পহেলা মে যেভাবে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়েছিল

১৮৮৬ সালের চৌঠা মে হে মার্কেট আন্দোলনে বোমা বিস্ফোরণের চিত্রিত দৃশ্য। ছবি : সংগৃহীত।
বিশ্বের অনেক দেশেই ‘মে ডে’ পরিচিত প্রাচীন এক বসন্তের উৎসব হিসেবে। কিন্তু বর্তমানে এটা বেশি পরিচিত শ্রম দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে। বিশ্ব জুড়ে শ্রমিকদের ঐতিহাসিক সংগ্রাম ও অর্জনের কথা মনে করিয়ে দিতেই দিনটি পালিত হয়ে থাকে।
প্রতিবছর কাজের পরিবেশ আরও ভালো করা এবং ট্রেড ইউনিয়নকে আরও শক্তিশালী করার দাবিতে বিশ্ব জুড়ে এদিন নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি হতে দেখা যায়। শুরুর দিকে এই দিবসটি বিভিন্ন সামাজিক ও সমাজতান্ত্রিক সংস্থা এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো পালন করত।
যদিও এই দিবসের পেছনের আসল প্রতিবাদ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে, কিন্তু সেখানে এটি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার পালন করা হয়ে থাকে।
কীভাবে এর শুরু?
১৮৮৬ সালে ব্রিটিশ সমাজ সংস্কারক রবার্ট ওয়েনের এক চিন্তা থেকে, যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ট্রেড ইউনিয়নগুলো দিনে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে এক বিরাট প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করে।
রবার্ট ওয়েন ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি পূরণে স্লোগান ঠিক করেন, ‘আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন এবং আট ঘণ্টা বিশ্রাম’। সবচেয়ে বড় আন্দোলনটা হয় পহেলা মে শিকাগোতে, যেখানে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক সমবেত হন।
সে সময় কারখানায় কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা বিশ্রাম ছাড়াই টানা কাজ করে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। আর সেসময় শিকাগো ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প-কারখানা ও ইউনিয়ন সংগঠনগুলোর কেন্দ্র।
পরবর্তী কয়েক দিনে এই আন্দোলনকে ব্যবসায়ী ও রাজনীতি মহল পছন্দ না করলেও, আরও হাজার হাজার ক্ষুব্ধ শ্রমিক ও আন্দোলনকারী এতে উত্ত্যক্ত হতে থাকেন। এ সময় কিছু নৈরাজ্যবাদীও এতে যোগ দেন, যারা কোনো ধরনের নিয়ম ও আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সামাজিককাঠামো স্বীকার করেন না।
উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকে, পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ দেখা দেয়, একজন মারা যায় ও অনেকে আহত হয়। পুলিশি নিষ্ঠুরতায় ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত বিক্ষোভকারী এবং শ্রমিক নেতারা পরদিন ৪ মে শিকাগোর বিখ্যাত হে-মার্কেট স্কয়ারে কর্মসূচির ডাক দেয়।
এ সময় আজও পরিচয় জানতে না পারা এক ব্যক্তি পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা ছোড়েন। ওই বিস্ফোরণের ফলে এলাকা জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, সাতজন পুলিশ সদস্য নিহত হন এবং ৬৭ জন কর্মকর্তা আহত হন। চারজন বিক্ষোভকারীও নিহত হন এবং ৩০ জনেরও বেশি আহত হন।
এই ঘটনা পরে পরিচিতি পায় হে-মার্কেট ম্যাসাকার হিসেবে। পরবর্তীতে আটজন নৈরাজ্যবাদী খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত হন এবং তাদের দোষ ঠিকভাবে প্রমাণের আগেই তাদের অনেককে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
এই ঘটনাগুলোর স্মরণে ১৮৮৯ সালে ২০ দেশের সমাজকর্মী, শ্রমিকনেতা ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর এক আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে পহেলা মে তারিখ 'মে দিবস' পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অন্যান্য দেশও মে দিবস পালনে যোগ দেয়
শিকাগোর এই সংঘাত-পরবর্তী কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন বামপন্থি দলগুলোর জন্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করতে থাকে। দক্ষিণ ইউরোপে প্রথম মে দিবস পালনে এগিয়ে আসে স্লোভেনিয়ান এবং ক্রোয়াটরা, যারা সেসময় অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কাজের নিচু পরিবেশ, অল্প বেতন এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার প্রতিবাদে ১৮৯৩ সালে সার্বিয়ার শ্রমিকরা এক মে দিবস র্যালি বের করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন দ্রুত শিল্প-কারখানায় উন্নতি ঘটতে থাকে, তখন রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরও বিশ্ব জুড়ে শ্রমিকরা মৌলিক চাহিদা পূরণে সংগ্রাম করতে থাকে।
জার্মানিতে ১৯৩৩ সালে নাৎসি পার্টি ক্ষমতায় আসার পর শ্রমিক দিবসের দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।
একই সঙ্গে এই ছুটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রি ইউনিয়ন তুলে দেওয়া হয় এবং জার্মান শ্রমিক আন্দোলনও থামিয়ে দেওয়া হয় (যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবারও ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত হয়)।
পূর্ব এবং পশ্চিম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির জয়ের পর বৈশ্বিক মানচিত্র বদলে যায়। বিশ্বে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভক্তি বেশি করে চোখে পড়তে থাকে।
বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দেশ, যেমন- কিউবা, সে সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনে বছরের পর শ্রমিক দিবস পালিত হয়ে আসছে এবং এদিনের ছুটিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
সাধারণত এদিন বিরাট সমাবেশের আয়োজন করা হতো, যেমনটা মস্কোর রেড স্কয়ারে দেখা যেত। সেই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিরা যোগ দিতেন।
এদিন একই সঙ্গে সোভিয়েত সামরিক বাহিনীর শক্তিমত্তাও প্রদর্শন করা হতো। সমাজতান্ত্রিক নেতারা বিশ্বাস করতেন এই নতুন ঘোষিত ছুটি ও উৎসব ইউরোপ এবং আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণিকেও উদ্বুদ্ধ করবে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এক হয়ে লড়াইয়ে।
সমাজতান্ত্রিক ফেডারেল রিপাবলিক অফ যুগোশ্লাভিয়ার গল্পটাও ছিল একই রকম। সেখানে ১৯৪৫ সাল থেকে মে দিবসের দিন সরকারি ছুটি পালিত হয়ে আসছে। দিনটি উদযাপনে মিছিল ও সামরিক র্যালি অনুষ্ঠিত হয় এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রচারণার জন্য বেছে নেওয়া হয় দিনটিকে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশে শ্রমিক ও ইউনিয়নগুলো আরও ভালো কাজের পরিবেশের দাবিতে মে দিবস ঘিরে র্যালি ও সমাবেশ করে। বেকারত্ব ও দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াইয়ে শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি এখনো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়ে থাকে।
বেকারত্ব কমলেও এবং কাজের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসলেও, আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন (আইএলও) তাদের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলছে, বেশিরভাগ জি-২০ দেশে গত বছরের মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল রেখে মূল বেতন-ভাতা দিতে পারেনি।
আইএলও বলছে, গত বছর ক্রয়ক্ষমতা (পিপিপি) অনুযায়ী চরম দারিদ্র্যসীমায় থাকা শ্রমিক, যাদের আয় দিনে ২.১৫ ডলারেরও কম, তাদের সংখ্যা বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০ লাখ বেড়ে গেছে।
আর সহনীয় দারিদ্র্যসীমায় থাকা শ্রমিকের সংখ্যা (ক্রয়ক্ষমতা অনুযায়ী যারা দিনে ৩.৬৫ ডলারের কম আয় করেন) বিশ্ব জুড়ে প্রায় ৮৪ লাখ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে আইএলও।



