মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা বেশি, ধনীদের সুবিধা : সিপিডি

ছবি: আগামীর সময়
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের কর কাঠামোয় প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার মূল নীতি লঙ্ঘিত হয়েছে। এতে সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর করের বোঝা বেশি চেপেছে। একই সঙ্গে বাজেটে যেসব সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে রয়েছে গভীর সংশয়।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) প্রকাশিত ‘জাতীয় বাজেটে কর ন্যায়বিচার: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আর্থিক প্রস্তাবনার ওপর পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে এ তথ্।
আজ বৃহস্পতিবার এক সেমিনারে এই প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে সিপিডি জানায়, নতুন কর কাঠামো অনুযায়ী যাদের বার্ষিক আয় ৬ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে (যা মূলত দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি), তাদের করের বোঝা ১২.৫ শতাংশ থেকে শুরু করে প্রায় ১৬.৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। এর বিপরীতে বার্ষিক ৩০ লাখ টাকার বেশি উচ্চ আয়ের মানুষদের করের বোঝা বাড়বে মাত্র ৭.৬ শতাংশ।
সিপিডি এটিকে সাম্য ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী এবং একটি বৈষম্যমূলক কর কাঠামো হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
এ ছাড়া তীব্র মূল্যস্ফীতি থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
সিপিডির মতে, দীর্ঘমেয়াদী কর পরিকল্পনার পূর্বাভাস ইতিবাচক হলেও চলমান বাজার পরিস্থিতিতে এই সীমা অপরিবর্তিত রাখায় নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের প্রকৃত করের বোঝা বাড়িয়ে দেবে।
সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো বিশ্লেষণ করে সিপিডি বলছে, সরকার নতুন অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা অতিরিক্ত আশাবাদী এবং অবাস্তব। কারণ বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪.১৪ শতাংশ এবং দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে তীব্র মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। একই সঙ্গে সরকার আগামী অর্থবছরে ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তাকে অতিরিক্ত বড় মনে করছে সিপিডি। বিগত বছরগুলোর রাজস্ব আদায়ের গতি ও ঘাটতি বিবেচনা করলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
বাজেটের ২.৪৩ লাখ কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকে ১.১২ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ বিষয়ে সিপিডি সতর্ক করে বলেছে, সরকার ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন, যা দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় বাধা।
অন্যদিকে বাজেটে অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করেছে সংস্থাটি। তারা জানায়, এ ধরনের অনৈতিক সুযোগ সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে। কর ব্যবস্থায় সুশাসন ও ন্যায়বিচারের বড় ধরনের ব্যত্যয়ও ঘটায়।
তবে সরকার আগামী ৫ বছরের জন্য কর্পোরেট করের হার অপরিবর্তিত রাখার যে পরিকল্পনা নিয়েছে তাকে সিপিডি স্বাগত জানিয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে করের হারের একটি স্পষ্ট পূর্বাভাস পাবেন, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ইতিবাচক।
অর্থনীতিতে কর ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিত করতে সিপিডির প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে। কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর নীতি নির্ধারণ এবং কর আদায় প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ আলাদা করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর রিফান্ড বা ফেরত দেওয়ার কাজটি সুচারুভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য একটি স্বাধীন সত্ত্বা গঠন করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কর ব্যবস্থায় সুশাসন ফেরাতে কালো টাকা সাদা করার অনৈতিক সুবিধা অবিলম্বে বাতিল করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সিপিডির মূল্যায়ন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও কাঠামোগত সংস্কারের চেষ্টা করলেও এটি সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের বোঝা বেশি চাপিয়েছে। একটি প্রকৃত 'কর ন্যায়বিচার' ভিত্তিক অর্থনৈতিক সমাজ গঠনে করের বোঝা ধনীদের ওপর বেশি হওয়া উচিত ছিল এবং এনবিআরের প্রশাসনিক সংস্কার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।




