৮০ ফুটের সড়কে বিআরটি করার সিদ্ধান্তই প্রশ্নবিদ্ধ : শেখ রবিউল আলম

শেখ রবিউল আলম
বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত একটি যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা। কিন্তু কোনো একটি ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করে সেটি কোথায়, কীভাবে এবং কোন বাস্তবতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তার ওপর। গাজীপুরে বিআরটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে এ বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। আমার বিবেচনায়, প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় ভুল ছিল এই সড়কে বিআরটি নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত। সড়কটি আগে প্রায় ৪০ ফুট প্রশস্ত ছিল। ভূমি অধিগ্রহণ করে সেটিকে প্রায় ৮০ ফুট করা হয়েছে। সেই সড়কের মাঝখানে বিআরটির জন্য পৃথক লেন নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এই সড়কের সঙ্গে প্রায় ৬৫টি সংযোগ সড়ক যুক্ত রয়েছে। এটি একটি ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এলাকা। ফলে বিআরটির জন্য পৃথক লেন রাখলেও সাধারণ যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন করা কঠিন। এমন বাস্তবতায় বিআরটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক ছিল, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
আমি বিআরটির ধারণা বা প্রযুক্তিকে ভুল বলছি না। বিআরটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ লেন, যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা এবং অন্যান্য অবকাঠামো এখানে নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, এই সড়কে বিআরটি চালু করলে প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়া যাবে কি না। একটি প্রকল্প নেওয়ার আগেই এ প্রশ্নের যথাযথ উত্তর পাওয়া প্রয়োজন ছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এরই মধ্যে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এত অর্থ ব্যয়ের পরও যদি কাঙ্ক্ষিত সুবিধা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে শুধু আগের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আরও অর্থ ব্যয় করার কোনো অর্থ হয় না। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পটির অবশিষ্ট কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করেছি। বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েছি। তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব এসেছে। কেউ প্রকল্পের অবকাঠামো সরিয়ে ফেলার কথা বলেছেন, কেউ বিআরটি রেখেই সুবিধা নিশ্চিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন, আবার কেউ সড়কটিকে এক্সপ্রেসওয়ের আদলে ব্যবহারের প্রস্তাব করেছেন।
সবদিক বিবেচনা করে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে সড়কটিকে ছয় লেনে রূপান্তর করাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সড়কের দুই পাশে তিনটি করে লেন থাকবে। বিআরটির পৃথক লেনের জন্য নির্মিত কিছু প্রতিবন্ধক অপসারণ করে মাঝের বিভাজক হিসেবে ব্যবহার করা হবে। নিচের ১৮টি স্টেশন অপসারণ করতে হবে। তবে যেসব অবকাঠামো ব্যবহারযোগ্য, সেগুলো যথাসম্ভব অক্ষত রাখা হবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রকল্পে ব্যয় কি অপচয় হলো? আমি বিষয়টি সেভাবে দেখছি না। এই প্রকল্পের আওতায় সড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে, দুই পাশে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হয়েছে, সংযোগ সড়ক পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে, ফুটপাত ও ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। রয়েছে বাসস্ট্যান্ড ও বাস ডিপোও। এসব অবকাঠামো সাধারণ মানুষের চলাচল এবং ভবিষ্যতের গণপরিবহন ব্যবস্থায় কাজে লাগানো সম্ভব।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বিআরটির কিছু অবকাঠামো অপসারণে প্রায় ১২০-১৩০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। আরও প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটিকে ছয় লেনে রূপান্তর করা সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ বিদ্যমান অবকাঠামোর বড় অংশ ব্যবহার করে তুলনামূলক কম অতিরিক্ত ব্যয়ে সড়কটির কার্যকারিতা বাড়ানো যাবে। তবে প্রকল্পটির ঋণ ও চুক্তি-সংক্রান্ত বিষয়ও রয়েছে। যে উদ্দেশ্যে ঋণ নেওয়া হয়েছিল, প্রকল্পটি এখন আর সেই কাঠামোয় বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করছে। প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এবং ঋণ পরিশোধের বিষয়গুলো চুক্তির শর্ত ও আইনিপ্রক্রিয়া অনুসারে নিষ্পত্তি করতে হবে। আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হলো, এই সড়কে টোল আদায় কতটা বাস্তবসম্মত। প্রায় ৬৫টি সংযোগ সড়ক থাকায় যানবাহনের প্রবেশ ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। তাই টোল আদায়ের সম্ভাব্যতা নিয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। এ ছাড়া সড়কের দুটি অংশকে ছয় লেনে উন্নীত করার প্রয়োজন রয়েছে। সে কাজ করা গেলে বিমানবন্দর থেকে সংশ্লিষ্ট ২০ কিলোমিটার এলাকায় সড়ক যোগাযোগের সক্ষমতা আরও বাড়বে।
আমরা এখন প্রকল্পটির অবশিষ্ট অবকাঠামো ব্যবহার করে মানুষের দুর্ভোগ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছি। লক্ষ্য হলো, সড়কটিকে যত দ্রুত সম্ভব সর্বসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করা। অতীতে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেটি অপরিবর্তিত রেখে আরও অর্থ ব্যয় করার পরিবর্তে বর্তমান বাস্তবতায় মানুষের সর্বাধিক উপকার নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব।
উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য শুধু কত টাকা ব্যয় হলো বা কত অবকাঠামো নির্মাণ করা হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। শেষ পর্যন্ত মানুষ কতটা সুবিধা পেল, তাদের চলাচল কতটা সহজ হলো এবং জনগণের অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেল, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের মাপকাঠি। গাজীপুরের বিআরটি প্রকল্প থেকে আমাদের এ শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন।



