতে দুর্নীতি আখড়া তৈরি হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠী ও ব্যক্তির স্বার্থ জড়িত। যে কারণেই হয়তো মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
দেড় বছর ধরে অনিশ্চয়তায় ৪৪ পরিবার
কোনো ধরনের কারণ দর্শানোর নোটিশ কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না পেয়েই চাকরি হারান ৪৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এদের মধ্যে আবার ২০ জনের নামে দেওয়া হয় মিথ্যা মামলা। সেই মামলায় ১৮ জন বিভিন্ন মেয়াদে সর্বোচ্চ ৮৭ দিন পর্যন্ত কারাভোগ করেন। রিমান্ডের মুখোমুখিও হয়েছেন তারা।
এতে সামাজিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবার। একদিকে চাকরি নেই, অন্যদিকে আইনি লড়াইয়ে হয়রানি আর টাকার শ্রাদ্ধ। শেষ পর্যন্ত আদালত সব মামলা থেকে তাদের অব্যাহতি দিয়েছে। রায়ের বিরুদ্ধে আরইবি আপিল করলেও তা ধোপে টেকেনি। মামলা থেকে রেহাই পেলেও চাকরি ফিরে না পাওয়া চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা।
ভুক্তভোগীদের একজন মো. জাকির হোসেন, যিনি সমিতির জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক হিসেবে চাকরি করতেন। আগামীর সময়কে তিনি বলছিলেন, ‘২৯ বছর সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। একাধিকবার সেরা কর্মকর্তা ও শুদ্ধাচার পুরস্কার পেয়েছি। কিন্তু অধিকার আদায়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে গিয়ে কোনো ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই চাকরিচ্যুত করা হলো। জেলও খাটলাম। এত বছর চাকরি করে এটাই কি প্রাপ্য আমার?’
‘চাকরিটাই আয়ের একমাত্র উৎস ছিলো। দেড় বছর ধরে বেকার। আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতেই অবস্থা কাহিল। জমানো টাকাও শেষ। খরচ জোগাতে পৈতৃক সম্পত্তি আরও স্ত্রীর গয়না পর্যন্ত বিক্রি করেছি। চাকরিটা ফিরে না পেলে সব রাস্তা বন্ধ। মানবিক ও আইনি দিক বিবেচনা করে আমাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করছি,’ যোগ করেন তিনি।
চাকরি হারিয়ে ধারদেনা করে চলছেন সাবেক উপ-মহাব্যবস্থাপক আরিফুল ইসলাম। এত বেশি ধারদেনা করেছেন যে, ধার করার জায়গাও এখন প্রায় বন্ধ।
এই ভুক্তভোগী আগামীর সময়কে বললেন, ‘হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়ায় চরম মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। শুনে আমার স্ত্রীর হার্ট অ্যাটাক হয়। ওইসময় তার চিকিৎসায় খরচ হয় প্রায় ৪ লাখ টাকা। এখন মাসে মাসে ১৬-১৭ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। সংসারের খরচ ও অন্যান্য ব্যয় মেটাতে দেড় বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকা ঋণ করতে হয়েছে। ২৩ বছর ধরে চাকরি করে এখন অন্য চাকরি পাওয়াও মুশকিল। আমি আর পারছি না।’
আরিফুলের জুনিয়রদের মধ্যে অন্তত ৪ জন পদোন্নতি পেয়ে মহাব্যবস্থাপক হয়েছেন। চাকরি থাকলে তিনিও তাদের আগেই পদোন্নতি পেতেন। অর্থের অভাবে সন্তানদের পড়ালেখাতেও বিঘ্ন হচ্ছে বলে জানালেন আরিফুল।
মন্ত্রণালয়কে ভুল ব্যাখ্যা দিয়েও শাস্তি হয়নি
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিভিন্ন দাবির প্রেক্ষিতে গত বছর মন্ত্রণালয়কে বাপবিবো আইন, ২০১৩-এর ২৯ ধারাকে ভুল ব্যাখ্যা দেন আরইবির ৬ জন কর্মকর্তা। পরবর্তীতে তা প্রমাণ হলে তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। আরইবি ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাসমূহ সমাধানের জন্য অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি এই নির্দেশ দেন।
আইনের ধারাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে সরকারের এক্তিয়ারাধীন বিধি প্রণয়নের বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করার কারণে ৬ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে আরইবির নিজস্ব কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলা এবং প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের অনতিবিলম্বে প্রত্যাহারের আদেশ দেওয়া হয়।
এদিকে দুই প্রতিষ্ঠানের সংকট সমাধানে গঠিত দুটি কমিটি বেশ কিছু সুপারিশ করে। যার অনেক সুপারিশই বাস্তবায়ন হয়নি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-সমিতির কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা নির্ধারণ। সহকারী জেনারেল ম্যানেজারকে সহকারী পরিচালক/সহকারী প্রকৌশলী, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারকে উপ-পরিচালক/নির্বাহী প্রকৌশলী, জেনারেল ম্যানেজার/সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজারকে পরিচালক/তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সমপদমর্যাদা নির্ধারণের কথা বলা হলেও তা কার্যকর করেনি আরইবি।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও আরইবি’র ভাষ্য
গত ১০ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব মুহম্মদ আনোয়ার হোসেন আরইবির চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি পাঠান। ৪৬ জনের নাম উল্লেখ করে চাকরিচ্যুত ২৪ জন ও চুক্তি বাতিলকৃত ২২ জন কর্মচারীকে আদালতের বিচারাধীন ক্ষেত্র ছাড়া চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে আরও বলা হয়, বর্তমানে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে কোনো প্রকার অস্থিরতা নেই।
জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন আগামীর সময়কে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা আরইবিকে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলেছি। এখন তাদের নিজস্ব কিছু প্রক্রিয়া আছে। আশা করি প্রক্রিয়াগুলো মেনে পদক্ষেপ নেবে তারা।’
কিন্তু প্রায় সাড়ে ৩ মাসেও আরইবি এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কী কারণে আটকে আছে তা জানতে আরইবির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিমের সঙ্গে শনিবার যোগাযোগের চেষ্টা করে আগামীর সময়। তাকে একাধিকবার ফোন দিয়ে এবং বিষয়বস্তু লিখে মুঠোফোনে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়েও তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির সদস্য (প্রশাসন) নাজমুস সায়াদাত যিনি সমিতি ব্যবস্থাপনারও দায়িত্বে রয়েছেন। তাকেও একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও সাড়া মেলেনি।




