রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কী হবে?

মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন
দেশের বাইশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিন বছর তিন মাস আগে শপথ নেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে এই পদের মেয়াদ পাঁচ বছর।
বুধবার জানা যায়, রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে পারেন। পদত্যাগের কারণ হিসেবে শারীরিক অসুস্থতাকে উল্লেখ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের জন্য ইতোমধ্যে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়েও উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
এদিকে, বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনিও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন শুনেছেন বলে জানান।
সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘আপনি নিজেই বললেন এটা একটা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তো গুঞ্জন তো গুঞ্জনই। আর এটা যদি ঘটনা হয় সেটাতো আমরাও দেখবে।’
এ সময় সাংবাদিকরা গণমাধ্যমে খবরও প্রকাশিত হয়েছে উল্লেখ করলে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘গণমাধ্যমে আসছে? হতে পারে, আপনারা রাষ্ট্রপতিকে জিজ্ঞেস করেন।’
প্রক্রিয়া কী জানতে চাইলে তিনি বললেন, এটা রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে অথবা স্বাস্থ্যগত কারণে, যে কোনো কারণে চাইলে, তার সেটা অপশন আছে। এক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ কী এমন প্রশ্নে তিনি জানান, সরকারের কোনো পদক্ষেপ নাই এখানে।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত উল্লেখ করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছিলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে তো আর কিছু বলা হচ্ছে না। আপনারা পত্রিকায় দেখছেন যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে ইত্যাদি, আমিও শুনছি।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী?
দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি। সংবিধান অনুযায়ী, একজন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। সর্বোচ্চ দুই বার দায়িত্ব পালন করতে পারেন তিনি।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। সেসময় আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম অনুযায়ী, প্রথম স্থানে থাকা রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন সময়ের হিসাবে প্রায় তিন বছর তিন মাস ধরে এই পদে রয়েছেন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
তাহলে মেয়াদের আগেই এখন পদত্যাগ করতে চাইলে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে, সেটি সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া আছে বলে জানান সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক।
মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পদত্যাগ করতে হলে এখন সংবিধান অনুযায়ী স্পিকারের কাছে তাকে পত্র জমা দিতে হবে বলে জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ সম্পর্কে সংবিধানের ৫০ এর তিন অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেছেন, ‘স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে রাষ্ট্রপতি স্বীয় পদ ত্যাগ করতে পারবেন।’
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কারণ উল্লেখ করে দেওয়া পত্রটি খুব ছোট হয় বলে জানান তিনি। ‘উনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন। স্বেচ্ছায় হোক বা চাপে পড়ে হোক, যেটাই হোক উনি লিখবেন, আমি স্বাস্থ্যগত বা ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করলাম। পদত্যাগ ইমিডিয়েটলি কার্যকর হয়। এটা দুই লাইনের চিঠি হয় সাধারণত। সাধারণত ব্যক্তিগত কারণই উল্লেখ করেন সকলে’, যোগ করেন তিনি।
একইসঙ্গে, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার সাথে সেটি গ্রহণ বা গ্রহণ না করার কোনো সম্পর্ক নেই বলেও উল্লেখ করেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। বললেন, ‘এসব পদে পদত্যাগপত্র হ্যান্ডওভার করলেই কার্যকর হয়ে যায় সাধারণত। মানে পদত্যাগপত্রটা স্পিকারের কাছে পৌঁছে দিলেই স্পিকার পাওয়ার সময় থেকেই কার্যকর হবে, মানে এখানে গ্রহণ করার, না গ্রহণ করার কোনো স্কোপ নাই। পদত্যাগপত্র লিখলেই এটা গ্রহণীয়।’
পদত্যাগপত্র দেওয়ার পরে কী হবে?
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পরে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই পদ শূন্য থাকবে না বলে জানান শাহদীন মালিক। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদে অনুপস্থিতি প্রভৃতির কালে রাষ্ট্রপতি পদে স্পিকার থাকবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে ক্ষেত্রমত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত, কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করিবেন।’
এই অনুচ্ছেদটির ব্যাখ্যা করে শাহদীন মালিক বললেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ করা বা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্যবর্তী যে সময়, ওই সময়ে স্পিকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।’
পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষের আগে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে ওই পদ শূন্য থাকবে না, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি থাকবেন এবং সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সংবিধানের ১২৩(১) অনুচ্ছেদে এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় সম্পর্কে বলা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এই অনুচ্ছেদটিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির-পদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে ওই পদ শূন্য হলে মেয়াদ শেষের তারিখের আগে ৯০ অথবা সর্বনিম্ন ৬০ দিনের মধ্যে শূন্য পদ পূরণের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে এই নির্বাচন নিয়ে কয়েকটি শর্তের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে।
এতে বলা হয়েছে, যে সংসদ রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচিত করেছে, সেই সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে যদি রাষ্ট্রপতির পদ খালি হয় তাহলে পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যাবে না।
একইসঙ্গে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর নতুন সংসদের প্রথম বৈঠকের দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে শূন্য পদ পূরণের জন্য নির্বাচন করতে হবে।
এছাড়া রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণ হলে নির্বাচনের বিষয়ে সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পদটি শূন্য হবার পর নব্বই দিনের মধ্যে সেটি পূর্ণ করার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, পদত্যাগ করলে বা রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নতুন রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন করবে। সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে। তিন মাস বা দুই মাস যেটাই হোক সর্বোচ্চ তিন মাস।’







