চাকা থামলেই জীবন অচল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তাদের জীবন নয় ফড়িংয়ের কিংবা দোয়েলের। তবুও সুখের সঙ্গে তাদের হয় নাকো দেখা। চাকা থামলে থমকে যায় তাদের জীবনও। বলছি পরিবহন শ্রমিকদের কথা। জীবনটা তাদের দোয়েল-ফড়িংয়ের না হলেও, অবস্থা বিহঙ্গ-পতঙ্গের চেয়ে খুব একটা ভালো নয়। হাজারো সংকট কাঁধে নিয়ে পাখির মতোই প্রতিদিন ছুটতে হয় জীবিকার খোঁজে।
দেশে অন্যান্য শ্রমিকের মতো পরিবহন শ্রমিকদের জীবনও বাঁধা বেশি পরিশ্রম আর কম পারিশ্রমিকের ফাঁদে। অধিকাংশ শ্রমিকের কোনো নির্দিষ্ট নিয়োগপত্র বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই, ফলে তাদের থাকে না চাকরির নিরাপত্তাও।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হলেও নেই কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা বিশ্রামের ব্যবস্থা। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং রাস্তার বেহাল দশার কারণে প্রতিনিয়ত থাকেন দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে।
এ ছাড়া, মহাসড়কে চাঁদাবাজি এবং মালিকপক্ষের চাপে চরম অবনতি ঘটছে তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের। সরকারিভাবে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হলেও, অনেক ক্ষেত্রে এর কোনো ধরনের সুফল পান না শ্রমিকরা।
যথাযথ আইন ও সামাজিক সুরক্ষার অভাব পরিবহন শ্রমিকদের ঠেলে দিচ্ছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।
আমিনুল ইসলাম নামের একজন হেলপারের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তার আক্ষেপ, ‘মালিকপক্ষ শুধু তাদের সুবিধাটাই বেশি দেখে। আমরা শুধু কাজটাই করে যাই, লাভ হয় মালিকের। আমরা তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা পাই না। বৃষ্টি, গরম সবসময়ই আমাদের কাজ করতে হয়।’
পরিবহন শ্রমিকদের আয়ের প্রধান উৎস হলো দৈনিক মজুরি বা ট্রিপভিত্তিক কমিশন, যা অত্যন্ত অনিশ্চিত। মাস শেষে নির্দিষ্ট কোনো বেতন কাঠামো না থাকায় অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ধর্মঘটের সময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় তাদের আয়। বোনাসের মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধাও পান না তারা। ফলে কঠোর পরিশ্রম করেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংসার চালানো এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে তাদের জন্য।
বাংলাদেশ অটোরিকশা-অটোট্যাম্পো-ট্যাক্সিকারচালক শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ খোকন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ব্যক্তি মালিকানাধীন পরিবহন শিল্পের ন্যূনতম মজুরি কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সরকার ১৩টি গ্রেডে পরিবহন শ্রমিকদের বেতন নির্ধারণ করে। শ্রম আইন অনুযায়ী, পরিবহন মালিক কর্তৃক শ্রমিকের নিয়োগপত্র প্রদান করার বিধান থাকলেও, কোনো মালিকই কোনো শ্রমিককে নিয়োগপত্র প্রদান করেন না।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘পরিবহন শ্রমিকদের জন্য দৈনিক আট কর্মঘণ্টা কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। আট ঘণ্টার অধিক কাজ করলে এর ওভারটাইম দিতে হবে এবং প্রত্যেক পরিবহন শ্রমিকের জন্য নিয়োগপত্র এবং উৎসব বোনাস বাধ্যতামূলক করতে হবে।’
সামাজিকভাবে পরিবহন শ্রমিকরা প্রায়ই শিকার হন অবহেলা ও অমর্যাদার। অনেক সময় তুচ্ছ ঘটনা কেন্দ্র করে যাত্রীরা তাদের সঙ্গে তর্কে-বিতর্কে জড়িয়ে যান এবং এ অবস্থায় বিভিন্ন সময় যাত্রীর সঙ্গে হয় মারামারিও।
দীর্ঘ সময় ধরে অমানবিক কর্মঘণ্টা ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন, যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে তাদের পারিবারিক জীবনেও। কোনো দুর্ঘটনার পর উপযুক্ত আইনি সহায়তা বা বীমা সুবিধা না থাকায় শ্রমিক এবং তাদের পরিবারগুলো ভোগে চরম নিরাপত্তাহীনতায়। সমাজে তাদের পেশাকে মর্যাদার চোখে না দেখার কারণেও ভোগেন হীনম্মন্যতায়।
সড়ক পরিবহনে ব্যক্তি মালিকানাধীন খাতে নিয়োজিত শ্রমিক (ড্রাইভার ও হেলপার) ও তাদের পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০০৫ সালে ‘ব্যক্তি মালিকানাধীন সড়ক পরিবহন শ্রমিক কল্যাণ তহবিল আইন, ২০০৫’ কার্যকর করা হয়। এ আইনের আওতায় গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের বোর্ড সরকার, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের অনুদানে সংগৃহীত তহবিল পরিচালনা করে, যা থেকে কর্মরত অবস্থায় শ্রমিকের মৃত্যু, স্থায়ী অক্ষমতা, জটিল অসুস্থতা কিংবা সন্তানদের শিক্ষা ও কন্যার বিবাহের জন্য দেওয়া হয় আর্থিক অনুদান। পরে এ আইনের আওতায় আনা হয় ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। যারা মূলত কাজ করে পরিবহন শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে।
বিভিন্ন ধরনের আইনি জটিলতা, মামলা এবং আর্থিক সহায়তা নিয়েও এদের কাজ করার কথা থাকলেও, বাস্তবে দেখা যায় এর পুরোপুরি ভিন্ন চিত্র। ঢাকার গাবতলী লিংক বাসের চালকের সহকারী ইসমাইল হোসেনের আক্ষেপ, ‘আমগো কেউই কোনো খোঁজ নেয় না ভাই, প্রতিদিন শুধু শুধু চাঁদা দেই ৭০০ টাকা কইরা। আমগো কোনো ক্ষতি হইলে খোঁজ নেয় না, রাস্তায় কোনো ঝামেলা হইলেও কেউ আহে না। মালিকও আহে না, সমিতির কোনো লোকরেও পাই না। কার কাছে এই টাকা দেই, বুঝিই না কিছু।’
কেউ আহত হলে বা মারা গেলে ফেডারেশন থেকে কী ধরনের সাহায্য পাওয়া যায়, এ বিষয়ে ইসমাইলকে জিজ্ঞাসা করলে গাড়ির চালক উজ্জ্বল ক্ষোভ নিয়ে নিজে থেকেই উত্তর দেন, ‘কোনো সাহায্যই পাওয়া যায় না। আমাদের কত লোক আছে যারা আগে ড্রাইভার আছিলো নয়তো হেলপার আছিলো যারা অ্যাকসিডেন্ট কইরা পা হারাইছে নইলে হাত নাই নইলে মারা গেছে, কিন্তু অ্যাকসিডেন্টের পরে আমগো সবার কাছে থিকাই আবার চাঁদা তুইলা সেই আহত হেলপাররে, ড্রাইভাররে বা মারা যাওয়া লোকের পরিবাররে সেই টাকাটা দেয়। অ্যাকসিডেন্টের পরে যদি আবার সেই আমগো থিকাই টাকা তুইলা দেওয়া লাগে তাইলে এই যে আমরা প্রতিদিন যে ৭০০ কইরা টাকা দিলাম, এইটার কাম কী?’
আহত পরিবহন শ্রমিকদের জন্য এবং নিহত হওয়া পরিবহন শ্রমিকদের পরিবার এর জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে আগামীর সময়। সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ এস এম আহাম্মেদ খোকন বলেছেন, ‘সরকার কর্তৃক নিহত হওয়া ব্যক্তির জন্য ৫ লাখ এবং আহত হওয়া ব্যক্তির জন্য ১ থেকে ৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়। কীভাবে এ টাকা নিতে পারবে সে বিষয়ে আমরা সাহায্য করি। এ ছাড়া আমরা এবং অন্যান্য সবাই যতটুকু পারি সাহায্য করি।’
দৈনিক কর্মঘণ্টার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘আমরা দিন অনুযায়ী রোটেশন ঠিক করি। প্রত্যেক গাড়ির জন্য আমাদের দুজন ড্রাইভার এবং দুজন হেলপার থাকে। তারা একদিন কাজ করে, আরেকদিন রেস্ট নেয়।’



