পাল্টাপাল্টি হট্টগোল সংসদে, ভবিষ্যৎ চিন্তায় স্পিকার
- ‘পল্টনের বক্তৃতা’ ‘শাহবাগের ভাষণ’ বলায় ক্ষোভ
- প্রথম দিনেই ওয়াকআউট বিরোধী দলের
- আপত্তির পর বক্তব্য প্রত্যাহার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

সংগৃহীত ছবি
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এই নেতার বক্তব্যকে ‘পল্টনের বক্তৃতা’ অভিহিত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ ছাড়া পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত এমপি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদকে উদ্দেশ্য করে ‘শাহবাগ স্কয়ারে বক্তৃতা’ মন্তব্য করেছেন তিনি। এই দুই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে গতকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই তীব্র উত্তেজনা ও হট্টগোল তৈরি হয় ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একপর্যায়ে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে একাধিকবার করতে হয় হস্তক্ষেপ। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে চলা হট্টগোলের মধ্যে সংসদ সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যপূর্ণ আখ্যা দিয়ে আনুষ্ঠানিক দুঃখ প্রকাশ এবং বক্তব্য এক্সপাঞ্জের দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান।
উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্পিকার। তিনি বলেছেন, ‘এই সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি চিন্তিত। আজকে একে অন্যকে কথা বলার সুযোগকে যেভাবে বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টা দেখেছি, এটা সংসদের জন্য ভালো লক্ষণ নয়।’
পরে সংবিধান সংস্কার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি দিবসে সরকারি বিল উত্থাপনের প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।
গতকাল বেলা ৩টায় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনের কার্যক্রম। প্রশ্নোত্তর-পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সম্পূরক প্রশ্ন করেন এমপি হাসনাত। তার প্রশ্নে তুলে ধরা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও নৌকাবাইচ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ। তিনি উল্লেখ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে একটি ‘কালচারাল জেলা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ সেখানে গান-বাজনা, নৌকাবাইচসহ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাসনাত জানতে চান, গত ছয় মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের ‘ল অ্যান্ড অর্ডার সিচুয়েশন’ পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন কি না এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তিনি পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পেরেছেন কি না— নাকি তিনি ব্যর্থ।
হাসনাতের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘স্পিকার, এটা প্রশ্ন হলো, না পল্টনের বক্তৃতা হলো, বুঝতে পারিনি।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ শুরু করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। দাঁড়িয়ে জানিয়েছেন তীব্র আপত্তি। হট্টগোলের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, ‘যদি কথাই না বলতে দেন, তাহলে কীসের বাকস্বাধীনতা।’
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সদস্যদের নিজ নিজ আসনে বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বললেন, ‘আপনাদের তো কথা বলতে দিচ্ছি। এভাবে ঢালাওভাবে চিৎকার না করে নিয়ম মেনে মাইকে কথা বললে সবাই শুনতে পাবে।’ স্পিকার সরকারকে সমালোচনা করার সুযোগের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটা তো আওয়ামী লীগের আমল না। এখানে আপনারা ইচ্ছামতো সরকারকে ক্রিটিসাইজ করতে পারছেন।’
এরপর পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. মাসুদ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করেন। দিনের আলোতে অস্ত্র ব্যবহার করে ছিনতাই, সংসদ সদস্যদের ওপর হামলা এবং বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয় তুলে ধরে তিনি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ জানতে চান।
জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, ‘শাহবাগ স্কয়ারে বক্তৃতা দেওয়া আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেওয়া এক কথা না।’
এই মন্তব্যের পরও বিরোধী দলের সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেন। একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকারের উদ্দেশে বললেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমি আপনার শেল্টার চাই।’
বিরোধী দলের প্রবল প্রতিবাদের মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার মন্তব্য প্রত্যাহার করে বললেন, ‘আই উইথড্র।’ তবে বিরোধী দলের সদস্যরা আনুষ্ঠানিক দুঃখ প্রকাশ এবং বক্তব্যটি সংসদের কার্যপ্রণালি থেকে এক্সপাঞ্জ করার দাবিতে অনড় থাকেন।
হট্টগোলের মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার বক্তব্য শুরু করলে স্পিকার তাকে নিজের দিকে তাকিয়ে বক্তব্য দেওয়ার অনুরোধ করেন। বিরোধী দলের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘আপনারা কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতে রাজি না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আমি বিরোধী দলের নেতাকে দেব।’
এরপর বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান। তার বক্তব্যের সময় সরকারি দলের কয়েকজন সদস্যও হট্টগোল করে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শফিকুর রহমান বললেন, ‘এটি অশোভন। আমার বক্তব্যের সময় যদি বাধা দেওয়া হয়, তবে আমার এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয় না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বললেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তিনি আজ যে শব্দগুলো বললেন, সেগুলো আজই প্রথম বলেননি। অধিবেশনের শুরু থেকেই তিনি সবাইকে ছোট করে কথা বলছেন। এমনকি তিনি এই সংসদে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করবেন বলেও বক্তব্য দিয়েছেন। আমরা এখানে তার ছাত্র হতে আসিনি। তিনি যদি পড়াতে চান, তবে একটি বিশ্ববিদ্যালয় খুলুন, যেখানে গিয়ে মানুষ তার লেকচার শুনবে।’
তিনি আরও বললেন, ‘এটি ফ্যাসিবাদের সংস্কৃতি। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, তাকে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে।’
সংসদের মর্যাদা রক্ষার দাবি জানিয়ে শফিকুর রহমান বললেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবশ্যই দুঃখ প্রকাশ করতে হবে এবং তার বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করতে হবে। ‘তবেই বিরোধী দল সংসদে থাকবে। না হলে এ ধরনের অপমানের মধ্যে আমরা এখানে বসে থাকতে পারি না।’
পরে স্পিকার বললেন, সংসদ আইন, নিয়ম ও বিধি অনুযায়ী চলে। কার্যপ্রণালি বিধি না মানলে সংসদ চলতে পারে না। তিনি বললেন, ‘আমি কিছু সদস্যের মধ্যে অসহিষ্ণুতা লক্ষ করছি।’
দীর্ঘ সংসদীয় অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বললেন, ‘জনগণের সঠিক নির্বাচনের মাধ্যমেই বর্তমান সংসদ গঠিত হয়েছে। সরকারি ও বিরোধী দল— উভয়পক্ষের সদস্যদের ধৈর্য ধারণ করে সংসদের কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে হবে।’
তিনি আরও বললেন, ‘অনেক কষ্টের পরে গণতন্ত্র অর্জিত হয়েছে। গণতন্ত্র যাতে বহাল থাকে, সেজন্য প্রতিটি সংসদ সদস্যের দায়িত্ব রয়েছে। আপনাদের বলব, সংসদের রুলস অব প্রসিডিউর পড়ুন। স্পিকার যখন কথা বলেন, তখন সবাইকে বসে শুনতে হয়। এই আইন-নীতি যদি না মানেন, ভঙ্গ করেন, তাহলে এই সংসদ বেশিদিন চলবে না।’
সবশেষে সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্পিকার বললেন, ‘এই সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি চিন্তিত। আজকে একে অন্যকে কথা বলার সুযোগকে যেভাবে বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টা দেখেছি, এটি সংসদের জন্য ভালো লক্ষণ নয়।’
বাংলাদেশের সংসদের অতীতের বিভিন্ন ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বললেন, ‘অতীতে দেশের সংসদের অনেক খারাপ রেকর্ড রয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের সংসদে স্পিকারকে পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছিল।’
প্রায় ১৫ মিনিট ধরে চলা এ উত্তেজনার পর স্পিকার আশ্বাস দেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য তিনি পরীক্ষা করে দেখবেন। বক্তব্যে অসংসদীয় কোনো শব্দ বা বক্তব্য থাকলে তা সংসদের কার্যপ্রণালি থেকে এক্সপাঞ্জ করা হবে।
এদিকে সংবিধান সংস্কার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি দিবসে সরকারি বিল উত্থাপনের প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।
ওয়াকআউটের আগে দেওয়া বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা জানিয়েছেন, দেশের বিদ্যুৎ-গ্যাসের তীব্র সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং কারখানা বন্ধের মতো জনদুর্ভোগ নিয়ে আলোচনার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে বিশেষ অধিবেশন ডাকার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের ৭০ শতাংশের রায় পাওয়া ‘সংবিধান সংস্কার’ ইস্যুটিও অবহেলিত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার বেসরকারি সদস্যদের দিবস হওয়া সত্ত্বেও সরকারি বিল উত্থাপনের উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বললেন, এটি বেসরকারি সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে এবং সংসদকে একপেশে করে ফেলা হচ্ছে।
পরে জনস্বার্থে দেওয়া তাদের চারটি নোটিস নিয়ে আলোচনার সুযোগ দেওয়া হলে আবার সংসদে যোগ দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে অধিবেশন
আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চলমান তৃতীয় অধিবেশন। গতকাল দুপুরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বৈঠকটি হয়। সরকারি ছুটির দিন এবং ৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর বাদে প্রতিদিন বেলা ৩টায় অধিবেশন শুরু হবে।
বৈঠকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, বিএনপির সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, বিরোধী দলের উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম এবং বিরোধী দলের চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম অংশ নেন।







