সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বিদেশি বিনিয়োগ টানতে ভূমিকা রাখবে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা দেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য। শুধু তা-ই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি বিদেশি বিনিয়োগ টানতেও রাখবে ভূমিকা। সংসদে এমনটাই জানালেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ঐতিহ্যগত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছি। অন্যদিকে আসিয়ানভুক্ত দেশ, পূর্ব ও মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র সৃষ্টি করছি।’
আজ বুধবার জাতীয় সংসদে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন মন্ত্রী।
নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালীর লিখিত প্রশ্নের উত্তরে বলছিলেন মন্ত্রী। ‘দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলের সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অভিবাসন আজ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথ গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। এই বাস্তবতায় কোনো একক অঞ্চল বা শক্তিকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল না থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রদর্শিত স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের আলোকে জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হচ্ছে।’
গাজীপুর–৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলনের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টি উঠে আসে। ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন তুলা ব্যবহার করে উৎপাদিত তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে শূন্য শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত হয়েছে। চুক্তিটি বিদেশি বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, রপ্তানি বহুমুখী করা, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থানমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। অর্থনীতি গতিশীল করতে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
‘বাজার সম্প্রসারণ এবং শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রেফারেনসিয়াল ট্রেড অ্যাগ্র্রিমেন্ট (পিটিএ), ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এফটিএ) এবং কম্প্রেহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) সম্পাদনের উদ্যোগ চলমান। আমিরাতের সঙ্গে সিইপিএ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে; মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে জিসিসি, মারকুসুর এবং অন্যান্য আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে ঢাকা’, যোগ করেন তিনি।
খলিলুর রহমান মনে করিয়ে দেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে কৃষিপণ্য ও অপ্রচলিত রপ্তানি খাতে। সম্প্রতি ভিয়েতনামের বাজারে বাংলাদেশের আলু রপ্তানির সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছে এবং মালয়েশিয়ায় আম রপ্তানির বিষয়ে কার্যক্রম চলমান।
অপরদিকে চট্টগ্রাম–১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ইউএনএইচসিআরের সাম্প্রতিক সময়ের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ও বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানে ১১ লাখ ৮৯ হাজার ২১৩ জন।
এ সময় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। ‘দ্বিপক্ষীয় ফ্রন্টে রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি বাস্তবতায় নিয়ে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলমান।’
বর্তমান সরকার শপথ নেওয়ার পর মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আরাকান আর্মিপ্রধান উভয়েই প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।
ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিনের প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান জানান, কূটনৈতিক অবকাঠামো আরও শক্তিশালী, কার্যকর ও ব্যয়-সাশ্রয়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৭টি দেশের ২০টি মিশনে বাংলাদেশের নিজস্ব মালিকানাধীন ভবনে চ্যান্সারি কার্যক্রম চলছে। আরও ৪ প্রকল্প চলমান। বিদেশের বাকি মিশনগুলো চলছে ভাড়ায়। এ বাবদ সরকারকে ব্যয় করতে হয় বার্ষিক প্রায় ১০০ কোটি টাকা।’
তিনি উল্লেখ করেন, বিদেশে বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক স্থাপনা প্রতিষ্ঠা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে চ্যান্সারি ভবন নির্মাণ এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কূটনৈতিক কমপ্লেক্স স্থাপনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে কমবে সরকারি ব্যয়। অন্যদিকে বাড়বে বাংলাদেশের মর্যাদা ও কূটনৈতিক কার্যকারিতা।




